মূলত: ও প্রধানত: সেমিটিক অনার্য বঙ্গলা জাতির আদি পুরুষগণ সেই আদি কালেই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁদের নিজেদের জীবন ও পরিবেশের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ খুবই কম। জীবণ ও পরিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিচারে তার অতি অল্প ভাগ থেকে থাকে নিজের হাতে, আর বাদ বাকী ভাগের নিয়ন্ত্রণ রযে যায় অন্য কারো হাতে। জীবন ও পরিবেশের সামগ্রিকের এই ভাগা-ভাগীর উপলব্ধি থেকে উন্মেষ হযে থাকবে তাঁদের “ভাগ্য”-এর ধারণার। নিজের জীবন ও পরিবেশের কত ভাগের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে, আর কত ভাগ নয় – তা জনে জনে ভিন্ন ভিন্ন হয় বলে পরিলক্ষিত হলে মানুষ বুঝতে পারে, প্রত্যেকেরই নিজের নিজের ভাগ্য আছে।
নিজের নিজের ভাগ্য ভাল রাখার জন্য চিন্তা থেকেই সম্ভবত: ভাগ্য গণনার রেওয়াজ চালু হয়। অজ্ঞাতকে জানবার জন্য পরিবেশে লক্ষণীয় বিভিন্ন ধারা (pattern) বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে কী হবে, আর তাকে ভাল বা আরও ভাল করবার জন্য কি করা যায় তার আন্দাজের এক অভ্যাস গড়ে ওঠে, অনেকের ভেতর। এঁদের ভেতর যাঁরা বেশী বুদ্ধিমান বলে পরিচিত হন, তাঁরা ভাগ্য গণক বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় – তাদের কেউ কেউ ভাগ্যোন্নয়ণের কল্পিত বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তার নেতৃত্ব গ্রহণ করে পুরোহিত রূপে প্রতিষ্ঠিত, বরিত হন। এঁদের ভেতর অনেকে আন্তরিকভাবে প্রকৃতির নিয়ম বুঝে তার বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনা প্রবাহের ভবিষ্যত গতির একটা প্রাকৃতিক সম্ভাবণার ধারণা অর্জন করেন, ও তদ্বারা সমাজকে প্রকৃতির নিয়মেই ভবিষ্যত ঘটনা প্রবাহের একটি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ধারণার ভিত্তিতে তার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করেন। এঁরাই সমাজে বিজ্ঞানী রূপে বরিত হন। প্রকৃতির সাধারণ অভ্যাসগত নিয়মের পরিলক্ষণ ও বিশ্লেষণ ভিত্তিক তাঁদের মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ধারণাই বিজ্ঞান হিসেবে পরিচিত হয়। এই বিজ্ঞানের ভিত্তিতে উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে বাস্তব চেষ্টার পথ, প্রযুক্তি রূপে আদৃত হয় । ভাগ্য সহ, ভবিষ্যত সম্পর্কে অধিকতর নির্দিষ্ট সঠিক নির্দেশনা দিতে মাঝে মাঝেই সমাজে অবির্ভুত হন আরেক ধরণের ব্যক্তি, যাঁরা স্রেফ বুদ্ধি দিয়ে নয়, বুদ্ধিরও উর্দ্ধের বোধ মাধ্যমে প্রাপ্ত ঐশ্বরিক জ্ঞানে জ্ঞানী বোদ্ধা বা প্রবুদ্ধ, ‘বুদ্ধ । এঁদের ভেতর যাঁরা কোন মানবিক মাধ্যম বিহনেই সেই ঐশ্বরিক জ্ঞান প্রাপ্ত হন, তাঁদের নবজ্ঞান -প্রদায়ক , অর্থাত এমন জ্ঞান যা এমনই নব, বা নতুন, যা অন্য কারো পক্ষেই জানার অন্যকোন উপায় ছিল না, তার প্রদায়ক, সংক্ষেপে “নবী” বলে পরিচিত হন। আর যাঁরা তাঁদের কাছ থেকে ঐ নবী-প্রদত্ত জ্ঞান, তথা নববী জ্ঞান প্রাপ্ত হন, তাঁরা হন নবীর উত্রসুরী, তাঁদের জ্ঞানের সম্পদ-সত্ব আগলে রাখা দাস-বন্ধু, তথা “অলি”। আর যাঁর পূর্বোক্ত বিজ্ঞানকে এই রূপ ঐশী জ্্ঞানের কষ্টিে পরখহ করে তা ধরে রাখেন প্রজ্ঞা, তথা সেমিটিক আদি-ভাষায় “হিকমত” হিসেবে, তাঁরা হন, প্রাজ্ঞ বা “বোদ্ধা” সাধারণ অর্থে - সেমিটিক আদি-ভাষায়, “হকীম”।
ভবিষ্যত ভাগ্যের খবর তাই দিতে শুরু করেন, গণক, বিজ্ঞানী, নবী, আর বোদ্ধাগন। এর ভেতর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হয় নবীদের দেয়া সংবাদ, আর তাঁদর উত্তরসূরি হিসেবে অলিদের, তার পর বোদ্ধা, ও তার পর বিজ্ঞানীদের, আর সবচেয়ে কম নির্ভরযোগ্য হয় গণক দের দেয়া সংবাদ। এর ভেতর নবী আর অলি বাদে, বাদ বাকীরা পরিবেশে লক্ষণীয় বিভিন্ন ধারা (pattern) বিশ্লেষণ করেই ভবিষ্যতে কী হবে, তার ধারণা দেন। এই পরিবেশে সম্ভবত: সবচেয়ে লক্ষণীয় হিসেবে আকাশের চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্র পরিলক্ষিত হয়। এর সুযোগে এক দিকে যে ভাবে জীবণ-সংস্কার সহায়ক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবির্ভাব হয়, অন্য দিকে সেভাবেই কালে কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে পড়া জ্যোতিষ শাস্ত্রেরও উদ্ভব হয়। আর এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন পিচ্ছিল পথ ধরে আসে সূর্য চন্দ্র নক্ষত্র পূজা সহ নানারূপের প্রকৃতি পূজারি ভ্রষ্ট ধর্মরূপ।অগ্নি পূজা, নদী পূজা, বৃক্ষপূজা, পশুপাখি পূজা, এমন কি নিজেরই মত মনুষ্যপূজা, এবং অবশেষে এ সবের নানারূপ সত্য বা কল্পিত শক্তি বা গুনাবলির প্রতীকরূপ নানা মূর্তির পূজার জটা জালে আল্লাহরই নীচে সবার ওপরে যে মানুষ সত্য, সেই মানুষ – এবম তার ওপরে তার যে আল্লাহ – তার চরম অবমাননা ও অপমূল্যায়ন।
এর ভেতরই বারংবার বিভিন্ন নবীর আগমন ঘটে, যাঁরা ঐশ্বরিক শিক্ষা ভিত্তিক মানুষের আদি ধর্ম পুনর্ব্যক্তির মাধ্যমে মানুষকে কুসংস্কারের জথাজাল থেকে মুক্ত করে তাকে তার যথার্থ আসণে পুনরাসীন করতে সচেষ্ট হন। দৈবক্রমেই অনার্য অনার্য সকল জাতির নিকটই আগে পরে, কখনো না কখনো কোন না কোন নবীই এই ঐশ্বরিক বোধি বার্তা পৌঁছে দিলেও, সেই প্রাচীন কাল থেকেই এঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন, মূলত: ও প্রধানত: অনার্য সেমিটিক বঙ্গ জাতির আদি পুরুষ মনুষ্য পরাজাতির অনার্য সেমিটিক ধারারই অন্তর্ভুক্ত। সমভবত: অংশত: এ জন্যই ভাগ্য বিষয় সহ এঁদের বলা ও শেখানো সংবাদ ও শিক্ষাই বঙ্গ জাতির মন মানসে সহজে গৃহীত ও প্রবাহিত হয়ে তার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংগ হয়ে এসেছ।
ভাগ্য সহ ভবিষ্যতের ঐশী তথা সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রদানকারী ঐ নবীদের ধারাবাহিকতায়, সর্বশেষ উদিত হন জগতের আর্য অনার্য সকলের জন্য যে অনার্য সেমিটিক আরব্য বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (দ:) মূলত: ও প্রধানত: অনার্য সেমিটিক দ্রাবিড় বঙ্গ জাতির আদি নিবাস আরব্যোপদ্বীপে – ৭ম শতাব্দীতে তাঁর ঐরূপ ঐশীবানী শোণানো ও শিক্ষাদানের সূচণার বহু পূর্বেই সে আরব্যোপদ্বীপের দক্ষিণ পূর্ব প্রধানত ইয়েমেন ও ওমানে তাদের আদি নিবাস ছেড়ে অবশেষে আজকের বাঙ্গলাদেশে এসে বসত করলেও, অচিরেই বঙ্গ জাতি তাঁরই শেখান ধর্মতের সংগে সহজাত একাত্ম হয়ে, সে মতেই জীবন প্রবাহ চালিত করতে সবাচ্ছন্দ্য বোধে অভ্যস্ত হয়। ৬১০ খৃষ্টাব্দে তাঁর ঐশী জ্ঞান শিক্ষাদানের সূচনার পর অচিরেই তার সংবাদ বঙ্গ জাতির বিভিন্ন জন বাঙ্গলাদেশেই পেয়ে যান আরব্যোপদ্বীপ থেকে উপকূল বিযয় চীনের দিকে চলা কোন জাহাজের যাত্রীদের কাছ থেকে। ক্রমে তাঁর এই শিক্ষা সমপর্কে জানতে পেরে তা গ্রহণ করে সে মতে জীবণ ও চিন্তা চেতণাকে পরিচালিত করা বঙ্গজনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে, এক সময় হজরত মোহাম্মদের (দ:)-এর এই শিক্ষা দেয়া এই ঐশী জ্ঞান মতেই সচেতনে ও অবচেতনেই জীবণ ও চিন্তা চেতণা পরিচালিত করতে অভ্যস্ত হন। এ ভাবে কালে মূলত: ও প্রধানত: অনার্য সেমিটিক দ্রাবিড় বঙ্গজাতির প্রধানতম অংশ, তথা বাঙ্গলার বা বাঙ্গলাদেশের জনগণমনের সমাজসামগ্রিক অবচেতণায় সংস্কৃতির মূল্যবোধগত উতস হয়ে দাঁড়ায় ঐ অনার্য সেমিটিক আরব্য বিশ্বনবীর ঐ শিক্ষা। ঐ শিক্ষায় ভবিষ্যত আার ভাগ্য নিয়েও বলা আছে, যা জানলে বুঝলে আর অজানা ভবিষ্যত আর ভাগ্য নিয়ে অযথা পেরেশানী থেকে রক্ষা হয়।
বাঙ্গলা সংস্কৃতির ঐ অবচতন সমাজসামগ্রিক মূল্যবোধগত উতসরূপ বিশ্বাস ও কর্মধারা শিক্ষার মৌলিকতম প্রধান আকর কোরান কেতাব মতে ভাগ্য মূলত: লিখে ফেলা হয় আল্লাহর ইচ্ছা ও হুকুমে, সৃষ্টির শুরুতেই, সেই আদিতেই, আদিমানব তথা “আদম”-এরও সৃষ্টিরও আগে । ঐ বিশ্বাস শিক্ষা মতে, প্রথম সৃষ্টি ছিলেন সেই প্রশংসালোক – অনার্য সেমিটিক আদি-ভাষায়, “নূর মোহামম্দী” বা “নূর মোহাম্মদ”। উনি ছিলেন আকাশ আর পৃথবীর সামগ্রিক প্রকৃত, আদি ও আসল “নূর”, তথা “আলো” যে আল্লাহ তা’লা, স্বয়ং সেই “নূর” তথা “আলো”-এর প্রতিফলনে সৃষ্ট এমন এক “নূর” বা “আলো”, যা স্বয়ং সশরীরে তাঁর, ও ও তন্মাধহযমে সমস্ত সৃষটিরই আদি উতস, সেই আল্লাহতা’লার চূড়ানত সম্ভব প্রশংসা বৈ ন’ন। লোকবাঙ্গলার অবচেতনায়, তন্মাধ্যমে বাঙ্গলার লোক সংস্কৃতিতে,এই “নূর মোহাম্মদ” বা “নূর মোহাম্মদী” এতই সুগভীর পরোথিত যে সারা বাঙ্গলাদেশে, বিশেষ করে গ্রাম বাঙ্গলায় যে কত লোকের নিজের বা তার পররিচিতের নাম “নূর মৌহাম্মদ”, তা হিসেব করাও মুশকিল। আর “নূর মোহাম্মদী” ও এত জনপ্রিয়, অবচেতণায়ই, যে এই সংস্কৃতির স্বকীয়তার ধার বাহক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা কলকাতার, ও পরে ঢাকার “মাসিক মোহাম্মদী”-এর মত জনপ্রিয় “আইকনিক” পত্রিকার নামটিই রাখা হয়, “মোহাম্মদী”। আরও বহু ক্ষেত্রে নানা ভাবেই – রেস্তোরাঁর নাম থেকে নিয়ে বাচ্চাদের নাম পর্যন্তে বঙ্গালীরা “নূর”, “নূরী”, “মোহাম্মদ”, “মোহাম্মদী”-এর প্রচুর বযাবহার করে।
ঐ বিশ্বাস মতে, ঐশ্বরিক সত্বা, সৃষ্টের পক্ষে স্রষ্টা আল্লাহতা’লার চূড়ান্তসম্ভব প্রশংসার আলোক রূপ ঐ “নূর মোহাম্মদী” বা “প্রশংসালোক”, ৭০ হাজার বত্সর বা তারও বেশী আল্লাহ তা’লার ‘আর্শের সম্মুখে “সুববূহুন, ক্বুদ্দূসুন”, অর্থাত “পবিত্র, পবিত্র” বলে তাঁর গুনগানে ব্যস্ত থাকবার পর, সেই আলো থেকে জমাটবদ্ধ আলোরূপ বস্তসকল সৃষ্টির সূচণা করলে আল্লাহ তা'লা প্রথম বস্তু রূপে সৃষ্টি করেন কলম, আর সে কলমকে লিখতে আদেশ করেন, আর সে লেখে আল্লাহ তা’লার যা ইচ্ছা তা’ই । তাঁরই ইচছায় লেখে, তিনটি প্রধান লেখনী, যাকে সমষ্টিগত ভাবে “লেখনী”, আদি ভাষায় “কিতাব”, বলা হয়। এই সামগ্রিক “কিতাব” বা “লেখনী”-এর অন্তর্ভুক্ত এই তিনটি লেখনী হলো, (১) আল্লাহ তা’লা যে ভাগ্য নির্দ্ধারণ করেছেন, তা’; (২)তিনি তাঁর সৃষ্টের জন্য যা করনীয় নির্দ্ধারণ করেছেন তা; আর (৩) সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে বলে তিনি তাঁর জ্ঞান থেকে আগামই জানেন, তার পুন্খানু পুন্খ বর্ণনা।
এখান থেকে জানা গেল, ব্যপকতর বাঙ্গলার লোকসংস্কৃতি মতে প্রত্যেকটি সৃষ্টেরই ভাগ্য মূলত: লেখা হয়ে গেছে তার সৃষ্টিরও অনেক আগে। কিন্তু ভাগ্য বলে যা বরাদ্দ করেছেন আল্লাহ সামগ্রিক ভাবে তার সারা জীবণের জন্য, তা থেকে প্রতি বত্সর আবার সাত্সরিক যেটুকু বরাদ্দ্ হবে, তা ঠিক করে দেন আল্লাহ প্রতি বত্সর শবে বরাতের রাত, ১৪ শা’বান দিবাগত রাতে। আর সেই বরাদ্দ্ সেই বত্সর কার্যকর করবার জন্য সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের সোপর্দ করেন, আরও ক’দিন পর, রমজান মাসের শেষ দশকে শবে ক্বদরের রাতে, যা হয় বেজোড় সংখ্যক রাতের কোন একটি – ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ও ২৯ রমজানের রাতে।
