ডারউইন ড্রামা! জয়ের আরো কাছে বাংলাদেশ

ডারউইন ড্রামা! জয়ের আরো কাছে বাংলাদেশ

ডারউইনের আকাশে তখন শেষ বিকালের আলো। মারারা ওভালের গ্যালারিতে অস্ট্রেলিয়ানদের মুখে উদ্বেগ, আর বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে জয়ের স্বপ্ন আরো সবুজ। সূর্য ডোবার আগে ম্যাচের ছবিটাই যেন বদলে গেল। যে অস্ট্রেলিয়া বিশ্ব টেস্ট র‍্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল, নিজেদের মাঠে সে দলটিই এখন বাংলাদেশের কাছে কোণঠাসা।

তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ১৬১/৪। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে তারা এখনো পিছিয়ে ৬৭ রানে। হাতে আছে ৬ উইকেট। বাংলাদেশের দরকার আর মাত্র ৬টি উইকেট। তারপরই লেখা হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের গল্প।

বিজ্ঞাপন

অঙ্কটা সহজ; কিন্তু গল্পটা মোটেও সহজ নয়। আজ সারাদিন আবার ব্যাটিং করতে পারলে ম্যাচে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কঠিন হয়ে যাবেÑঅস্ট্রেলিয়া সেটাই চায়। শেষদিনে অন্তত বাংলাদেশকে তারা কঠিন কোনো টার্গেট ছুঁড়ে দিতে চায়। তবে আজ অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ডে আরো ৬৭ রান যোগ হওয়ার আগে বাংলাদেশ বাকি ৬ উইকেট তুলে নিতে পারলেই লেখা হবে ঐতিহাসিক এক জয়ের গল্প।

বাংলাদেশ এই টেস্টের প্রথম বল থেকেই অস্ট্রেলিয়ার চোখে চোখ রেখে খেলেছে। শুরুর তিনদিন শেষে মনে হচ্ছে শক্তির হিসাবটা উল্টে গেছে। অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাটিং-বোলিং সবখানেই অসহায় মনে হচ্ছে। আর ডারউইনে বাংলাদেশই যেন বেশি আত্মবিশ্বাসী দল।

প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের ৬ উইকেটের সামনে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। জবাবে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আসে দারুণ এক পাল্টা জবাব। তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের ওপর ভর করে বাংলাদেশ করে ৪২৬।

লিড ২২৮ রানের। এই লিডই ম্যাচ জয়ে বাংলাদেশের স্বপ্নটা সবুজ করেছে। জশ হ্যাজলউড নেন ৬ উইকেট। নিজের ৩০০ টেস্ট উইকেটের মাইলফলকও ছুঁয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ইনিংসের গল্পটা শুধু তার সাফল্যে আটকে নেই। বরং বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডার যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার ক্লান্ত বোলারদের আরো হতাশ করেছে, সেটাই বেশি মনে থাকার মতো। শেষের ৪ উইকেটে বাংলাদেশ তুলে নেয় ১১৮ রান! মেহেদি মিরাজ লোয়ার অর্ডার ব্যাটারদের নিয়ে যে ব্যাটিং করেছেন, সেটা টেস্ট ব্যাটিংয়ের স্কিল, বুদ্ধিমত্তা আর কৌশলের অনন্য এক প্রদর্শনী।

২২৬ রানে পিছিয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুটাই ছিল অস্বস্তির। প্রথম ইনিংসে ব্যর্থতার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যর্থ ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ড। হাসান মাহমুদের তৃতীয় বলেই স্টাম্পে টেনে ইনসাইড এজ হয়ে শূন্য রানে ফিরলেন তিনি। এরপর ট্র্যাভিস হেড; তিনিও হাসান মাহমুদের শিকার, ১৭ রান করে। আউটের ধরন ঠিক প্রথম ইনিংসের মতোই! ইনসাইড এজ হয়ে বোল্ড!

৩৭ রানে দুই ওপেনারকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া চাপে। মার্নাস লাবুশেন কিছুটা থিতু হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাইজুল ইসলামের সোজা বলটি বুঝতেই পারলেন না লাবুশেন। ৩১ রানে বোল্ড।

দিনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা অবশ্য এলো পরে। প্রথম ইনিংসে ৭১ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে টেনে নেওয়া স্টিভেন স্মিথ এবার মিরাজের বলে ফিরতি ক্যাচ তুলে দিলেন। ৪৪ রানে স্মিথের বিদায়। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের উল্লাস তখন আর থামার নয়। দিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য যে স্মিথের ওই উইকেট।

দিনের শেষ পর্যন্ত ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স কেয়ারি টিকে আছেন। গ্রিন ৪৩, কেয়ারি ১৯ রানে অপরাজিত। কিন্তু তাদের সামনে অপেক্ষা করছে চতুর্থ দিনের সকাল। যে সকালে ব্যাট করতে নামার আগে স্কোরকার্ড জানাচ্ছেÑএখনো অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস হার বাঁচাতে চাই ৬৭ রান।

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে তৃতীয় দিনে খেলেছে ৫৩ ওভার। বল কিছুটা পুরোনো হয়েছে। স্পিনারদের জন্যও তৈরি হচ্ছে সুযোগ। তাইজুল ও মিরাজ ইতোমধ্যেই দেখিয়েছেন, এই উইকেটে বল কখনো ঘুরছে, কখনো আবার ব্যাটারকে চমকে দিচ্ছে অসমান বাউন্সে এবং গতিতে খানিকটা বদল এনে ব্যাটারদের বিপদে ফেলা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য তাই সকালের প্রথম ঘণ্টাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। হাসান মাহমুদ যদি আরেকবার আঘাত করতে পারেন, এরপর মিরাজ-তাইজুল জুটি চাপ ধরে রাখতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারে যাওয়ার আগেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে চলে আসতে পারে।

এখানে রক্ষণাত্মক হওয়ার কোনো কারণ নেই। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ওপর যত দ্রুত সম্ভব চাপ বাড়াতে হবে। কারণ, এই টেস্টে বাংলাদেশ শুধু জয়ের কাছাকাছিই নয়, বরং জয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে। ফিল্ডিংয়ে আরো জবরদস্ত হতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি উইকেটই যেন এখন স্বর্ণমুদ্রা!

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ কখনো টেস্ট জিততে পারেনি। গল্পটি বদলে দেওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। ডারউইনে এখন সেই আনন্দক্ষণের অপেক্ষায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ৬টি উইকেট টেকিং ডেলিভারিই হয়তো খুলে দিতে পারে বহু বছরের বন্ধ দরজা।

ডারউইনের চতুর্থ দিন কি সেই ড্রামা নিয়ে অপেক্ষা করছে?

সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ১৬১/৪ (গ্রিন ৪৩*, কেয়ারি ১৯*)।

বাংলাদেশ: ৪২৬ (তানজিদ ১০১, শান্ত ৮৪, মিরাজ ৬৫; হ্যাজলউড ৬/৮৯)।

*বাংলাদেশ এগিয়ে ৬৭ রানে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন