হিজাব পরার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেন কয়েকশ মুসলিম তরুণী

হিজাব পরার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেন কয়েকশ মুসলিম তরুণী

তুরস্কের ইজমির শহরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শত শত মুসলিম তরুণী ইসলামী হিজাবের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। হিজাবের ধর্মীয় গুরুত্ব ও মুসলিম নারীর পরিচয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক তুলে ধরতে ‘প্রফেট লাভার্স অ্যাসোসিয়েশন’ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

‘আমি হিজাব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি: আপনার আদেশই সবার ওপরে’—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম নারীদের, বিশেষ করে তরুণীদের, ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে হিজাব পালনে উৎসাহিত করা। আয়োজকেরা হিজাবকে সাময়িক পছন্দ কিংবা ফ্যাশনের অংশ হিসেবে না দেখে ইসলামের ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবে বোঝার ওপর গুরুত্ব দেন।

বিজ্ঞাপন

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। তেলাওয়াত করেন আমিনে আলতুন। এরপর ধর্মীয় সংগীত, আলোচনা সভা ও নাট্য পরিবেশনার আয়োজন করা হয়।

‘হিজাব ফ্যাশন নয়, আল্লাহর নির্দেশ’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ধর্মীয় আলোচক বিলদানে কুরতারান। তিনি হিজাবের তাৎপর্য, মুসলিম জীবনে এর অবস্থান এবং নারীদের জন্য এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তার মতে, হিজাবকে শুধু পোশাকের ধরন, ফ্যাশনের অনুষঙ্গ কিংবা ব্যক্তিগত সাময়িক পছন্দের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কুরতারান বলেন, ‘আজ আমরা নিয়তের কথা বলছি। তবে এই নিয়তের মধ্যে আত্মসমর্পণ, প্রচেষ্টা ও দৃঢ় সংকল্পও রয়েছে। আমরা অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছি—হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার নির্দেশই আমাদের কাছে সবার ওপরে এবং অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।’

অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অভিনন্দন জানিয়ে অংশগ্রহণকারী তরুণীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরাই আমাদের আশা ও প্রার্থনার জায়গা। ইনশা আল্লাহ, তোমরাই আমাদের গর্ব এবং হৃদয়ের পবিত্রতা হয়ে উঠবে।’

হিজাব ইসলামের মৌলিক নির্দেশনার অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো বিশেষ পোশাকের ধরন, ফ্যাশন কিংবা অনুষঙ্গ নিয়ে কথা বলছি না। এটি সাময়িক কোনো উৎসাহের বিষয়ও নয়। হিজাব পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর দেওয়া অন্যতম মৌলিক নির্দেশনা এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসৃত দৃঢ় নীতিগুলোর একটি।’

‘জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবে হিজাবের গুরুত্ব কমছে’

বক্তব্যে কুরতারান সতর্ক করে বলেন, অনেক মুসলিম হিজাবকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে স্বীকার করলেও সমসাময়িক সংস্কৃতির প্রভাবে দৈনন্দিন জীবনে এর অর্থ ও গুরুত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘হিজাবের বিষয়ে আমরা আজ পিছিয়ে পড়ছি। কেন? কারণ আমরা এর অর্থ বুঝতে, সংজ্ঞায়িত করতে এবং জীবনে যথাযথ অবস্থান দিতে হিমশিম খাচ্ছি। আমরা সময়ের নানা কোলাহলে হারিয়ে যাচ্ছি। একসময় মক্কার মুশরিকরা পবিত্র কোরআনের বাণী যেন মানুষ শুনতে, বুঝতে ও গ্রহণ করতে না পারে, সে জন্য শোরগোল তুলত। আজ আমরা ফ্যাশন, নারীবাদ, পুঁজিবাদ, বিভিন্ন মতাদর্শ ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির কোলাহলে ঘেরা।’

হিজাবের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পবিত্র কোরআনের শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, ধর্মীয় বিধান পালনে আন্তরিক বিশ্বাস ও আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অবিচল আনুগত্য প্রয়োজন।

কুরতারান বলেন, ‘হিজাব বুঝতে হলে আমাদের শান্ত হৃদয়, মুক্ত মন ও অবিচল আত্মসমর্পণের মানসিকতা নিয়ে ভাবতে হবে। আবারও পবিত্র কোরআনের কাছে ফিরতে হবে। কোরআনকে নিজেদের নির্দেশনার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এর আলোকে হিজাবের বিষয়টি বুঝতে হবে।’

আদম-হাওয়ার ঘটনা তুলে ধরলেন বক্তা

হিজাবের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কুরতারান পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হজরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর ঘটনা তুলে ধরেন। তার মতে, মানুষের শালীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আল্লাহর নির্দেশ মানার বিষয়টি বুঝতে এ ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘পবিত্র কোরআন পাঠ করতে গিয়ে আমরা মানবজাতির প্রথম মানুষ হজরত আদম ও হাওয়ার ঘটনাতে ফিরে যাই। এই ঘটনা না বুঝলে হিজাবের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বলা হয়, জামার প্রথম বোতাম ভুলভাবে লাগালে পরের সব বোতামই ভুল হয়। এখানেও বিষয়টি একই রকম।’

কুরতারান বলেন, আল্লাহ জান্নাতে আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর জন্য কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন এবং সেগুলো অতিক্রম করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু শয়তান তাদের মনে সন্দেহ তৈরি করে এবং স্বাধীনতা ও সমতার ধারণাকে ব্যবহার করে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার প্ররোচনা দেয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিপালক তাদের সৃষ্টি করে জান্নাতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার একটি পরিসর নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সেখানে খাওয়া, পান করা ও বিভিন্ন নেয়ামত ভোগের অনুমতি ছিল। তবে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করা হয়েছিল। এরপর শয়তান ও তার কৌশল সামনে আসে। প্রথমে সে তাদের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়। বোঝানোর চেষ্টা করে, তারা সুন্দর জায়গায় থাকলেও তাদের স্বাধীনতা সীমিত এবং তারা সমান অধিকার পাচ্ছেন না। আজও আমরা সমতা, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের নামে একই ধরনের যুক্তি শুনি।’

শয়তান আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর মঙ্গল চায় বলে শপথ করে তাদের বিভ্রান্ত করেছিল উল্লেখ করে কুরতারান বলেন, ‘সে আল্লাহর নামে শপথ করে বলেছিল, সে তাদের কল্যাণ চায়। শত্রুতা গোপন করে নিজেকে বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। বিষয়টি কি পরিচিত মনে হয় না? ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও আমরা প্রথম মানব-মানবীর ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি, অথচ প্রতারণা ও বিভ্রান্ত করার কৌশল বদলায়নি।’

তিনি আরো বলেন, নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার পর আদম (আ.) ও হাওয়ার আবরণ সরে যায়। তখন তাদের স্বাভাবিক লজ্জাবোধ ও অনুশোচনা তাদের আচরণে প্রকাশ পায়।

‘হিজাব মুসলিম নারীর জন্য আল্লাহ নির্ধারিত পরিচয়’

হিজাবকে শুধু পুরুষের দৃষ্টি থেকে নারীকে রক্ষার পোশাক হিসেবে দেখার ধারণারও সমালোচনা করেন কুরতারান। তার মতে, এভাবে ব্যাখ্যা করলে হিজাবের গভীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আড়ালে থেকে যায়।

তিনি বলেন, ‘হিজাব শব্দটি শুনলে শুধু পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করতে নারীরা যে পোশাক পরেন, সেটুকু ভাবা উচিত নয়। আজ নারীবাদ তরুণ মুসলিম নারীদের এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বেশি করছে। তাদের বলা হচ্ছে, অন্যের আচরণের কারণে আমি কেন নিজের আচরণ পরিবর্তন করব? এতে কি আমার স্বাধীনতা ও সমতা সীমিত হচ্ছে না? এটি কি ন্যায়বিচার?’

কুরতারানের ভাষ্য, হিজাবের বিষয়টি শুধু এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে এর প্রকৃত অর্থ বোঝা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, ‘হিজাব মানে মহান আল্লাহর নির্দেশকে জীবনের কেন্দ্রে স্থান দেওয়া। আল্লাহ যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমা নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে থেকে তার নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করা। আমাদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু শয়তানের কৌশল, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে আমরা যখন বারবার এসব সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, তখন হিজাব সম্পর্কে আমাদের ধারণা বিকৃত হয়। জীবনে এর যথাযথ অবস্থান নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’

মুসলিম নারীদের হিজাবের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

কুরতারান বলেন, ‘অবশ্যই আমরা হিজাব নিয়ে কথা বলব এবং এর ব্যাখ্যা তুলে ধরব। এটি আলোর ওপর আলো। তবে হিজাব কেবল এক টুকরো কাপড় কিংবা পোশাকের অনুষঙ্গ নয়। এটি মহান আল্লাহর নির্ধারিত মুসলিম নারীর পরিচয়।’

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে যারা হিজাব গ্রহণ করেছেন, তাদের উপহার দেওয়া হয়। এরপর আমিনে শানি সমাপনী মোনাজাত পরিচালনা করেন।

সূত্র: তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইলখা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন