রমজান কেবল আত্মসংযমের মাস নয়, এটি মানুষের প্রতি সহমর্মিতার এক অনন্য প্রশিক্ষণও। সারাদিন রোজা রেখে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করা, অভাবীদের জন্য দান-সাদাকাহ করা এবং অন্যের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া- এসবই রমজানের সামাজিক শিক্ষা। ইসলাম আমাদের একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছে, রমজান সে শিক্ষাকে বাস্তবে অনুশীলনের সর্বোৎকৃষ্ট সুযোগ তৈরি করে।
রমজানে সারা দিন উপবাস থেকে একজন রোজাদারের ক্ষুধার্ত থাকার অভিজ্ঞতা হয়, যা অভাবগ্রস্তদের বাস্তবতা উপলব্ধিতে অত্যন্ত কার্যকরী। এ অনুভূতি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত গরিব-দুঃখীদের প্রতি আমাদের আরো বেশি দায়িত্ববান ও কর্তব্যপরায়ণ করে তোলে।
সে দায়িত্ব থেকে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য কার্যকরভাবে নানাবিধ পদক্ষেপ ইসলাম আমাদের জন্য অবশ্যম্ভাবী করে দিয়েছে। সেসব কার্যক্রমের সর্বোচ্চ প্রয়োগ আমরা এই রমজান মাসেই দেখতে পাই। তার মধ্যে গরিব-মিসকিন, অনাহারীর মুখে খাদ্য তুলে দেওয়া, অভাবগ্রস্তের অভাব পূরণে সহায়তা করা, অসহায়ের প্রতি সহায় হওয়াÑ সবই রমজানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একজন রোজাদার পালন করেন।
অন্যকে সাহরি, ইফতারি খাওয়ানো এবং সে মতে আর্থিক সহযোগিতা এ মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। রাসুল (সা.) বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘রমজানে উত্তম দান হলো একজন রোজাদারকে ইফতার করানো।’ (তিরমিজি : ৮০৭)
এ কাজটি যেন প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি উৎসাহের সঙ্গে করেন, সে জন্য তিনি পুরস্কারও ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্য এটা তার গুনাহের ক্ষমা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে। আর রোজাদারের সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কম করা হবে না।’ (বুখারি : ১৯২৮)
এখানে ধনী-গরিব উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এর মাধ্যমে অন্যকে খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে উঠবেÑ এটাই স্বাভাবিক। এমনসব আয়োজনে আশপাশের গরিব-মিসকিনকে আমরা অবশ্যই শামিল রাখি। তাছাড়া রোজার কাফফরা হিসেবে ফকির-মিসকিনকে খাওয়ানোর বিধানও করা হয়েছে।
রমজান মাসকে জাকাত আদায়ের মাস বলেও আখ্যায়িত করা হয়। কারণ, এ মাসে সবচেয়ে বেশি জাকাত আদায় করা হয়। জাকাত ধনীদের সম্পত্তিতে গরিবের অধিকার হিসেবে কোরআন সাব্যস্ত করেছে (সুরা আল-যারিয়াত, ৫১:৫৬)। এটি ধনীদের থেকে নিয়ে গরিবদের মাঝে বণ্টন করা হয়। ফলে ধনী-গরিবের দূরত্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই লোপ পায়। গড়ে ওঠে এক ভারসাম্যপূর্ণ ও সুষম সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ফলে এটি শুধু রোজাদারের জন্য আত্মসংযমের ঢাল নয়, বরং সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ ও সহানুভূতির ঢালও বটে।
জাকাতই গরিবের একমাত্র হক নয়। বরং একজন ধনী ব্যক্তি জাকাত আদায়ের পরও গরিবদের প্রতি তার কর্তব্য রয়ে যায়। ফলে বিধান করা হয়েছে সাদাকাহর। এই সাদাকাহদাতাকে নানাবিধ বিপদ থেকেও রক্ষা করেন আল্লাহ। আবার রমজান মাসে সব আমলের সওয়াব বেশি হওয়ার কারণে সচ্ছল ব্যক্তিরা বেশি বেশি করে সাদাকাহও করেন। ফলে এসব সাদাকাহ গরিব-দুঃখীদের মাঝে স্বস্তি নিয়ে আসে; জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। উভয়েই প্রশান্তির সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সৃষ্টিকর্তা এক আল্লাহর।
তদুপরি রমজান ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, কর্মকর্তা-কর্মচারী-সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করায়। সবাই একসঙ্গে রোজা রাখেন, একসঙ্গে ইফতার করেন, একসঙ্গে তারাবির নামাজ পড়েন। এটি এক সামাজিক সাম্যের অনুপম দৃষ্টান্ত। একে অপরের পাশে থেকে উপলব্ধির এক অনুপম কার্যকরী পন্থা হয়ে ওঠে রমজান মাস। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের আশপাশে অনেক মানুষ আছে, যারা প্রতিদিন কষ্ট ভোগ করে। আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।
রমজান শেষ হয় ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে। এ দিন সকালে অবশ্যকরণীয় কাজ হলো ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায় করা। এটি রোজাদারের অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি মার্জনা করে আর এতে গরিব-দুঃখীর ঈদ হয়ে ওঠে আরো আনন্দময়। ভাগাভাগি হয় খুশির। এটিও রমজানের শিক্ষা।
এই মাস আমাদের ধৈর্য, দয়া ও সহানুভূতি শেখায়-যা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। রমজান মানবতার শিক্ষা দেয়, আমাদের সহমর্মী করে তোলে এবং দানশীলতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদতই নয়, বরং সামাজিক কল্যাণের এক মহাসম্মেলন।
লেখক : শিক্ষক, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

