মুসলিম বিশ্বে মার্কিন বিনোদনশিল্পের প্রভাব বাড়ছে

মুসলিম বিশ্বে মার্কিন বিনোদনশিল্পের প্রভাব বাড়ছে

মুসলিম দেশগুলোতে জনপ্রিয় বিনোদনের বড় একটি অংশ এখন পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে। এর ফলে মুসলিম পরিবার ও সমাজের জন্য এ ধরনের বিনোদন কতটা উপযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে বিনোদনের প্রকৃতি কী হওয়া উচিত এবং মুসলমানদের জন্য বিনোদনের উপযুক্ত ধরন কী হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

মুসলিম বিশ্বে মার্কিন বিনোদনশিল্পের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট নীতি, যার বড় একটি অংশ অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। অস্ত্রের বাইরে বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় রপ্তানি পণ্য হলো বিনোদন। ফলে বিনোদনকে শুধু শিল্প, রুচি কিংবা মানের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না; এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিকও আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

‘বেওয়াচ’ ও ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো জনপ্রিয় মার্কিন অনুষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে। তবে এসব অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনার আগে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন করা দরকার—বিনোদন আসলে কী? পশ্চিমা বিনোদননির্ভরতা মুসলিম সমাজের সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধনে কী প্রভাব ফেলছে? ‘মুসলিমস অ্যান্ড দ্য প্রবলেম অব মডার্ন এন্টারটেইনমেন্ট’ শীর্ষক নিবন্ধে নিজস্ব সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিনোদনের বিকল্প ধারা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ইউসুফ আল-খাব্বাজ।

বিনোদন যখন পণ্যে পরিণত হয়

একসময় বিনোদন ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অংশ। অতিথিকে আপ্যায়ন করা, আনন্দ দেওয়া কিংবা আন্তরিকতার সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যেও বিনোদনের প্রকাশ ঘটত। পরে বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে বিনোদন যুক্ত হয়ে যায়। স্থান, কাল ও সমাজভেদে বিনোদনের ধরনও ছিল আলাদা। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে বিনোদনের ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন বিনোদন বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বোঝানো হয় গণমাধ্যমে তৈরি বিভিন্ন পণ্য, যা বিশ্ববাজারে অন্য পণ্যের মতোই কেনাবেচা হয়।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, মানুষের আন্তরিকতা, আতিথেয়তা ও পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয় কীভাবে এমন বৈশ্বিক করপোরেট ব্যবস্থার হাতে চলে গেল, যার প্রধান লক্ষ্য মুনাফা অর্জন? কেন মানুষ নিজেরাই একে অপরকে আনন্দ দেওয়ার পরিবর্তে দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানের তৈরি বিনোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল?

আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক গণমাধ্যমের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বিনোদনের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন মানুষের পক্ষে কি আবার নিজস্ব বিনোদনচর্চায় ফিরে যাওয়া সম্ভব? মানুষ কি করপোরেট ব্যবস্থার বাইরে থেকেও নিজেদের আনন্দের ব্যবস্থা করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিনোদনের অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

আধুনিক বিশ্বে বিনোদনের সঙ্গে ভোগবাদও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি শিশুদের চিন্তাশক্তি বিকাশে কিছুটা সহায়ক হতে পারে—এমন খেলনা ও খেলাধুলাও এই প্রবণতার বাইরে নয়। অভিভাবকেরা অনেক সময় সন্তানদের গণমাধ্যমনির্ভর বিনোদনের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে পারেন না। বাড়ির বাইরে সমবয়সীদের চাপের কারণেও শিশুদের পক্ষে এ ধরনের বিনোদন এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে।

আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত অন্য অনেক জনগোষ্ঠীর মতো মুসলমানেরাও এখন অন্যের তৈরি বিনোদনের ভোক্তায় পরিণত হয়েছেন। এটি আধুনিক সমাজের একটি গভীর সমস্যা, যা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে হয়। অতীতে মানুষ নিজেরা এবং পরস্পরকে আনন্দ দেওয়ার জন্য নানা পদ্ধতি ব্যবহার করত। এসবের বড় অংশই ছিল সামাজিক ও পারিবারিক কর্মকাণ্ডকেন্দ্রিক। এখন সেই দায়িত্ব অনেকাংশে চলে গেছে দূরবর্তী নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানের হাতে।

এর সমাধান একদিকে সহজ, অন্যদিকে কঠিন। সহজ অংশটি হলো ভোগবাদ এড়িয়ে চলা। কাউকে বিনোদনপণ্য কিনতে বা টেলিভিশন দেখতে বাধ্য করা হয় না। সর্বশেষ মডেলের খেলনা কেনার জন্য কাউকে অস্ত্রের মুখে দোকানে নিয়ে যেতে হয় না, কিংবা প্রতিদিন টেলিভিশন দেখার জন্য কাউকে চেয়ারে বেঁধে রাখতেও হয় না। তারপরও মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের বিনোদনের দায়িত্ব দূরের, অচেনা নির্মাতাদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের বিকল্প কী?

বিনোদন থেকে সরে আসার কথা বলা সহজ। কিন্তু এরপর কী করা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। টেলিভিশন বন্ধ করে দিলে, প্লাস্টিকের খেলনা সরিয়ে ফেললে কিংবা কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত করলে অবসর কাটানোর বিকল্প কী থাকবে? এই প্রশ্ন থেকেই সামনে আসে নিজস্ব সংস্কৃতি তৈরি ও চর্চার বিষয়টি। মুসলমানেরা কি কেবল অন্যের তৈরি সংস্কৃতি গ্রহণ করবেন, নাকি নিজেরাও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্রষ্টা হয়ে উঠবেন?

করপোরেট ভোগবাদী ব্যবস্থার ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কোন উপাদানগুলো ফিরিয়ে আনা যায়, তা খুঁজে দেখা প্রয়োজন। ইলেকট্রনিক যন্ত্র বন্ধ করে দিলে অনেকে যে শূন্যতা অনুভব করবেন, তা পূরণে নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চা কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও ভাবতে হবে। এ জন্য প্রথমেই বিনোদনের গুণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা প্রয়োজন। বিনোদন কি অপরিহার্য? যদি তা হয়, তাহলে কেন? এর উদ্দেশ্য কী এবং মানুষের জীবন ও সমাজে এর ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

শিশুদের গণমাধ্যমনির্ভর বিনোদন থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের ওপর ‘বার্নি’ বা ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো অনুষ্ঠানগুলোর চেয়েও বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের অনেককেই এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে গড়ে তোলা হয়, যা মূলত ভোক্তা হিসেবে অভ্যস্ত করে। শিক্ষা ও স্বাধীন চিন্তার কথা বলা হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানুষের সম্ভাবনাকে সীমিত করে ফেলেছে। ফলে অনেকেই নিজেরা কীভাবে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, তা ভাবতেও অভ্যস্ত নন।

গণমাধ্যম কি পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করছে?

আধুনিক বিশ্বে বিনোদনের প্রশ্নটি ক্রমেই গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মানব ইতিহাসের বিচারে এটি তুলনামূলক নতুন একটি প্রবণতা। বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই মানুষ নিজেদের আনন্দের জন্য নানা আয়োজন করত এবং অন্যদেরও তাতে যুক্ত করত।

আধুনিক মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করা যাক। পরিবারের শিশুরা এক ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলছে। বাবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখছেন। মা ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন কিংবা ফোনে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছেন। আর দাদি বা নানি পড়ছেন কোনো সাময়িকী কিংবা নতুন উপন্যাস।

সব পরিবারের চিত্র এমন না হলেও এটি আধুনিক জীবনের পরিচিত একটি বাস্তবতা। এটি কেবল কাকতালীয় ঘটনা নয়; বিপণন কৌশলের মাধ্যমে মানুষকে আলাদা আলাদা দর্শকগোষ্ঠীতে ভাগ করার একটি প্রক্রিয়া। গণমাধ্যম ও বিপণনের ভাষায় একে বলা হয় ‘অডিয়েন্স সেগমেন্টেশন’।

বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক আলাদা বিনোদনের এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা না করে শুধু নারী-পুরুষের পৃথক অবস্থান বা মেলামেশার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোন ধরনের বিনোদন মানুষকে একত্র করে এবং কোনটি তাদের বিচ্ছিন্ন করে?

ছেলে ও পুরুষেরা একসঙ্গে, মেয়ে ও নারীরা একসঙ্গে কিংবা নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ মিলেমিশে আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন না কেন? পরিবার ও সমাজে এমন যৌথ বিনোদনের চর্চা কোথায় হারিয়ে গেল?

মূল সমস্যা মুসলমানদের মধ্যে নারী-পুরুষের পৃথক থাকার প্রবণতা নয়; বরং ব্যাপকভাবে উৎপাদিত এবং নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তৈরি বিনোদন মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যকে দুর্বল করছে। এতে মুখোমুখি যোগাযোগের জায়গা দখল করছে পর্দানির্ভর অভিজ্ঞতা।

সুস্থ বিনোদন গড়ে তুলতে হলে মানুষকে আবার কাছাকাছি আনার উপায় খুঁজতে হবে। তা না হলে পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি ধারণায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

পশ্চিমা বিনোদনের অনুকরণ কি সমাধান?

পশ্চিমা বিশ্বের কিছু মানুষের ধারণা, নাটক, কৌতুক অনুষ্ঠান, গেম শো কিংবা বিজ্ঞাপনের নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী হিসেবে মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়লে সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিজেদের বিনোদনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণও বাড়বে।

কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে দিনের বেলার ধারাবাহিক নাটক ও পরিস্থিতিনির্ভর কৌতুক অনুষ্ঠানের প্রচলন শুরু হলেও আরব বিশ্বের বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলেও এ ধরনের অনুষ্ঠান প্রচুর রয়েছে। উদাহরণ হচ্ছে এলবিসি, এমবিসি ও মুস্তাকবাল চ্যানেল।

এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ মুসলমানদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোনো কোনো অনুষ্ঠান এমনভাবে নির্মিত হয় যে তা নিজেরাই নিজেদের ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত হয়। আবার কোনো অনুষ্ঠানকে পশ্চিমা দর্শকেরাও ব্যঙ্গাত্মকভাবে দেখতে পারেন।

অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয়ভাবে নির্মিত বিনোদন বিশ্ববাজারে প্রচলিত অনুষ্ঠানের নিম্নমানের অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো নতুন প্রবণতা জনপ্রিয় হলে আঞ্চলিক নির্মাতারা সেটিকে প্রায় হুবহু অনুসরণ করে স্থানীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর উদাহরণ আরব টেলিভিশনসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ‘রিয়েলিটি টিভি’র জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া।

তাই নিজস্ব বিনোদন গড়ে তোলার অর্থ কেবল মার্কিন অনুষ্ঠানকে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিতে উপস্থাপন করা নয়। প্রয়োজন এমন বিনোদন তৈরি করা, যা স্থানীয় সমাজের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

সংগীত, ভিডিও গেম ও ধর্মীয় বিতর্ক

টেলিভিশনের বাইরেও মুসলিম সমাজে দৈনন্দিন জীবনের নানা বিনোদনচর্চা রয়েছে, যেগুলোর কিছু নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সংগীত শোনা কিংবা কল্পনানির্ভর কম্পিউটার গেম খেলার কথা বলা যায়। কিছু মানুষ এসব বিনোদন নিষিদ্ধ করার জন্য ফতোয়াও চাইছেন।

কিন্তু এ বিষয়ে ফতোয়া কার্যকর হওয়ার পেছনেও বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতি কাজ করে। বিনোদন নিয়ে ফতোয়াগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সেগুলোর বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নতা রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সময় ও স্থানের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে।

বর্তমান যুগ গণমাধ্যমনির্ভর। ফলে সংগীত শোনার কথা বললে এখন অনেক ক্ষেত্রে বোঝানো হয় ইলেকট্রনিক মাধ্যমে দূরের কোনো শিল্পীর পরিবেশনা শোনা। টেলিভিশন দেখা কিংবা কম্পিউটার গেম খেলার ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযুক্তিনির্ভর অভিজ্ঞতার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।

তাই কেবল যন্ত্রপাতি ও ডিজিটাল উপাদানের ব্যবহার নিয়ে ফতোয়া চাওয়ার পাশাপাশি আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। নিজেদের জীবনযাপন, বিনোদনের অভ্যাস এবং এসবের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। মানুষ গণমাধ্যমের যুগ আসার আগে কীভাবে আনন্দ উপভোগ করত, তা নিয়েও ভাবতে হবে।

এ প্রশ্ন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়। মানবসমাজের একটি বড় অংশই এখন নিষ্ক্রিয়ভাবে বিনোদন ও অন্যান্য পণ্য গ্রহণ করছে। টেলিভিশনে কী দেখা উচিত কিংবা আদৌ টেলিভিশন দেখা উচিত কি না, সে বিষয়ে অন্যের কাছ থেকে নির্দেশনা চাওয়াও এক অর্থে ভোক্তা হিসেবে নির্ভরশীলতার প্রকাশ।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধরনও এ প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখে। শিক্ষার নামে পরিচালিত কিছু ব্যবস্থা শিশুদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে অন্যের তৈরি বিনোদন, পরামর্শ কিংবা সেবার ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।

তাই সংগীত বা টেলিভিশন নিয়ে মানুষের অস্বস্তিকে কেবল অপরাধবোধের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর গভীরে মানুষের নিজস্বতা ও মানবিক সক্ষমতার কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকতে পারে।

নিজস্ব সংস্কৃতিতে বিনোদনের চর্চা বাড়ানোর আহ্বান

ইসলাম একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে বাস্তবমুখী, সামষ্টিক ও চিন্তাশীল কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেয়। লেখকের মতে, আধুনিক বিনোদনের অনেক ধরনই এসব বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে সরে গেছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমনির্ভর, ব্যাপকভাবে উৎপাদিত বিনোদনের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক।

তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বিনোদনের সঙ্গে যুক্ত, সাধারণত ভোক্তা হিসেবে। তাই শুধু কোনো কিছুকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং মানুষ কী ধরনের বিনোদন গ্রহণ করছে, কেন করছে এবং এর বিকল্প কী হতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

এর পাশাপাশি মুসলমানদের নিজেদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিনোদন তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে। এর অর্থ মার্কিন ‘রিয়েলিটি টিভি’র মুসলিম সংস্করণ কিংবা কার্টুন ‘সাউথ পার্ক’-এর আরব সংস্করণ তৈরি করা নয়। বরং পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন বিনোদনের চর্চা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা সব সময় পর্দা বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হবে না।

মানুষ সংগীত শুনতে চাইলে নিজেরাই সংগীতচর্চা করতে পারে। ছবি দেখতে ভালো লাগলে ছবি আঁকা কিংবা আলোকচিত্রের চর্চা করা যায়। গল্প শুনতে চাইলে একে অপরকে গল্প বলা যেতে পারে।

একসময় গল্প বলা ছিল সম্মানিত একটি শিল্প। পরিবারের সদস্যরা রাতে একসঙ্গে বসে গল্প বলতেন ও শুনতেন। পরে বইয়ের মাধ্যমে গল্পের নির্দিষ্ট রূপগুলো ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম নির্বাচিত গল্পগুলোকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়।

মানুষের আনন্দ পাওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা হলো সুন্দর শব্দ শুনতে চাওয়া, আকর্ষণীয় ছবি দেখতে চাওয়া এবং মনোগ্রাহী গল্প উপভোগ করা। তাই গণমাধ্যমের বিশাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি উপায় হতে পারে পরিবার ও কমিউনিটিতে সরাসরি অংশগ্রহণমূলক বিনোদন গড়ে তোলা।

সৃজনশীলতার মাধ্যমে অবসরকে অর্থবহ করা

শুরুটা হতে পারে বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল শিল্পচর্চায় মানুষকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে। এর উদ্দেশ্য কেবল দক্ষতা অর্জন, পেশা গঠন কিংবা কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা নয়। বরং টেলিভিশন ও কম্পিউটারের পর্দার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানোর ফলে মানুষের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করাও এর লক্ষ্য হতে পারে।

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মুসলমানেরা অলংকরণ, পরিবেশনাশিল্প, ভাস্কর্য ও অন্যান্য দৃশ্যশিল্প, সংগীতসহ নানা ধরনের শিল্পচর্চায় সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন। এসব চর্চার মধ্যে চিন্তা, মনন ও সৃজনশীলতার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের মানুষের জন্য এগুলো আনন্দের উৎসও হতে পারে।

অবসরে শখের বশে এসব চর্চা করা দূরবর্তী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তৈরি বিনোদনপণ্য গ্রহণের চেয়ে বেশি অর্থবহ হতে পারে—বিশেষত যখন সেই পণ্যগুলোর নৈতিক ও মূল্যবোধগত দিক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ ধরনের পরিবেশ গড়ে তুলতে পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগ প্রয়োজন। বাড়ির ভেতরে ও বাইরে এমন পরিসর তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষ আবার নিজেরা আনন্দ উপভোগ করতে এবং অন্যদের আনন্দ দিতে শিখবেন।

এর উদ্দেশ্য কেবল সময় কাটানো নয়; বরং ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত চিন্তাশীল, সৃজনশীল ও সামাজিক যোগাযোগের ধারাকে নতুন করে আবিষ্কার করা।

বিনোদননির্ভরতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট

মার্কিন বিনোদনের প্রতি ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা মুসলিম বিশ্বসহ বিভিন্ন সমাজে পরিচয় সংকটের বৃহত্তর সমস্যার একটি লক্ষণ। তরুণদের একটি অংশ এখন আর স্থানীয় সংস্কৃতিতে সন্তুষ্ট নয়; তারা মার্কিন জীবনধারার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে সেই জীবনধারার যে চিত্র দেখা যায়, তা অনেক সময় বাস্তবতার পরিবর্তে একটি অতিরঞ্জিত উপস্থাপন।

স্থানীয় নির্মাতারা আবার এসব উপস্থাপনার অনুকরণ করেন। এভাবে তৈরি হয় গণমাধ্যমনির্ভর এক কল্পনার জগৎ। ভাষা ও জাতীয়তার পার্থক্য থাকলেও এসব বিনোদনের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রেই একই রকম থাকে।

মার্কিন বিনোদনের একটি বড় অংশে জীবনকে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসেবে দেখানো হয়, সুখকে কেনাবেচার পণ্যে পরিণত করা হয় এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে অন্য সব কিছুর ওপরে স্থান দেওয়া হয়। জীবন যেন শেষ না হওয়া আনন্দ ও খেলার একটি চক্র।

এ অবস্থায় কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। আগের যুগের তুলনামূলক স্বাধীন সংস্কৃতির মানুষ কীভাবে নিজেদের আনন্দের ব্যবস্থা করত? গণমাধ্যমের যুগের আগে মানুষ কীভাবে একে অপরকে আনন্দ দিত? বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আনন্দ ও সুখের ধারণা কী? পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করার মতো বিনোদন কেমন হওয়া উচিত?

এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা এবং স্থানীয় ও কমিউনিটিভিত্তিক বিনোদনের ধারণা ও চর্চা গড়ে তোলার উদ্যোগ না নিলে মুসলমানেরা অন্যের তৈরি বিনোদনের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।

বিনোদনকে শুধু নিষেধ বা অনুমোদনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে এর উদ্দেশ্য, সামাজিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা নিয়ে ভাবতে হবে। পরিবার ও সমাজে নিজস্ব সৃজনশীলতা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং ঐতিহ্যভিত্তিক বিনোদনের চর্চা বাড়ানো গেলে গণমাধ্যমনির্ভরতার বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন