প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধ আক্রমণের মাধ্যমে ভারতে ইসলামের আগমন ঘটেছিল। একে অনেকে তরবারির শক্তির ওপর ভর করে ইসলামের আগমন বলে মনে করেন। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই এই ধারণার সঙ্গে একমত নন।
তাদের মতে, ভারতে ইসলামের আগমন কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি কয়েক শতাব্দী ধরে চলা ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিণাম।
ভারতে ইসলামের প্রসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাণিজ্য। প্রাচীনকাল থেকেই ভারত গোলমরিচের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত ছিল। আরব সাগর শান্ত থাকায় এই সমুদ্রপথে আরব বণিকদের দীর্ঘদিনের প্রভাব ছিল। তারা বর্ষার সময়ে ভারতে আসতেন এবং ব্যবসা শেষে আরবে ফিরে যেতেন।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ সুলেমান নদভীর মতে, ইসলামের আবির্ভাবের পর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ আরবদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দীর্ঘদিন যোগাযোগের ফলে দক্ষিণ ভারতে 'মাপ্পিলা মুসলিম' নামে এক মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে।
রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর প্রায়ই উল্লেখ করেন যে, পরিচিত ও বিশ্বস্ত আরব বণিকদের হাত ধরেই মালাবার উপকূলে ইসলাম এসেছিল। কোনো তলোয়ারের জোরে কেরালায় ইসলাম পৌঁছায়নি। দক্ষিণ ভারতে ইসলামের আগমন সম্পর্কে বেশ কিছু তত্ত্ব প্রচলিত আছে।
প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, নবী মোহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই প্রাচীন মুজিরিস বন্দর দিয়ে কেরালায় ইসলাম এসেছিল। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মালিক বিন দিনারের উদ্যোগে নির্মিত 'চেরামন জামা মসজিদ' এই দাবির পক্ষে বড় প্রমাণ। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পেছনে কেরালার হিন্দু রাজা চেরামন পেরুমলের ইসলাম গ্রহণের গল্পও জড়িয়ে আছে।
প্রফেসর ইলিয়াসের মতে, আরবরা এখানে মূলত গোলমরিচের ব্যবসা করতে এসেছিলেন। তারা বাণিজ্যের পাশাপাশি হিসাব করার পদ্ধতি, ওজন মাপার কৌশল এবং ভালো নৌকা তৈরির প্রযুক্তিও শিখিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিকদের একাংশ ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধ ও মুলতান দখল এবং পরবর্তীতে দিল্লির সালতানাত প্রতিষ্ঠাকে রাজনৈতিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেন।
তবে আধুনিক গবেষকদের মতে, এই জয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা, জোর করে মানুষকে ধর্মান্তরিত করা নয়।
ভারতে ইসলামের প্রসারে সুফি আন্দোলনও বড় ভূমিকা পালন করেছে। একাদশ শতকের পর চিশতি ও সোহরাওয়ার্দী সিলসিলার সুফি-সন্তরা ভারতের বিভিন্ন অংশে বসতি স্থাপন করেন। তাদের খানকাহ ও দরগাহগুলো আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। আজমেরের খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগাহ এর একটি বড় উদাহরণ, যেখানে সব ধর্মের মানুষ আসেন। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের নীতি মানুষকে আকর্ষণ করেছিল।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটনের মতো পণ্ডিতরা আরেকটি নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার মূলত কৃষি উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। মুসলিম শাসকরা সুফি খানকাহ ও মসজিদগুলোকে অনুর্বর জমি দান করতেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কৃষি বসতি স্থাপন করলে স্থানীয় কৃষকরা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে, বাণিজ্য, আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি ও সামাজিক সুযোগের এক দীর্ঘ মিশ্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


