মহান আল্লাহতায়ালার কুদরতের এক অপার বিস্ময় ভাষা। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নির্দেশনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা এবং বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই অনেক নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রুম : ২২)
একজন মুসলমানের জীবনে তার মাতৃভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভাষা বোঝা, শেখা, চর্চা করা এবং ইসলামের দাওয়াত ও অন্যান্য কল্যাণকর কাজে তা প্রয়োগ করা তার কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই আল্লাহতায়ালা সব নবী-রাসুলকে নিজ নিজ ভাষার ইলাহি বাণী দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কোরআন সুন্নাহয় ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগের কিছু শিষ্টাচার এবং বিধিনিষেধ রয়েছে।
১. সঠিক কথা বলা
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ (সুরা আহজাব : ৭০) সঠিক কথার ব্যাখ্যা হলো, যে কথা চার বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ—
ক. বিশুদ্ধ হওয়া। মহানবী (সা.) অত্যন্ত বিশুদ্ধভাষী ছিলেন। তার বাণীই বিশুদ্ধতার জ্বলন্ত প্রমাণ।
খ. সত্য হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দূরে থাকো মিথ্যা কথা বলা থেকে।’ (সুরা হজ : ৩০)
গ. গাম্ভীর্যপূর্ণ হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, কোনো পুরুষ যেন অন্য কোনো পুরুষকে উপহাস না করে। কারণ, যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। কোনো নারী যেন অন্য কোনো নারীকে উপহাস না করে। কারণ, যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।’ (সুরা হুজুরাত : ১১)
ঘ. কোমল হওয়া। মহানবী (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সে, যার কথা ও হাতের অনিষ্ট থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি : ১০)
২. স্পষ্ট ভাষায় কথা বলা
স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ভাষায় এমনভাবে কথা বলতে হবে, যেন সবাই তা বুঝতে পারে। মুসা (আ.)-এর মুখে জড়তা থাকায় তিনি আল্লাহর কাছে আবেদন করেছিলেন, ‘আমার ভাই হারুনÑসে আমার চেয়ে প্রাঞ্জলভাষী; অতএব তাকে আমার সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন, সে আমাকে সমর্থন করবে। আমি আশঙ্কা করি, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।’ (সুরা কাসাস : ৩৪)
স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ভাষা সবার জন্যই কাম্য বিষয়। প্রয়োজনে কোনো কথা তিনবার বলতে হবে। পবিত্র কোরআনে অনেক কথা তিনবার করে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘মহাপ্রলয়, মহাপ্রলয় কী? মহাপ্রলয় সম্পর্কে তুমি কী জানো?।’ (সুরা আল-কারিয়া : ১-৩) এছাড়া নবী (সা.) অনেক কথা তিনবার করে বলতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) যখন কোনো কথা বলতেন, তা তিনবার বলতেন, যেন তা বোঝা যায়। (বুখারি : ৯৫)
৩. শালীনতা বজায় রাখা
সর্বদা শালীন ভাষায় কথা বলা উচিত। কাউকে ভর্ৎসনা, গালমন্দ ও অভিসম্পাতমূলক, অশ্লীল ও অশালীন কথা ঈমানদারের জন্য মোটেও শোভনীয় নয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি কারো প্রতি ভর্ৎসনা ও অভিসম্পাত করে না এবং অশ্লীল ও অশালীন কথা বলে না।’ (তিরমিজি : ১৯৭৭)। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ আর তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি। (বুখারি : ৪৮)
৪. অনর্থক কথা না বলা
যেসব কথার মধ্যে ইহকালীন ও পরকালীন কোনো উপকার নেই, ঈমানদার ব্যক্তির তা থেকে বিরত থাকা খুবই দরকার। আল্লাহতায়ালা অনর্থক কথা বলা থেকে বেঁচে থাকাকে মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র এবং যারা অনর্থক কথা বলা থেকে বেঁচে থাকে।’ (সুরা আল-মুমিনুন : ১-৩) হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির ইসলামি গুণ এবং সৌন্দর্য হলো, অহেতুক কথা ও কাজ পরিহার করা।’ (তিরমিজি : ২৩১৮)
৫. ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ পরিহার করা
কাউকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা, অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা, অবমাননাকর ও মন্দ নামে ডাকা কোনো ঈমানদারের ভাষা হতে পারে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দনামে ডেকো না। যারা তওবা করে না, তারা জালিম।’ (সুরা হুজুরাত : ১১)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখজানুল উলুম, টঙ্গী, গাজীপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

