একটি প্রশ্ন এখন বিশ্বকাপজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঠের গ্যালারি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশনের স্টুডিও থেকে সংবাদমাধ্যম—সবখানেই একই আলোচনা-আর্জেন্টিনা কি সত্যিই বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে?
প্রশ্নটা নতুন নয়। তবে মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর নাটকীয় ৩-২ গোলে জয়ের পর এই প্রশ্ন, এই কৌতূহল, এই সমালোচনা আরো জোরালো হয়েছে। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না সেই প্রত্যাবর্তন। ছিল রেফারিং। ছিল ভিডিও রেফারির সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ।
মিসরের দাবি, তারা শুধু ম্যাচ হারেনি; অবিচারেরও শিকার হয়েছে। কোচ হোসাম হাসান সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, ফিফা নাকি চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতে। অভিযোগটি আবেগের, নাকি এর পেছনে কিছু বাস্তবতাও আছে?
মিসরের ক্ষোভ বোঝা কঠিন নয়।
৭৯ মিনিট পর্যন্ত তারা ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল হাতছানি দিচ্ছিল। কিন্তু শেষ ১১ মিনিটে সবকিছু বদলে যায়। তিন গোল করে ম্যাচ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় মিসরের বাতিল হওয়া গোলে।
মোস্তফা জিকোর দারুণ ফিনিশে বল জালে গেলেও ভিএআরের পর সেটি বাতিল করেন রেফারি। কারণ, আক্রমণ গড়ার শুরুতে মারওয়ান আতিয়া লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। ভিএআরের মতে সেটি ফাউল। আর তাই সেই ফাউলটি বজায় রইল। গোল বাতিল।
এ সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরো বিশ্বে বিতর্ক শুরু হলো। তবে এই বাতিল গোলই যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, তাও কিন্তু নয়। কারণ, ওই গোল বাতিল হওয়ার পরও মিসর আরো একটি গোল করে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল। মজার বিষয় হলো, দ্বিতীয় সেই গোলটি হলো আবার ঠিক বাতিল হওয়া গোলের মতোই। পাল্টা আক্রমণের ছকে এবং গোল করলেনই সেই আগেরজন মোস্তফা জিকো!
আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের পর মিসর আরো দুটি দাবি নিয়ে রেফারির কাছে হাজির হয়। তারা দুটি পেনাল্টির দাবি তোলে । একবার হামদি ফাতহি অভিযোগ করেন, তাকে আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে ধরে রেখেছিলেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। রিপ্লেতে যদিও সেটি স্পষ্ট ছিল না। আর ফাতির পড়ে যাওয়াটা ডাইভিং ছিল কি না-সে সন্দেহও রয়েছে। আরেকবার মোহাম্মদ সালাহ দাবি করেন, জুলিয়ান আলভারেজ আর্জেন্টিনার ডি-বক্সের মধ্যে তার পায়ে আঘাত করেছেন। দুই ঘটনাতেই ডিফেন্ডার এবং অ্যাটাকারের মধ্যে পায়ে পা লাগার ঘটনা ছিল। কিন্তু সেটি পেনাল্টি দেওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে মনে করেছে ভিএআর। তাই ভিএআর সে বিষয়টি মাঠের রেফারির কানে দেয়নি।
মিসরের এ দুটো দাবি এবং সম্ভাব্য ফাউল নিয়ে বার্তা সংস্থা বিবিসি তাদের এক বিশ্লেষণেও পরিষ্কার জানিয়েছে, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়তো কোনো বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু সেটি কোনো ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ নয়। অর্থাৎ, আর্জেন্টিনাকে রেফারি বা ফিফা এ বিশ্বকাপে ম্যাচ চলাকালে কোনো বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে-এমন অভিযোগের সঠিক তথ্যপ্রমাণ মেলেনি।
তবে প্রশ্ন অবশ্য এখানেই শেষ নয়।
টুর্নামেন্টের শুরুতেই আলজেরিয়ার আইসা মান্দির ওপর পেছন থেকে লিওনেল মেসির একটি ট্যাকল নিয়ে বড় বিতর্ক হয়েছিল। মেসি তার বুট পুরো মান্দির পায়ের পেছন দিকে তুলে দিয়েছিলেন। রেফারি তাতে ফাউলের বাঁশি বাজান; কিন্তু মেসি তখন কোনো কার্ডই দেখেননি।
কদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান প্রায় একই ধরনের ট্যাকলের জন্য ভিএআর রিভিউ শেষে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। দুই ঘটনার ভিডিও পাশাপাশি রেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন-যদি বালোগান লাল কার্ড পান, তাহলে মেসি কেন পেলেন না?
এ প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।
যদি সেদিন মেসি বহিষ্কৃত হতেন, তাহলে নিষেধাজ্ঞার কারণে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বাকি সময়, এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে গোল—সবকিছুই বদলে যেতে পারত। অর্থাৎ, বিশ্বকাপে তার আট গোলের মধ্যে পাঁচটিই হয়তো দেখা যেত না।
এমন ফাউলের বিষয়ে অবশ্য রেফারি কার্ড বের করার আগে আরেকটি বিষয়টি বিবেচনা করেন। তিনি আগে নিশ্চিত হতে চান এ ধরনের ফাউল কি ইচ্ছেকৃতভাবে করা হয়েছে। নাকি দুর্ঘটনাবশত পেছন থেকে ট্যাকল করতে গিয়ে ঘটনাটি ঘটেছে। রেফারি যদি নিশ্চিত হন যে, সহিংস আচরণ দেখাতে গিয়ে কেউ এমন ট্যাকল করেছেন, তাহলে লাল কার্ড বের করেন। আবার যদি নিশ্চিত হন এটা নেহাৎ দৌড়াদৌড়ির সময় দুর্ঘটনাবশত হয়েছে, তখন তিনি সেটা উপেক্ষা করেন।
মেসির ক্ষেত্রে রেফারি নিশ্চিত হয়েছিলেন ট্যাকলের ওই ঘটনা ঘটেছে দুর্ঘটনাবশত। তাই মেসি কার্ড দেখেননি।
রেফারির পক্ষপাতের অভিযোগ যাচাই করার সবচেয়ে নিরপেক্ষ উপায় পরিসংখ্যান। এ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রতি ১৯.৭টি ফাউলে একটি হলুদ কার্ড পেয়েছে। তাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে মাত্র তিনটি দল—চেক প্রজাতন্ত্র, নরওয়ে ও তিউনিসিয়া। অন্যদিকে ইংল্যান্ড প্রতি ৭.৭টি ফাউলে একটি হলুদ কার্ড পেয়েছে। অর্থাৎ, ইংল্যান্ডের তুলনায় আর্জেন্টিনা বেশি ফাউল করেও অনেক কম হলুদ কার্ড দেখেছে। এই সংখ্যাগুলো অন্তত একটি প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে—রেফারিরা কি আর্জেন্টিনার প্রতি কিছুটা বেশি সহনশীল, নাকি বেশি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন তারা বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে?
অবশ্য পরিসংখ্যান কখনই একা কোনো পক্ষপাতের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। ম্যাচের ধরন, ফাউলের প্রকৃতি এবং রেফারির ম্যাচ পরিচালনার ধরনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বিবিসি তাদের বিশ্লেষণে আরো একটি পুরোনো ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশের প্রতিনিধি হিসেবে সুযোগ পেয়েছিল ইন্টার মায়ামি। কিন্তু এমএলএসের চ্যাম্পিয়ন ছিল এলএ গ্যালাক্সি। ইন্টার মায়ামি জিতেছিল কেবল সাপোর্টার্স শিল্ড, অর্থাৎ লিগ পর্বের সর্বোচ্চ পয়েন্টের পুরস্কার। তারপরও ফিফা ইন্টার মায়ামিকেই বেছে নেয়। সমালোচকদের মতে, এর ফলে উদ্বোধনী ম্যাচেই মেসিকে মাঠে পাওয়া নিশ্চিত হয়েছিল।
সে সিদ্ধান্তও তখন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
তাহলে উত্তর কী?
আর্জেন্টিনা কি সত্যিই বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে? অবশ্য এখন পর্যন্ত তার পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই।
তবে এমন কিছু সিদ্ধান্ত আছে, যেগুলো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মেসির লাল কার্ড না পাওয়া, মিসরের বিপক্ষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কিংবা হলুদ কার্ডের পরিসংখ্যান—এসব প্রশ্ন তুলছে।
কিন্তু প্রশ্ন তোলা আর ষড়যন্ত্র প্রমাণ করা এক জিনিস নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, বড় দলকে ঘিরে এমন বিতর্ক নতুন নয়। ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি কিংবা আর্জেন্টিনা—প্রতিটি পরাশক্তিকেই কোনো না কোনো সময় এমন অভিযোগ শুনতে হয়েছে।
তবু ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লেখে অভিযোগ নয়, ফলাফল। তাই আর্জেন্টিনা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনই মিলবে না। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি গোল আর প্রতিটি বাঁশি এখন থেকে আরো বেশি কড়া নজরে থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

