আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জাকাতে সম্পদ বৃদ্ধি ও পবিত্র হয়

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

জাকাতে সম্পদ বৃদ্ধি ও পবিত্র হয়
প্রতীকী ছবি

আরবি জাকাত শব্দের ভেতর দুটি অর্থ পাওয়া যায়। একটি হচ্ছে, অনবরত বাড়তে থাকা। আরেকটি হচ্ছে, শুদ্ধ ও পবিত্র হওয়া। আরবি ভাষাবিজ্ঞানীরা বলেন, যে জিনিস ক্রমশ বাড়তে থাকে সে জিনিস অবশ্যই শুদ্ধ ও পবিত্র হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আরবিতে বলা হয়- জাকাজ জারউ ইয়াজকুজ জাকাহ। অর্থাৎ, ফসল যেমন বাড়ে, তেমনি করে জকাতও বাড়ে (বরকত বাড়ায়)। কৃষির ফসল ক্রমশ বাড়তে থাকবে তখনই, যখন ফসল আবর্জনামুক্ত ও পরিচ্ছন্ন হয়। তাই জাকাত শব্দটি ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পবিত্র ও খাঁটি হওয়ার অর্থও দেয়।

বিজ্ঞাপন

আর শরিয়তে ব্যক্তির সম্পদে আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট ফরজ অংশ হকদারদের বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে জাকাত বলা হয়। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘ধন-সম্পদ থেকে আল্লাহর নির্ধারিত সম্পদ বের করে দেওয়া জাকাত বলার কারণ হলো— এর বিনিময়ে সম্পদ ক্রমশ বাড়তে থাকে আর জাকাতদাতা অনেক বিপদাপদ থেকে পবিত্র থাকেন।’

সুফিরা বলেন, জাকাত মানুষকে দুই ধরনের বিপদ থেকে সুরক্ষা দেয়। প্রথমত, আখেরাতের জবাবদিহি থেকে। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার বালা-মুসিবত থেকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে জাকাত অর্থ পবিত্র ও পরিশুদ্ধতাই ঠিক আছে। অন্য একজন ইসলামিক স্কলার লিখেছেন, ‘জাকাতের মাধ্যমে ব্যক্তি দুই ধরনের পবিত্রতা অর্জন করে। প্রথমত, সে তার সম্পদ পবিত্র করে। দ্বিতীয়ত, তার মন-মনন কৃপণতা, স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত হয়ে যায়।

এ বিষয়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়া আরো চমৎকার করে বলেছেন— ‘জাকাত দেওয়ার ফলে দাতার আত্মা নির্মল-পবিত্র হওয়ার কারণে তার ধন-সম্পদে আল্লাহ বরকত দেন এবং তা দিন দিন বাড়তে থাকে।’ কারজাভি বলেন, ‘এই বৃদ্ধি কেবল ধন-সম্পদে নয়, ব্যক্তির মন-মানসিকতা, ধ্যান-ধারণায় প্রভাবিত হয়। ফলে জাকাতদাতা দিন দিন উন্নত রুচিরোধসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠে।’

ইমাম নববী ‘আল-হাভি’ গ্রন্থ প্রণেতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, আরবি ‘জাকাত’ শব্দটি ইসলামি শরিয়ত প্রবর্তনের আগেও বেশ পরিচিত ছিল। জাহেলি যুগের কাব্য ও কবিতায় এর ব্যবহার পাওয়া যায়। তবে ইমাম দাউদ জাহেরি এ মতটি নাকচ করে বলেছেন, ‘ইসলামের আগে জাকাত শব্দের প্রচলন পাওয়া যায়নি।’ (ফিকহুজ জাকাত)

জাকাতের আরেক নাম সদকাহ। পবিত্র কোরআনে জাকাতের প্রতিশব্দ হিসেবে এ শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন জাকাতের খাত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এসব সদকা তো আসলে ফকির ও মিসকিনদের জন্য; ওইসব লোকদের জন্য, যারা সদকার কাজে নিযুক্ত; আর তাদের জন্য যাদের মন জয় করা প্রয়োজন; তাছাড়া এসব সদকা দাস মুক্ত করা, ঋণগ্রস্তদের সাহায্য করা, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের খেদমতে ব্যয় করার জন্য। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ। আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং তিনি পরম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী।’ (সুরা তাওবাহ : ৬০)

জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সুস্থ মস্তিষ্ক, স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান হওয়া শর্ত। এমন ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় এবং পূর্ণ এক বছর এ সম্পদ তার মালিকানায় থাকে, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ। (রদ্দুল মুহতার : ২/২৫৯) জাকাতের নিসাব হলো- স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ মিসকাল। আধুনিক হিসাবে সাড়ে সাত ভরি। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭০৭৭-৭০৮২।) রুপার ক্ষেত্রে নিসাব হলো ২০০ দিরহাম। আধুনিক হিসাবে সাড়ে ৫২ তোলা। এ পরিমাণ সোনা-রুপা থাকলে জাকাত দিতে হবে। (বুখারি : ১৪৪৭; মুসলিম : ৯৭৯) এ হিসাব অনুযায়ী প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা-পয়সা বা বাণিজ্য-দ্রব্যের মূল্য যদি সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের সমপরিমাণ হয় তাহলে জাকাতের নিসাব পূর্ণ হয়েছে ধরা হবে এবং এর জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৬৭৯৭, ৬৮৫১)

যদি সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা কিংবা বাণিজ্য-দ্রব্য—এগুলোর কোনোটি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু এসবের একাধিক সামগ্রী এ পরিমাণ রয়েছে, যা একত্র করলে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার সমমূল্য বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের সমমূল্য বা তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে এক্ষেত্রেও সব সম্পদ হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭০৬৬, ৭০৮১) কারো কাছে কিছু স্বর্ণালংকার আর কিছু উদ্বৃত্ত টাকা কিংবা বাণিজ্যদ্রব্য আছে, যা একত্র করলে সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের সমমূল্য বা তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে এর জাকাত দিতে হবে। কারো কাছে নিসাবের কম রুপা আর কিছু উদ্বৃত্ত টাকা বা বাণিজ্যদ্রব্য আছে, যা একত্র করলে সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের সমমূল্য বা তার চেয়ে বেশি হয়। এরও জাকাত দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার : ২/৩০৩)

লেখক : পীর সাহেব, আউলিয়ানগর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...