খন্দকের যুদ্ধে নেপথ্য নায়ক নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)

আব্দুল্লাহ আল মুবাশ্বির

খন্দকের যুদ্ধে নেপথ্য নায়ক নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)

ইতিহাসের পালাবদল কিংবা ভাগ্য-পরিবর্তনকারী প্রত্যেকটি প্রেক্ষাপটে কিছু মহামানবের গল্প থাকে, যারা বরাবরই অপঠিত থেকে যান। ঘটনাগুলো সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল থাকলেও সেই মহান ব্যক্তিদের সম্পর্কে খুব কমসংখ্যক মানুষই অবগত থাকে। তেমনই একজন ব্যক্তির নাম নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)।

হিজরি পঞ্চম সাল। খন্দকের যুদ্ধ (Battle of the Trench) শুরু হয়ে গেছে। মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে গাতফান এবং তাদের মিত্র আরব গোত্রগুলোর পাশাপাশি বনু নাজিরের ইহুদিরা সম্মিলিতভাবে মদিনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে বনু নাজিরের নেতা হুয়াই ইবন আখতাবের চক্রান্তে মদিনার অভ্যন্তরে বসবাসকারী বনু কুরাইজাও মুশরিকদের মিত্রশক্তিতে পরিণত হয়। বনু কুরাইজা মদিনার অভ্যন্তরে অবস্থান করায় এবং মদিনা সনদ অনুযায়ী মুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকায় ওই দিকে কোনো পরিখা খনন করা হয়নি। কুরাইজাদের এই গোপন বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছে যায়। তাদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ভীতি ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তাছাড়া কুরাইজাদের অধিকারে ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ তলোয়ার, দুই হাজার বর্শা, ৩০০ বর্ম ও ৫০০ ঢাল। তারা পেছন থেকে আক্রমণ করলে যুদ্ধের গতিপথ বদলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল।

বিজ্ঞাপন

এমন সংকটময় মুহূর্তে একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হেঁটে আসতে দেখা গেল গাতফান গোত্রের নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)-কে। তিনি এসে বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; কিন্তু আমার গোত্র এখনো সে খবর জানে না। আপনি অনুমতি দিলে আমি একটি কৌশল বাস্তবায়ন করতে চাই।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আপনি তো আমাদের মধ্যে একজন মাত্র ব্যক্তি। আপনি যদি কৌশলের মাধ্যমে শত্রুদের দুর্বল করতে পারেন, তবে সেটাই উত্তম। আপনি যান, যা ইচ্ছা করুন। কারণ যুদ্ধ কৌশলেরই নাম।’  (আল-বুখারি : ৩০৩০)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমতি পেয়ে নুয়াইম (রা.) এক অসাধারণ কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে গেলেন। প্রথমে তিনি বনু কুরাইজার কাছে গিয়ে তাদের অন্য মিত্রদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে সতর্ক করলেন। তিনি বললেন, যদি অবরোধ ব্যর্থ হয়, তাহলে কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে তোমাদের মুহাম্মদের হাতে ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করবে না। তাই তোমাদের উচিত, যুদ্ধ শুরুর আগে কুরাইশদের কয়েকজন নেতাকে জিম্মি হিসেবে নিজেদের কাছে রাখার দাবি করা। নুয়াইমের এ পরামর্শ বনু কুরাইজার মনে গভীর প্রভাব ফেলল। তারা ভাবতে শুরু করল, সত্যিই তো—যদি কুরাইশরা পালিয়ে যায়, তবে তাদের পরিণতি কী হবে? ফলে কুরাইশদের প্রতি তাদের মনে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি হলো।

এরপর নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.) গেলেন মিত্রবাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ান ইবন হারবের কাছে। তিনি বললেন, ‘আপনি কি জানেন, বনু কুরাইজা মুহাম্মদের সঙ্গে আবার সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে? আমি জানতে পেরেছি, তারা আপনাদের কয়েকজন নেতাকে জামিন বা জিম্মি হিসেবে নিজেদের কাছে চাইবে। এরপর সুযোগ পেলে তাদের মুহাম্মদের হাতে তুলে দেবে, যাতে তারা তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। তাই সাবধান! তারা যদি আপনাদের কাছে কাউকে জিম্মি হিসেবে চায়, তাহলে কোনো অবস্থাতেই তাদের হাতে কাউকে তুলে দেবেন না।’

ফলে কুরাইশ ও গাতফানের নেতারা ইকরিমা ইবনে আবু জাহলসহ একটি প্রতিনিধিদল বনু কুরাইজার কাছে পাঠালেন। তারা জানালেন, অবরোধ দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে; ঘোড়া-উট মারা যাচ্ছে। তাই এখন প্রয়োজন সবাই মিলে একযোগে মুসলিমদের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ চালানো। বনু কুরাইজা জবাবে বললেন, ‘আজ শনিবার। আমরা এদিন যুদ্ধ করতে পারব না। আর তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কয়েকজন নেতাকে জিম্মি হিসেবে আমাদের কাছে না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরাও যুদ্ধে অংশ নেব না।’

প্রতিনিধিদল ফিরে গিয়ে এ কথা আবু সুফিয়ানকে জানালে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর শপথ! নুয়াইম আমাদের সত্য কথাই বলেছিল।’ অন্যদিকে কুরাইশদের প্রত্যাখ্যানের খবর বনু কুরাইজার কাছে পৌঁছালে তারাও বলল, ‘আল্লাহর শপথ! নুয়াইম আমাদের কাছেও সত্য কথাই বলেছিল।’

এভাবেই নুয়াইম ইবনু মাসউদের অসাধারণ বিচক্ষণতায় উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হলো। মিত্রবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ল, আর তাদের সম্মিলিত শক্তিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিল। নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.) তার পরিকল্পনায় সম্পূর্ণ সফল হলেন। অথচ তার গোত্র তখনো জানত না, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি কুরাইশ ও বনু কুরাইজার মধ্যে এমন সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিলেন, যা তাদের সম্মিলিত যুদ্ধপরিকল্পনাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছিল।

এরপর আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য চূড়ান্ত সাহায্য পাঠালেন। তিনি রণক্ষেত্রে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু পাঠালেন, যা মুশরিকদের তাঁবু উপড়ে ফেলল, আগুন নিভিয়ে দিল, রান্নার হাঁড়ি উল্টে দিল এবং পুরো যুদ্ধের চিত্রই পাল্টে দিল। আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্যে মিত্রবাহিনী পরাজিত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হলো।

এই মহাযুদ্ধে কাফিরদের সম্মিলিত আক্রমণ থেকে মুসলিমদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা পালন করেছিলেন এই মহান সাহাবি। তার অনন্য যুদ্ধকৌশলের ফলে চতুর্মুখী শত্রুর আক্রমণ থেকে মুসলিম উম্মাহ রক্ষা পায়। ইয়াওমুল আহজাব তথা খন্দকের সেই চূড়ান্ত অভিযানে ব্যর্থ হওয়ার পর কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা আর কখনো মদিনার বিরুদ্ধে এমন বৃহৎ সম্মিলিত আক্রমণ চালানোর সাহস করেনি। ইসলামের ইতিহাসে নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.)-এর নাম আজও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন