নাগোয়ার মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামের প্রেস বক্স ভীষণ পছন্দ হলো। ১০০ মিটারের ফিনিশিং লাইন ঠিক যেখানে শেষ হচ্ছে প্রেস বক্সের কর্নারটা ঠিক সেখানেই। তাই কে প্রথমে ফিনিশিং লাইনে পা রাখছেন সেটা দেখার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। ১০ সেকেন্ডের আনন্দ দেখার সবচেয়ে দামি আসন যে ওটাই!
আচ্ছা এবার সেই আনন্দময় গল্পে ফিরি।
অ্যাথলেটিক ট্র্যাকে চীনের ১৭ বছর বয়সি কিশোরী চেন ইউজি দাঁড়িয়ে নিজের লেনে। স্টার্টারের নির্দেশের অপেক্ষায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অন্য সাত প্রতিযোগীও। কয়েক সেকেন্ডের সেই অপেক্ষার পর বন্দুকের শব্দ হলো। আটজন একসঙ্গে ছুটলেন, তবে শেষ কয়েক মিটারে চেনকে আলাদা করে চেনা গেল। ফিনিশিং লাইন পেরিয়ে চোখ গেল ঘড়ির দিকে। সময় ১১.০৬ সেকেন্ড।
এরপরই বিগ স্ক্রিনে ভেসে উঠল নতুন গেমস রেকর্ডের ঘোষণা। গ্যালারিতে হাততালি শুরু হলো, চেনও একবার তাকালেন স্কোরবোর্ডের দিকে। মুখে ফুটে উঠল হাসি, আর ট্র্যাকের পাশে থাকা সতীর্থরা এগিয়ে এসে তাকে অভিনন্দন জানালেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সাংবাদিকদের একটি অংশ ছুটলেন মিক্সড জোনের দিকে। নাগোয়ার স্টেডিয়ামে বসে এই দৃশ্য দেখছিলাম, আর মনে হচ্ছিল চেনের দৌড় যেন শুধু একটি রেসের ফল নয়, এবারের এশিয়ান গেমসের বড় একটি গল্পেরও প্রতিচ্ছবি।
এই আসরে বারবার সামনে আসছে তরুণ মুখ। শুধু সামনে আসছে বললে কম বলা হবে, তারা রেকর্ড ভেঙে, স্বর্ণ জিতে নিজেদের জায়গাও তৈরি করে নিচ্ছে। বয়স যেখানে তাদের পরিচয়ের একটি বড় অংশ, পারফরম্যান্স সেখানে সেই বয়সকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
১৩ বছরের ইউ জিদি তিনটি ব্যক্তিগত স্বর্ণ জিতে বিশ্ব জুনিয়র ও গেমস রেকর্ড করছেন। ১৭ বছরের জাপানি শিন ওহাশি ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে বিশ্বরেকর্ড গড়ছেন। ১৯ বছরের চীনা ঝাং ঝানশুও এক আসরে সাতটি স্বর্ণ জিতে এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় খুলছেন। আর থাইল্যান্ডের পুরিপোল বুনসন ১০০ মিটারে ৯.৯০ সেকেন্ডে দৌড়ে শুধু গেমস রেকর্ডই ভাঙছেন না, ৪৮ বছর পর তার দেশকে এনে দিচ্ছেন এই ইভেন্টের স্বর্ণ।
একেকটি নাম, একেকটি রেকর্ড। একেকটি দৌড়, একেকটি নতুন গল্প। আর সব গল্পের কেন্দ্রেই একটি শব্দ—তারুণ্য।
সাত স্বর্ণে ঝাংয়ের ইতিহাস
সাঁতারের পুলে তারুণ্যের এই গল্প আরো চমকপ্রদ। বয়স মাত্র ১৯ বছর, কিন্তু এশিয়ান গেমসের পদক তালিকায় ঝাং চ্যাম্পিয়নদের একজন। ব্যক্তিগত ইভেন্টে চারটি স্বর্ণ জিতেছেন ঝাং। ২০০, ৪০০, ৮০০ ও ১৫০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে এসেছে সেই সাফল্য। এর সঙ্গে রিলে থেকে যোগ হয়েছে আরো তিনটি স্বর্ণ। সব মিলিয়ে সাতটি স্বর্ণ। এক আসরে কোনো সাঁতারুর সাত স্বর্ণ জেতার নজির এশিয়ান গেমসে আগে কখনোই ছিল না।
৪০০ মিটার ফ্রি স্টাইলের শেষ স্বর্ণটিও এসেছে গেমস রেকর্ডের সঙ্গে। সময় ছিল ৩ মিনিট ৪১.২৮ সেকেন্ড। বিগ স্ক্রিনে সময় উঠতেই চীনা সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেল। এর আগে ২০০ মিটারে ১ মিনিট ৪৩.৪৯ সেকেন্ডে এশিয়ান রেকর্ড করেছেন ঝাং। ৪০০ ও ৮০০ মিটারেও গেমস রেকর্ড আছে তার। ১,৫০০ মিটারেও স্বর্ণ এসেছে ১৪ মিনিট ৪২.৪২ সেকেন্ডে।
পুলে ঝাংকে দেখে অবশ্য বোঝার উপায় নেই, মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি এত বড় আসরের অন্যতম আলোচিত মুখ। পানিতে নামার পরই বদলে যায় ছবিটা। এক ইভেন্ট শেষ হচ্ছে, তিনি পুল থেকে উঠছেন, কোচের সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত কথা বলছেন, তারপর আবার পরের ইভেন্টের প্রস্তুতি। সেখানেই স্বর্ণ জিতছেন। আবার খানিকবাদে পরের ইভেন্টের জন্য আড়মোড়া ভেঙে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাফল্যের এই ধারাবাহিকতাই জানাচ্ছে এই সাঁতারু বাকিদের চেয়ে আলাদা।
ওহাশির বিশ্বরেকর্ড
জাপানের শিন ওহাশির সুইমিংও ছিল এবারের আসরের আলোচনার সেরা খোরাক। ১৭ বছর বয়সি এই সাঁতারু যখন ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে নামলেন, গ্যালারিতে জাপানি দর্শকদের আগ্রহটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। অনেকেই মোবাইল ফোন হাতে প্রস্তুত ছিলেন। স্টার্টের পর অবশ্য কারো চোখ আর মোবাইলে ছিল না।
শেষ ৫০ মিটারে লড়াইটা জমে উঠল। ওহাশি তখন এগিয়ে, পেছনে প্রতিদ্বন্দ্বীরা চেষ্টা করছেন ব্যবধান কমাতে। শেষ দেয়ালে হাত ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে থামল ঘড়ি। সময় ২ মিনিট ৪.৮৩ সেকেন্ড।
কয়েক সেকেন্ড পর বিগ স্ক্রিনে ভেসে উঠল বিশ্বরেকর্ডের ঘোষণা। গ্যালারি থেকে একসঙ্গে হাততালি উঠল। ওহাশি পানির ওপর কিছুক্ষণ স্থির ছিলেন, তারপর দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। তার মুখের সেই অভিব্যক্তিতে বিস্ময় ছিল, যেন নিজের কীর্তিটাও কয়েক মুহূর্তের জন্য বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
চীনের কিন হাইয়াংয়ের আগের বিশ্বরেকর্ড ছিল ২:০৫.৪৮ সেকেন্ড। ওহাশি সেটি ছাড়িয়ে গেলেন ০.৬৫ সেকেন্ডে। এই ইভেন্টে প্রথম পুরুষ সাঁতারু হিসেবে ২ মিনিট ৫ সেকেন্ডের নিচে নামলেন তিনি। ১৭ বছর বয়সেই বিশ্বরেকর্ড—ঘরের দর্শকদের সামনে এর চেয়ে বড় পরিচয় আর কী হতে পারে!
১৩ বছরের ইউ জিদির তিন স্বর্ণ
পুলের পাশেই আরেকটি মুখ এবারের গেমসে বিস্ময় ছড়িয়েছে। চীনের ইউ জিদি। বয়স মাত্র ১৩ বছর। তার বয়স শুনলেই প্রথমে অবাক হতে হয়, আর পদকের তালিকা দেখলে সেই বিস্ময় আরো বাড়ে।
তিনটি ব্যক্তিগত ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছেন ইউ। ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে তার সময় ২:০৬.১০ সেকেন্ড, সঙ্গে এসেছে বিশ্ব জুনিয়র রেকর্ড। ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে সময় ২:০৫.০৮ সেকেন্ড এবং ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে ৪:২৮.৫৬ সেকেন্ড। দুটি ইভেন্টেই গেমস রেকর্ড হয়েছে।
পদক হাতে ইউকে দেখলে বয়সটা বোঝা যায়। কিন্তু পুলে নামার পর সেই বয়সের কথা আর মনে থাকে না। সেখানে তিনি অন্য সবার মতোই একজন প্রতিযোগী, আর ফলাফল বলছে সেই প্রতিযোগিতায় তিনি কতটা সফল।
পুরিপোলের স্প্রিন্টে থাইল্যান্ডের ইতিহাস
