একটি সভ্য, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো আইনের শাসন এবং মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই গুরুদায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তারা হলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু দায়িত্ব পালনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগ কিংবা হেফাজতে নির্যাতনের মতো ঘটনা যখন সামনে আসে, তখন তা কেবল প্রচলিত আইনের লঙ্ঘনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিকেও আঘাত করে। ইসলামের দৃষ্টিতেও এ ধরনের আচরণ জুলুম এবং এর কোনো নৈতিক বৈধতা নেই। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা সমাজে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতা, দুর্বল মানুষের অধিকার এবং প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক মর্যাদা রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশিং প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
ইসলামের শাসন ও প্রশাসনচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা ও জনকল্যাণ। পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দিয়েছেন; একই সঙ্গে অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেছেন। এই ঐশী নির্দেশনা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যও একটি মৌলিক নৈতিক মানদণ্ড। ইসলামে অপরাধ প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হলেও তা হতে হবে ন্যায়সংগত, নিরপেক্ষ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; ব্যক্তিগত ক্ষোভ, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা ক্ষমতার দম্ভের বশে নয়।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) দায়িত্বপ্রাপ্ত সাহাবিদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘মানুষকে সুসংবাদ দাও, বিমুখ করো না; সহজ করো, কঠিন করো না।’ এই নির্দেশনার মর্ম হলো, দায়িত্বশীল আচরণ মানুষের মনে আস্থা তৈরি করবে, আতঙ্ক নয়। অতএব, পুলিশিংয়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও আস্থা প্রতিষ্ঠা করা; ভীতি ও ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা নয়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিকদের ওপর শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন চালানো ইসলামের পরিভাষায় জুলুম। ক্ষমতার দম্ভে দুর্বল মানুষের অধিকার হরণকারীদের ব্যাপারে ইসলামে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহর বাণী উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি জুলুমকে আমার নিজের ওপর হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’ (মুসলিম : ২৫৭৭)
এই নির্দেশনা অত্যন্ত সুস্পষ্ট—জুলুমের নিষেধাজ্ঞা সর্বজনীন; কোনো ব্যক্তি, পদ কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য এতে ছাড় নেই। ফলে অপরাধ দমনের অজুহাতে কাউকে অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বেআইনিভাবে আটক কিংবা নির্যাতন করার কোনো সুযোগ ইসলামে স্বীকৃত নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য যখন মানুষের নিরাপত্তার রক্ষক হয়েও নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন তিনি শুধু পেশাগত দায়িত্বেরই লঙ্ঘন করেন না, বরং আল্লাহর নির্দেশিত ন্যায়বিচার ও মানবিকতার আদর্শ থেকেও বিচ্যুত হন। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার হবে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায়; কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দেওয়ার অধিকারী নন।
ইসলামের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, অভিযোগ ও প্রমাণ যথাযথভাবে যাচাই না করে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত না করা। সন্দেহ, অনুমান কিংবা জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচারের মূল চেতনার পরিপন্থী। নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় সত্য উদ্ঘাটনের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নয়; বরং তা তদন্তকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং নিরপরাধ ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই যেকোনো অপরাধের তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণ, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ইসলামের প্রাথমিক প্রশাসনিক ইতিহাসেও শাসকদের দায়িত্বশীলতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশেষ করে খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামল ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক তদারকি ও জনসাধারণের অভিযোগ শোনার দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। এসব ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের মূল শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মানুষের সেবার জন্য একটি আমানত; তা কখনো নির্যাতন কিংবা অধিকার হরণের হাতিয়ার হতে পারে না।
একটি নিরাপদ, ভীতিহীন ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের মূল পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্বের প্রতি আরো যত্নশীল হতে হবে। পুলিশ জনগণের প্রতিপক্ষ নয়; বরং জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার ও সামাজিক শান্তি রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ জানিয়েছেন, মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি তার বংশ, পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান নয়; বরং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। এই শিক্ষা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মনে করিয়ে দেয়, পদমর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না। একজন কর্মকর্তার মধ্যে তাকওয়া, মানবিকতা ও জবাবদিহিতার বোধ জাগ্রত থাকলে তার দায়িত্ব পালনে সংযম, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিফলিত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহিতা এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় আইন, সমাজ এবং আখিরাত—সর্বত্রই বহন করতে হয়। তাই আসুন, ইসলামের সুমহান ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে পুলিশ হবে জনগণের আস্থার প্রতীক, হেফাজত হবে নিরাপত্তার জায়গা, আতঙ্কের নয়; আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে নির্যাতন ও ভীতির পরিবর্তে মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে।
লেখক: স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