শবে ক্বদর আসলে কোরান শরীফে বলা “লায়লাতু’ল ক্বদর”-এর পার্সীকৃত রূপ। অনার্য সেমিটিক আরবী লায়ল, লায়লা, লায়লাতু অর্থ হল, “রাত” বা “রজনী”, “ক্বদর” অর্থ “ভাগ্য”, আর শব্দ দু’টিকে যোগ করা “-ল”-এর অর্থ “এর” বা “ – “ । সব মিলিয়ে, তাহলে, “লায়লাতুল ক্বদর”-এর অর্থ হয়, “ভাগ্যের রাত”, তথা “ভাগ্য-রজনী”। “ভাগ্য-রজনী” এই “লায়লাতুল ক্বদর”-কে ফার্সী তথা পার্সীতে বলা হয় “শব-এ ক্বদর”, যাতে “শব” অর্থ “রাত” বা “রজনী”, “এ”-এর অর্থ “এর”, যার সংযুক্ত অর্থ হয়, আবার ঐ একই, “ক্বদর” বা “ভাগ্য”-এর “রাত” বা “রজনী”। ১৩৪২ সণে হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে ইতিহাসে প্রথম বার “বাঙ্গলা” নামে আজকের বাঙ্গলাদেশের সবটুকুকেই অন্তর্ভুক্ত করে স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তুলণামূলক সামপপ্রতিক কালে, ১৯-শ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি কর্তৃক ইংরেজী দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার আগ পর্যন্ত, তার সরকারী ভাষা হিসেবে ফার্সীই ব্যবহৃত হয়ে আসে বলেই এই বাঙ্গলাদেশের লোক-সংস্কৃতিতে “লায়লাতুল ক্বদর”-কে “শব-এ ক্বদর” বা “শবে ক্বদর” বলা হয়। অর্থ, ঐ একই – “ভাগ্য-রজনী”।
সৃষ্টির আদিতেই যে ভাগ্য বরাদ্দ লেখা হয়ে গেছে একেক জনের সারা জীবণের সামগ্রিক বরাদ্দের হিসেবে, তার বার্ষিক যে বরাদ্দ ঠিক করে দেন আল্লাহ শবে বরাতে শবান মাসের মধ্য রাতে, তা’ই সে বছরের জন্য কার্যকর করবার জন্য ফেরেশতাদের সোপর্দদ করেন রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় সংখ্যক যে ৫ রাতের কোন একটিতে, তাকে এই কারণেই বার্ষিক দুই ভাগ্য রজনীর শেষটি বলে ধরা হয়। খোদ আল্লাহই তাকে “ক্বদর”, অর্থাত “ভাগ্য”-এর রাত বলেছেন, কোরান শরীফে।
আর এর মাস দেড়েক আগের যে “শবে বরাত”-এর, ১৪ শা’বানের দিবাগত রাতে, বার্ষিক ভাগ্য বরাদ্দ চূড়ান্ত করেন আল্লাহ, তাকেও ভাগ্য-রজনী বলা হয়, সে রাতে ঐ বার্ষক ভাগ্য চূড়ান্তির বিশ্বাস থেকে। যদিও “শবে বরাত”-এর “বরাত”-এর আরবী মূলার্থে অর্থ ঠিক “ভাগ্য” নয়, বরং “মুক্তি”। সেই মূল অর্থ ধরে অনুবাদ করলে, “শবে বরাত”-এর অর্থ হবে, “মুক্তি-রজনী”। তার এ নাম হয় একটি হাদীসে যে বলা হয়েছে, এ রাতে অসংখ্য-প্রায় পাপীকে তাদের পাপের কারণে যে শাস্তি ভোগ ভাগ্যে নির্দ্ধারিত হয় গিয়েছিল, তা থেকে মুক্তি দেয়া হয় আল্লাহর কাছে মাপ চাইলে। এ ভাবে স্বীয় দুষ্কর্মে নিজের যে ভাগ্য পাপীজন নষ্ট করে, সে ভাগ্যের দুর্ভাগ্য দূর করে সে ভাগ্য প্রসন্ন করা হয় বলে, এই “বরাত” তথা “মুক্তি”-কেই সৌভাগ্য মনে করে, পার্সী, ও তার পথ ধরে উর্দু, হিন্দী আর বাঙ্গলাদেশের গ্রাম বাঙ্গলা বা লোক ভাষায়, “বরাত” বলতে “সৌভাগ্য” তথা “ভাগ্য” বোঝানো শুরু হয়। আর সেখান থেকেই শবে বরাতকেও বার্ষিক “ভাগ্য রজনী” জ্ঞান করা হয়।
“শবে বরাত” আর “শবে ক্বদর” এ দুটো তা হলে হলো বাঙ্গলার লোকসংস্কৃতির “ভাগ্য-রজনী” যুগল। প্রত্যেকটি সৃষ্টের ভাগ্য সামগ্রিক ভাবে সৃষ্টির আদিতেই নির্দ্দিষ্ট করে দিযেছিলেন আল্লাহ তা’লা, কিন্তু সে ভাগ্যের রদ বদলের অধিকার ও ক্ষমতাও তাঁরই ছিল। সৃষ্টির আদিতেই যে সামগ্রিক ভাগ্য আল্লাহ তা’লা নির্দ্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, তার ছিল দু’প্রকারের। তার একটি ছিল, মোটামুটি চূড়ান্ত – যার আর বদলাবার কোন সম্ভাবনা, সাধারনত:, আল্লাহ তা’লা রাখেন নি। অন্য প্রকারটি ছিল এমন বিষয়াবলী সংক্রান্ত, যার বিষয়ে আল্লাহ তা’লা পালনীয় আদেশ-নিষেধ জারী করেন – এমন বিষয়ে ভাগ্যটি তিনি এমনই করে দেন যে, সে বিষয়ে সেই আদেশ-নিষেধ পালন করলে ভাগ্য ভাল হবে, অন্যথা মন্দ হবে।
এই আদেশ নিষেধের একটি আল্লাহর কাছে ভাল চাওয়ার আদেশ। আর তারই সূত্র ধরে যেন, আল্লাহ তা’লা জানিয়েছেন, তিনি ভাগ্য পরিবর্তন করে ভাল করে দেন, আন্তরিক ভাবে তাঁর কাছে চাইলে। আর তিনি জানিযেছেনও যে ভাগ্য রজনীতে তাঁর কাছে চাইলে তিনি ভাগ্য বেহতর করে দেন। আর এ জন্য, বিশ্বের আরও বহু জাতির মতই বঙ্গাল জাতির প্রধান অংশের লোকেরা শবে বরাত আর শবে ক্বদরের রাতে বিশেষ উপাসণা, এবাদত-বন্দেগী করে আল্লাহর কাছে ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাকুতি মিনতি করেন।
এই রাত্রে আমাদের নিজেদের, আর আমাদের পরিবার পরিজন – আর আমাদের জাতি, জগতের ভাগ্যের উন্নয়ন করে সব অসুবিধা দূর করে দিয়ে, নিরন্কুশ সৌভাগ্য দান করুন।
লেখক: প্রফেসর ড আহমদ আনিসুর রহমান সংস্কৃতি বিশ্লেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রে হার্ভার্ড বিশ্ব বিদ্যালয় আর মদীনার তৈবা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিশ্বের বহু উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা আর গবেষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের এম আই টি থেকে সংস্কৃতি বিশ্লেষন সহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণাপূর্বক পি এইচ ডি অর্জন করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