সাঁতার থেকে চোখ ফেরাতেই অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে অন্যরকম ব্যস্ততা। পুরুষদের ১০০ মিটারের ফাইনালের আগে প্রতিযোগীরা নিজেদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। থাইল্যান্ডের পুরিপোল বুনসনও নিজের লেনে দাঁড়িয়ে, চোখে একাগ্রতা। গ্যালারিতে থাই সমর্থকদের উপস্থিতিও তখন বেশ চোখে পড়ার মতো।
স্টার্টের পর প্রথম কয়েক মিটার প্রায় সমান ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পুরিপোল এগিয়ে গেলেন। ফিনিশিং লাইনে পৌঁছানোর পর ঘড়িতে উঠল ৯.৯০ সেকেন্ড। সঙ্গে সঙ্গে গেমস রেকর্ডের ঘোষণা এলো। পুরিপোল প্রথমে স্কোরবোর্ডের দিকে তাকালেন, তারপর দুই হাত তুলে উদযাপন করলেন।
সেমিফাইনালেও ৯.৯১ সেকেন্ডে গেমস রেকর্ড করেছিলেন তিনি। ফাইনালে এসে নিজের সেই সময়ও ছাড়িয়ে গেলেন। ৪৮ বছর পর পুরুষদের ১০০ মিটারে থাইল্যান্ডের স্বর্ণ পাওয়ার ঘটনাটিও তাই এই দৌড়কে আরো বিশেষ করে তুলেছে।
চেনের কথায় তারুণ্যের আত্মবিশ্বাস
দিনের শেষে আবার মনে পড়ল চেন ইউজিয়ের কথা। রেকর্ডের পর মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ফাইনালের আগে অনুশীলনের সময় তার পা কাঁপছিল। ফলস স্টার্টের ভয়ও কাজ করছিল। কিন্তু স্টার্টের পর সেই ভয় আর তাকে আটকে রাখতে পারেনি।
প্রশ্ন করা হয়েছিল, সামনে তার লক্ষ্য কী?
চেনের উত্তর ছিল খুব ছোট, কিন্তু যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী—‘আমার কোনো সীমা নেই।’
১৭ বছরের একজন স্প্রিন্টারের মুখে কথাটা শুনে আলাদা করে মনে থাকার মতোই। রেকর্ডের পরও তার মধ্যে কিশোরীসুলভ সরলতা ছিল, কিন্তু কথার মধ্যে ছিল বড় স্বপ্নের ইঙ্গিত। ডিসেম্বরে আঠারোতে পা দেবেন চেন। তার আগেই এশিয়ান গেমসের স্বর্ণ এবং নতুন গেমস রেকর্ড—তার নিজের ভাষায়, এর চেয়ে ভালো জন্মদিনের উপহার আর কী হতে পারে!
তারুণ্যের নতুন ছবি
ঝাং, ওহাশি, ইউ, পুরিপোল, চেন—পাঁচজনের বয়স কম, কিন্তু অর্জন অনেক বড়। কেউ সাঁতারে রেকর্ড করছেন, কেউ ট্র্যাকে নতুন সময় লিখছেন, কেউ আবার বয়সের হিসাবটাই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছেন।
আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস এখনো শেষ হয়নি। সামনে আরো ইভেন্ট আছে, আরো পদকের লড়াই আছে, আরো নতুন মুখ সামনে আসার সুযোগও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার। এই গেমসে তারুণ্য শুধু অংশ নিচ্ছে না, নিজেদের জায়গাটাও তৈরি করে নিচ্ছে।
এবারের এশিয়ান গেমস পুলে, ট্র্যাকে সত্যিকার অর্থেই তারুণ্যের জয়গানে মুখরিত! বিগ স্ক্রিনে একের পর এক নাম ভেসে ওঠে—ঝাং, ওহাশি, ইউ, পুরিপোল, চেন। নামের পাশে বয়সও থাকে। ১৩, ১৭, ১৭, ১৯—বয়সগুলো যেন এই আসরের আলাদা এক গল্প বলে।
এই তারুণ্য শুধু পদক জেতেনি; এরা এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের বয়সের হিসাবটাও বদলে দিয়েছে। বিশ্বরেকর্ড, গেমস রেকর্ড, এশিয়ান রেকর্ড—সবকিছুর পাশে এখন নতুন করে লেখা হচ্ছে তরুণদের নাম।
হয়তো এদের কেউ একদিন আরো বড় মঞ্চে যাবে, আরো বড় রেকর্ড ভাঙবে। আইচি-নাগোয়ায় তারা ইতোমধ্যেই নিজেদের সময়কে চিনিয়ে দিয়েছে। তাদের সামনের সময়টা আরো উচ্ছল আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছে।
সম্ভবত একেই বলে জীবন জিতে নেওয়া!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


-2c8b91-720x405.webp)