যৌন উন্মাদ সমাজ : দায় ও সমাধান

যৌন উন্মাদ সমাজ : দায় ও সমাধান
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

রাত তখন গভীর। খবরের কাগজ ভাঁজ করতে গিয়ে হাত থমকে যায়। শিরোনামগুলো যেন একেকটা তাজা ক্ষত—শিক্ষকের হাতে ছাত্রী লাঞ্ছিত, আপন চাচার ঘরে ভাতিজি নিরাপদ নয়, ধর্মগুরুর চাদরের নিচে লুকিয়ে থাকা হিংস্র মানুষ। যাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম সন্তানের বিদ্যা আর বিশ্বাস, তাদেরই কেউ কেউ আজ সেই বিশ্বাসকে অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। এই ব্যাধি কাউকে রেহাই দিচ্ছে না—শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব, তরুণ-বৃদ্ধ—এমনকি যাদের কাঁধে ধর্মের পোশাক, কেউই এর বাইরে নয়। প্রশ্ন জাগে—মানুষ কি হঠাৎ এমন হয়ে গেল, নাকি এই প্রবৃত্তি চিরকালই ছিল, শুধু আজ তার লাগাম খুলে গেছে?

একসময় পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানে দাবি করা হতো, প্রবৃত্তি দমন করাই অস্বাস্থ্যকর, তাকে মুক্তি দেওয়াই সমাধান। অথচ এর বহু আগে খ্রিষ্টীয় সন্ন্যাসবাদ ঠিক উল্টোপথে হেঁটে প্রবৃত্তিকে সম্পূর্ণ দমন করতে চেয়েছিল। ফল দাঁড়াল উল্টো, যা প্রকাশ্যে দমন করা হলো, তা বিকৃত হয়ে ফিরে এলো গোপনে। ইসলাম এই দুই পথের কোনোটিই নেয়নি। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, সন্ন্যাসবাদ তিনি কারো ওপর ফরজ করেননি; মানুষ নিজেই তা বানিয়ে নিয়েছিল। (সুরা হাদিদ, ৫৭:২৭) আবার নারী, সন্তান, ধন-সম্পদের প্রতি ভালোবাসাকে তিনি মানুষের চোখে সুশোভিত করেছেন বলেই জানিয়েছেন। (সুরা আলে-ইমরান, ৩:১৪) পাপ প্রবৃত্তিতে নয়, তার সীমালঙ্ঘনে—ক্ষুধা পেলে মানুষ হালাল খাবার খোঁজে, চুরি করে না; যৌন আকাঙ্ক্ষারও তেমনই একটি হালাল পথ আল্লাহ রেখে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আজকের সমাজ এক স্ববিরোধিতায় ভুগছে। একদিকে পর্দায়-বিজ্ঞাপনে অবিরাম উদ্দীপক দৃশ্য, অন্যদিকে বিয়েকে বানানো হয়েছে দুঃসাধ্য পাহাড়Ñদেনমোহরের বাড়াবাড়ি, অনুষ্ঠানের অপচয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটাই যার খরচ সবচেয়ে কম।’ (মুসনাদে আহমাদ) চোখের অসংযমও বড় কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন, ‘চোখের ব্যভিচার দেখা, কানের শোনা এবং অন্তরের কল্পনা করাÑশেষে লজ্জাস্থান তা সত্যি করে বা মিথ্যা করে দেয়।’ (বুখারি : ৬২৪৩) তাই আল্লাহ বলেছেন, ‘ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, ১৭:৩২) পাশাপাশি মুমিন নারী-পুরুষ উভয়কে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা আন-নূর, ২৪:৩০-৩১)

সমাধানের কেন্দ্রে তাই বিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকলে বিয়ে করো, না পারলে রোজা রাখো, তা ঢালস্বরূপ।’ (বুখারি, ৫০৬৬ কোরআনও অবিবাহিতদের বিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছে, ‘সামর্থ্য না থাকলে সংযম অবলম্বন করতে।’ (সুরা আন-নূর, ২৪:৩২) এখানে বহুবিয়ের প্রসঙ্গও এড়ানো যায় না। প্রয়োজন ও ন্যায়বিচারের সামর্থ্য থাকলে দুই-তিন-চার বিয়ের অনুমতি কোরআনে আছে, তবে শর্ত একটাই—সমান ন্যায়বিচার করতে না পারলে একজনেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। (সুরা নিসা, ৪:৩) আল্লাহ নিজেই সতর্ক করেছেন, ‘হৃদয়ের সম্পূর্ণ সমতা বাস্তবে সম্ভব নয়, তাই কাউকে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা যাবে না।’ (সুরা নিসা, ৪:১২৯) অর্থাৎ বহুবিয়ে লাগামহীন অনুমতি নয়, দায়িত্বশীল বিধান। বিয়ের সুযোগ না থাকলে রোজা রাখার মাধ্যমে প্রবৃত্তি দমনের নির্দেশনা রয়েছে সহিহ বুখারির হাদিসে।

চোখ সংযত রাখা আর বিয়ের দরজা খোলা রাখার পরও আসল লড়াইটা হয় নির্জনে, যেখানে কেউ দেখছে না বলে মনে হয়। ইউসুফ (আ.) প্রবল প্রলোভনের মুখে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর আশ্রয় চাই!’ (সুরা ইউসুফ, ১২:২৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় সেই যুবকও আশ্রয় পাবে, যে রূপবতী নারীর প্রলোভনে বলেছিল, আমি আল্লাহকে ভয় করি।’ (বুখারি, ৬৬০) যে নির্জনে নিজেকে সামলাতে পারে, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা এখানেই।

এই ব্যাধির সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপ প্রকাশ পায় তখনই, যখন অপরাধী দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের আসনে। যে শিক্ষক অভিভাবকতুল্য, তিনি যখন সেই বিশ্বাসকেই অস্ত্র বানান, আঘাত পড়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছিলেন, ‘নারীর ফিতনার চেয়ে বড় ফিতনা পুরুষের জন্য রাখেননি।’ (বুখারি, ৫০৯৬)—অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণহীন প্রবৃত্তি বিশ্বস্ত সম্পর্ককেও গ্রাস করে। যারা উপদেশ অগ্রাহ্য করে দুর্বলের ওপর আক্রমণ চালায়, তাদের জন্য আল্লাহ প্রকাশ্য শাস্তির বিধান রেখেছেন—‘ব্যভিচারীর ১০০ বেত্রাঘাত মুমিনদের সামনেই কার্যকর হবে।’ (সুরা নূর, ২৪:২) ‘মিথ্যা অপবাদদাতার আশি বেত্রাঘাত।’ (২৪:৪) ‘আর অশ্লীলতা ছড়ানোদের জন্য দুনিয়া-আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (২৪:১৯) কারণ যে জানে ধরা পড়বে না, সে-ই সবচেয়ে সহজে সীমা ছাড়ায়।

প্রশ্ন তাই, এটা নয় কেন প্রবৃত্তি আছে; প্রশ্ন এটাই—আমরা কেন তার নিয়ন্ত্রণের পথ কঠিন করে, উসকানির পথ সহজ করে দিয়েছি। ক্ষুধা পেলে মানুষ হালাল খাবার খোঁজে; প্রবৃত্তি জাগলেও তার হালাল পথ আছে—বিয়ে, ন্যায়সংগত বহুবিয়ে, না পারলে রোজা। প্রবৃত্তি লজ্জার নয়; লজ্জা তখনই, যখন সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া হয়। আসুন, বিয়ের পথ সহজ করি, শ্রেণিকক্ষ থেকে শোবার ঘর পর্যন্ত প্রতিটি সম্পর্ক নিরাপদ রাখি, আর হৃদয়ে জাগিয়ে তুলি সেই বোধÑকেউ দেখুক বা না দেখুক, একজন সবসময় দেখছেন।

লেখক : সিনিয়র পেশ ইমাম ও খতিব, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন