অপরাধীর বিচার নিশ্চিতে ইসলামের আদর্শ

মঈনুদ্দীন তাওহীদ

অপরাধীর বিচার নিশ্চিতে ইসলামের আদর্শ

মানুষ অপরাধ করে। নফসের তাড়নায় বা শয়তানি প্রভাবের কাছে পরাজিত হয়ে জড়িয়ে পড়ে গর্হিত কাজে। আদিযুগ থেকে এ অপরাধের প্রবণতা চলে আসছে, কখনো কম, কখনো বেশি। অপরাধের প্রবণতা তখনই কমে যায়, যখন তার শাস্তি কার্যকর হয় এবং তা হয় দৃষ্টান্তমূলক। এর বাইরে যখনই অপরাধের শাস্তি কার্যকর হয় না বা নিছক লোকদেখানো শাস্তির মুখোমুখি করা হয়, তখনই সামগ্রিকভাবে অপরাধের হার বেড়ে যায়। ইসলাম অপরাধ দমনে শাস্তির বিধান এবং তা কার্যকরের দিকটিকে অতি জরুরি বলে সাব্যস্ত করেছে। অপরাধীদের শাস্তি বিধানে আল্লাহর গৃহীত রীতি এবং বিশ্বনবীর বাস্তবায়িত কর্মপন্থায় আমরা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মোটাদাগে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথম হলো, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান এবং দ্বিতীয় হলো বিধানের কার্যকর প্রয়োগ। ইসলামে চুরির শাস্তি হাত কেটে দেওয়া। এই শাস্তির বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহতায়ালা সুরা মায়েদার ৩৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেনÑ‘যে পুরুষ ও যে নারী চুরি করে, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও, যাতে তারা নিজেদের কৃতকর্মের প্রতিফল পায় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এই শাস্তি হয় দৃষ্টান্তমূলক।’ সীমালঙ্ঘনের দায়ে শাস্তি পাওয়া বনু ইসরাঈলের কথা উল্লেখ করে আল্লাহতায়ালা আরো বলেন, ‘(তাদের এই শাস্তির ঘটনাকে) আমি তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহভীরুদের জন্য উপদেশ গ্রহণের উপাদান বানিয়েছি।’ (সুরা আল-বাকারা : ৬৬)

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীতে বিভিন্ন আইনের প্রচলন আছে। সময়ভেদে বা কোন সময়ে কোনটা বেশি কার্যকর, তা নিয়ে ভিন্ন সময় আলোচনা হতে পারে, কিন্তু কাল বা যুগভেদে কোরআন আমাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে এ কথা জানায়, গুরুত্ব বিবেচনায় অপরাধের শাস্তি হতে হয় দৃষ্টান্তমূলক। ইসলামের সোনালি সময়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপরাধের ক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া শাস্তির বিধান বাস্তবায়নে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী একবার চুরি করলে বিষয়টি কুরাইশদের ভাবিয়ে তুলল। কারণ, বংশের দিক দিয়ে সে ছিল কুরাইশ বংশের একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা। নিজেদের মর্যাদার কথা চিন্তা করে তার প্রতি শাস্তির বিধান কার্যকরের বিষয়ে কুরাইশরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। শাস্তি লঘু করার জন্য তারা পরামর্শক্রমে নবীজির প্রিয় ব্যক্তিত্ব উসামা ইবনে যায়দকে সুপারিশ করার অনুরোধ করেন। উসামা বিষয়টি আমলে নিয়ে নবীজির সঙ্গে আলোচনা করলে নবীজি উত্তর দিলেন, ‘তুমি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করতে চাও?’ তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, ‘হে লোক সকল, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হয়েছে এই কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোনো সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যদি কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তবে তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি আমার মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তবে নিশ্চয়ই আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ এরপর নবীজি সেই নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি কার্যকর করেন। (মুসলিম : ১৬৮৮)

এই হাদিসের আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, আগের জাতিগুলো ধ্বংস হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ বর্ণনা করে নবীজি বলেছেন, তারা নিজেদের মধ্যে থাকা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের অপরাধের শাস্তি কার্যকর করত না, বরং যারা তুলনামূলক নিম্নশ্রেণির, তাদের শাস্তি কার্যকর করত। বস্তুত এ সমস্যা তো আমাদের সমাজেরও, আমাদের সমাজ বা বিচারব্যবস্থায় শাস্তির কার্যকারিতা প্রয়োগ হয় শ্রেণিবিশেষে। দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীর শাস্তি কার্যকর হতে সচরাচর আমরা দেখি না। অপরাধী যদি বিরোধী দলের হন, অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালী হন, তবেই শুধু আমরা কালেভদ্রে দু-একটা শাস্তি কার্যকর হতে দেখি। বস্তুত এটা বে-ইনসাফ, অন্যায়।

দেশের সার্বিক অবস্থা ভালো নেই। সারা দেশে একের পর এক ভয়াবহ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। নরপশুদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু, গৃহবধূ, বয়োবৃদ্ধ কেউই। পুরো দেশের মানুষ এখন চরম আতঙ্কিত এবং ক্ষুব্ধ। ন্যায়বিচারের জন্য সবাই ফুঁসে উঠেছে। কয়েক দিন আগে রামিসার মতো নিষ্পাপ এক শিশুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া নারকীয় কাণ্ডের কথা সবারই তো জানা। এছাড়া চুরি, ছিনতাই, দুর্নীতি আর অন্যায় রক্তপাতের মতো অপরাধে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মিডিয়ায় না আসা অপরাধগুলোর কথা না হয় বাদ-ই দিলাম, আলোচিত অপরাধগুলোর দৃশ্যমান কোনো সাজা আজ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য হারে আমাদের চোখে পড়ছে না। অভ্যন্তরীণ চাপে কোনো-কোনো বিচারের রায় তো হচ্ছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে না রায় কার্যকরের বাস্তব দৃষ্টান্ত। এভাবে নতুন কোনো ইস্যুর ভিড়ে অপরাধীরা থাকছে শাস্তির আওতামুক্ত। ফলে অপরাধীদের মনে ভয় থাকছে না। কেমন যেন একটা বেপরোয়া ভাব। তারা যেন জানে, ক্ষমতার জোর, অর্থের জোর বা ওপরমহলের প্রভাব আছে বিধায় এ দেশে তাদের কিছুই হবে না। এ বিষয়টিই আমাদের সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের কাছে অনুরোধ, যে অপরাধে ইসলামে সুস্পষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে, তদন্তসাপেক্ষে অপরাধীর ক্ষেত্রে সেই শাস্তি দ্রুত কার্যকর করুন। আর যে অপরাধের ক্ষেত্রে ভিন্ন কোনো শাস্তির বিধান প্রবর্তনের অবকাশ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে এমন শাস্তির বিধান প্রণয়ন করুন, যা হবে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে দৃষ্টান্তমূলক। মনে রাখতে হবে, প্রয়োগ ছাড়া বিধান প্রবর্তনের কোনো মূল্য নেই।

লেখক : পেশ ইমাম, উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বদরগঞ্জ, রংপুর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন