সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে একাধিক. সন্তানের মধ্যে কোনো একজনের প্রতি বেশি ভালোবাসা প্রকাশ করাও অন্যদের ওপর এক ধরনের অবিচার করা। আবার যেমন সাধারণ দান বা কারো জন্য জায়গাজমি, সম্পদ ইত্যাদি ভাগবাটোয়ারা ও বণ্টনে বে-ইনসাফি করা, কারো প্রতি বেশি টান অনুভব করে কমবেশি করা-এসবই হলো, জুলুম ও অবিচার। এজন্য জরুরি হচ্ছে, কাউকে কিছু হিবা-দান বা দেওয়ার ইচ্ছা হলে, সর্বোচ্চ ইনসাফ কায়েম করা এবং সাধ্যমতো সবার জন্য সমবন্টন করা জরুরি!
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যখন তোমাদের কারো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়ে যায় (মাতার লক্ষণ দেখা যায় কারো মধ্যে বা দ্রুত মৃত্যু হবে এমন অবস্থা তৈরি হয়), আর যে যদি কল্যাণকর কোনো ধন-সম্পদ রেখে যায়, তবে তার জন্য ইনসাফের সঙ্গে পিতামাতা ও নিকট আত্মীয়দের জন্য ওনিয়ত করা বিধিবদ্ধ করা হলো। (সুরা বাকারা: ১৮০)
এ আয়াতের তাফসির সম্পর্কে মাআরেফুল কোরআনে এসেছে, যদিও ও ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার বিষয়ে এ আয়াতটি (সুরা নিসার ৭নং আয়াত 'পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের জন্য যেমন নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও তেমনি অংশ রয়েছে; হোক তা অল্প বা বেশি-এটি একটি নির্ধারিত অংশ') দ্বারা এ-জাতীয় ওসিয়তের বিধান রহিত হয়ে গেছে। একইভাবে তাফসিরে জাসসাস ও কুরত্ববিতে এসেছে, মিরাস-উত্তরাধিকার বিষয়ক আয়াত আত্মীয়দের জন্য ওসিয়ত করাকে রহিত করে দিয়েছে। এমনকি বিদায় হজের 'ঘোষণায় রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারের হকপ্রাপ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কাজেই এখন থেকে কোনো ওসিয়তকারীর জন্য তার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারের জন্য ওসিয়ত করা জায়েজ নয়। (জামে তিরমিজি)
সাহাবি নুমান ইবনে বাশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আমার বাবা তার সম্পদ থেকে কিছু প্রদান করেন। আমার মা আমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রা.) বললেন, আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না, যতক্ষণ না আপনি রাসুল (সা.)-কে সাক্ষী রাখেন। এরপর আমার পিতা আমাকে নিয়ে নবীজির (সা.) কাছে এলেন। রাসুল (সা.) তাকে বললেন, তুমি কি এমন কাজ তোমার অন্য সব পুত্রদের সঙ্গে করেছ? তিনি বললেন, না। নবীজি (সা.) বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো। তখন আমার পিতা চলে এলেন এবং তিনি তার যে দান ফিরিয়ে নেন। (মুসলিম)
মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে, নবীজির কাছে যখন এ বিষয়ে সাক্ষী রাখার উদ্দেশ্য আসা হলো, তখন নবীজি (সা.) বললেন, এছাড়া তোমার কি আর কোনো পুত্র আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। নবীজি বললেন, তুমি কি তাদের সকলকে এমন (এই একই সমপরিমাণে) দান করেছ? (এর উত্তরে) যখন বলা হলো, না। তখন নবীজি বললেন, তাহলে আমাকে সাক্ষী রেখো না। কারণ, আমি জুলুমের ব্যাপারে সাক্ষী হই না। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সবাইকে সমবন্টন করে না দেওয়ার কারণে নবীজি স্বয়ং সাক্ষী তো হলেনই না। বরং, এমন আচরণকে জুলুম অবিচার হিসাবে আখ্যায়িত করলেন। আরেক বর্ণনায় আরো একটু বর্ধিত বিবরণ এসেছে। নবীজি বললেন, তুমি কি এটা চাও যে, তারা (তোমার সব ছেলে) সবাই তোমার প্রতি সদ্ব্যবহার করুক? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে এমন করো না। (অর্থাৎ, একজনকে কিছু (বেশি বা সাধ্যের মধ্যে) দান করে, অপরকে বঞ্চিত করো না। (মুসলিম)
শেষোক্ত বর্ণনাটি থেকে এ বিষয়টিই বুঝে আসে
যে, আমাদের প্রত্যেকের জন্যই কর্তব্য হচ্ছে, আমরা যদি আমাদের সন্তানদের থেকে সদ্ব্যবহার কামনা করি, তবে তাদের সবার প্রতি ইনসাফ বজায় রাখাও জরুরি। নয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে। হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আজকাল আমাদের সমাজে এ-জাতীয় আচরণও প্রকাশ পাচ্ছে, অনেকেই তাদের আপন সন্তানের মধ্যে কারো প্রতি বেশি আবেগ ভালোবাসার কারণে, কিংবা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে ঝুঁকে পড়েন। ফলে ওই সন্তানের প্রতি বা তার ছেলেমেয়ের প্রতিও লালন করেন অগাধ ভালোবাসা। এমন আচরণ কখনো কাম্য নয় কারো থেকেই! এর ফলে অনেক সময় বাকি সন্তানরা রাগ-অভিমান করে মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কেউবা মা-বাবার প্রতি অযত্ন-অবহেলা বা উদাসীনতা প্রদর্শন করে। এটিও কোনোভাবে কাম্য নয়। এমনকি বাবা-মায়ের এমন আচরণের কারণে তাদের থেকে প্রতিশোধ নেওয়াও বিধিসম্মত নয় কখনোই।
লেখক: শিক্ষার্থী, শ্রীপুর ভাংনাহাটি রহমানিয়া কামিল (স্নাতকোত্তর) মাদরাসা, শ্রীপুর, গাজীপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

