আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইসলামে আদর্শ নেতার বৈশিষ্ট্য

মুফতি আইয়ুব নাদীম

ইসলামে আদর্শ নেতার বৈশিষ্ট্য

ইসলামে যে কেউ নেতা হতে পারে না। চাইলেই নেতা হওয়া সম্ভব নয়। বিত্ত বা লোকবল থাকলেই নেতা হওয়া যায় না। নেতা হওয়ার জন্য কিছু গুণ লাগে, কিছু যোগ্যতা লাগে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ইউসুফ বললেন, আপনি আমাকে দেশের অর্থ-সম্পদের (ব্যবস্থাপনার) কাজে নিযুক্ত করুন। আপনি নিশ্চিত থাকুন আমি রক্ষণাবেক্ষণ বেশ ভালো পারি এবং এ কাজের পূর্ণ জ্ঞান রাখি।’ (সুরা ইউসুফ : ৫৫)

এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, জ্ঞান ও আমানতদারি একজন নেতার মৌলিক গুণ। এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, যেকোনো বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখতে হবে। আর আমানতদারি ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্ব পালনে সফল হওয়া অসম্ভব। তাছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার আমানতদারিতা নেই, তার ইমান নেই।’ (শুআবুল ইমান : ৪৩৫৪)

বিজ্ঞাপন

অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের নবী তাদের বলল, আল্লাহ তোমাদের জন্য তালুতকে বাদশাহ বানিয়ে পাঠিয়েছেন। তারা বলতে লাগল, তিনি কীভাবে আমাদের ওপর বাদশাহি লাভ করতে পারেন, যখন তার বিপরীতে আমরাই বাদশাহির বেশি হকদার? তাছাড়া তার তো আর্থিক সচ্ছলতা লাভ হয়নি। নবী বললেন, আল্লাহ তাকে তোমাদের ওপর মনোনীত করেছেন এবং জ্ঞান ও শারীরিক দিক থেকে তোমাদের চেয়ে সমৃদ্ধি দান করেছেন।’ (সুরা বাকারা : ২৪৭) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্রনায়ক বা নেতাকে হতে হবে জ্ঞানসম্পন্ন, মানসিকভাবে শক্তিশালী বা দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন, দৈহিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম, মেধাবী ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। আর অবশ্যই হতে হবে নেতৃত্বে পারদর্শী।

আরেক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের নেতা বানিয়েছিলাম, যারা আমার হুকুমে মানুষকে পথ দেখাত।’ (সুরা আম্বিয়া : ৭৩) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, একজন নেতার বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষকে আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথে আহ্বান করা এবং আল্লাহতায়ালার বিধান অনুযায়ী মানুষকে পরিচালনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘সফরে লোকদের সেবা করেন যিনি, তিনিই নেতা। সুতরাং যে ব্যক্তি সঙ্গীদের খেদমতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন; আল্লাহর পথে শাহাদতবরণ ছাড়া অন্য কোনো আমল দিয়ে কেউ ওই ব্যক্তির মর্যাদা লাভ করতে পারে না।’ (শুআবুল ইমান : ৮০৫০)

অর্থাৎ, একজন নেতার বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি কখনো জনগণের ওপর কর্তৃত্বপরায়ণ হবেন না; বরং জনগণের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে সর্বাবস্থায় সেবার মানসিকতা নিয়ে তাদের পাশে থাকবেন। এছাড়া সুন্দর আচরণ, নৈতিকতা, ধৈর্যশীলতা, বিনয়, সত্যবাদিতা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি একজন আদর্শ নেতার জরুরি গুণাবলি।

একজন সত্যাশ্রয়ী নেতার জন্য আরো বেশ কয়েকটি গুণ আছে। যেমন-

ইনসাফ : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের আদেশ দেন।’ (সুরা নাহল : ৯০)

আমানতদারিতা : নেতৃত্ব একটি আমানত, ব্যক্তিগত স্বার্থের জায়গা নয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, আমানত তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে।’ (সুরা নিসা : ৫৮)

আল্লাহ-ভীতি : যে নেতা আল্লাহকে ভয় করেন, তিনি কখনো জুলুম করতে পারেন না। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু বা তাকওয়াবান। (সুরা হুজুরাত : ১৩)

শুরা বা পরামর্শ গ্রহণ : একক সিদ্ধান্ত নয়, উম্মাহকে সঙ্গে নিয়ে চলাই আদর্শ নেতৃত্ব। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের সব কাজ পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।’ (সুরা শুরা : ৩৮) রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আল্লাহর নবী ও সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষাগুরু। তথাপি তিনি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তার শিষ্য-সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন।

আগামী কয়েকদিন পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমরা জানি, এবারের নির্বাচনটি অন্যরকম তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী ১২ তারিখ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে কারা পরবর্তী পাঁচ বছর বাংলাদেশকে পরিচালনা করবে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রতিটি দায়িত্বশীল মুসলিম ও সচেতন নাগরিককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাকে তিনি ভোটের মাধ্যমে নেতা হিসেবে নির্বাচন করতে চান। শুধু হুজুগ বা জোয়ারের তোড়ে নয়, সিদ্ধান্ত নিতে হবে আল্লাহ ও রসূলের নীতির আলোকে। কারণ কিয়ামতের দিন আপনার ভোটের দায়ও আপনাকেই বহন করতে হবে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া কাশেফুল উলুম মাদরাসা, মধুপুর, টাঙ্গাইল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...