দেশের জন্য ভালো কিছু করতে হবে সেটাই শুধু জানতেন জিন্নাত

দেশের জন্য ভালো কিছু করতে হবে 
সেটাই শুধু জানতেন জিন্নাত

বুধবার সন্ধ্যা। আইচি প্রিফেকচুয়াল মার্শাল আর্ট হল। উশুর মঞ্চে লড়াই শেষ। খুব বেশি সময় যে লড়াই হলো, তাও নয়। সব মিলিয়ে দুই মিনিটের মতো। জিন্নাত আক্তার সেই লড়াইয়ে জিততে পারলেন না। লড়াইয়ে হেরেও তার চোখে জল; কিন্তু মুখে হাসির আভা! এ যে আনন্দাশ্রু! সেমিফাইনালে হেরে গেছেন চীনা প্রতিযোগীর কাছে। তবু পদক তার হাতছাড়া হয়নি। ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত হয়ে গেছে আগেই। এবারের এশিয়ান গেমসে এটাই বাংলাদেশের বড় চমক। ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক এলো পূর্ণ ৪০ বছর পর। এশিয়ার মঞ্চে উশুতে এমন কীর্তি এবারই প্রথম।

আগের রাতে জিন্নাত জানতেন, ফল যা-ই হোক, পদক তার নিশ্চিত হয়ে গেছে। তবু চোখে ঘুম আসেনি তার। উত্তেজনা আর ভয় মিলেমিশে ছিল বুকে। সঙ্গে ছিল জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা শরীর। জাপানে পা রাখার রাত থেকেই জ্বরে কাবু তিনি। কোচরা পাশে ছিলেন প্রথম দিন থেকেই। সাহস জুগিয়েছেন। চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ নিয়েছেন। জিন্নাত কঠিন সে সময়ে কোচ-কর্মকর্তাদের পাশে থাকায় কৃতজ্ঞতা জানালেন। বললেন, ‘তখন তারা আমাকে বলেছিলেন দেশের জন্য লড়তে এসেছ। জ্বর-ঠাণ্ডা সব ভুলে যাও। দেশের জন্য ভালো কিছু করতে হবে।’ সে সাহসেই মনোবল ফিরে পেলেন জিন্নাত।

বিজ্ঞাপন

৫২ কেজি ওজন শ্রেণির ফাইট ডিসিপ্লিনে জিন্নাত আক্তারের এই পদক নিশ্চিত হওয়ার গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। প্রথম রাউন্ডেই লটারির ভাগ্যে ‘বাই’ পেয়েছিলেন বাংলাদেশি এই উশুকা। ফলে সরাসরি উঠে যান কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখানেও তাকে কোনো লড়াই করতে হলো না। কারণ, তার ফিলিপিনো প্রতিপক্ষ অতিরিক্ত ওজনের কারণে ডিসকোয়ালিফাই হন। ফলে কোনো ম্যাচ না খেলে সেমিফাইনালে উঠে যান জিন্নাত। সেমিতে কাল চীনের প্রতিযোগী ডি ইউর কাছে পয়েন্ট পার্থক্যে ম্যাচ হারেন। তবে এ ম্যাচে খেলতে নামার আগেই যে তার পদক নিশ্চিত হয়েছিল।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে আইচি প্রিফেকচুয়াল মার্শাল আর্ট হলে উশুর বাকি ইভেন্টের ফাইনাল শেষ হবে। সেখানেই বিজয়ী মঞ্চে উঠবেন জিন্নাত। গলায় উঠবে কাঙ্ক্ষিত সেই ব্রোঞ্জ পদক। লড়াই শেষে আবেগ চেপে রাখতে পারেননি তিনি। বলছিলেন, এটা তার ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক গেমস। আর সেখানেই পদক জিতলেন তিনি। এ আনন্দ প্রকাশের ভাষা তার জানা নেই। সারা রাত তাই ঘুমাতে পারেননি জিন্নাত। কখন কী হয়Ñএই ভেবেই কেটেছে রাত। শেষমেশ দেশবাসীর দোয়াতেই মিলল সাফল্য।

পদক জেতার আনন্দেই থেমে নেই জিন্নাত। চোখে তার এখন বড় স্বপ্ন। লড়াইয়ের মঞ্চ থেকে বেরিয়ে এসে মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে নিজের সামনের সময়ের পরিকল্পনাও ঠিক করে ফেলেছেন জিন্নাত। দাবি জানালেন, বছরজুড়ে অনুশীলনের সুযোগ চাই। সে সুযোগ পেলে সাফল্য বাড়বে আরো। রুপা কিংবা সোনাও আসতে পারে এ ইভেন্টে।

বাংলাদেশ উশু ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দিলদার হোসেন দিলুও একমত এমন কথায়। তার মতে, মূল সমস্যা প্রশিক্ষণের জায়গা নিয়ে। নিজস্ব কোনো ভেন্যু নেই ফেডারেশনের। এদিক-ওদিক ভাড়া করে চলে অনুশীলন। ট্রেনিংয়ের জায়গায় নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও। গরমে একটা ফ্যানও জোটে না অনেক সময়। এমন পরিবেশেই এগিয়ে চলে অনুশীলন।

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালেন দিলু। কমলাপুরে পাঁচ হাজার বর্গফুট জায়গা দেওয়ার আশ্বাস মিলেছে। সে জায়গা পেলে নিজেদের মতো সাজিয়ে নেবে ফেডারেশন। তখন আর থাকবে না ভেন্যু সংকট। চীনা দূতাবাসের সঙ্গেও চলছে কথাবার্তা। একটি উশু কমপ্লেক্স গড়ার পরিকল্পনা আছে তাদের। সেটি হলে মিলবে নিজস্ব একটি ঠিকানা। ঘরে বসেই আয়োজন করা যাবে বড় গেমস।

চীনের সাংহাই ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সম্প্রতি সমঝোতা হয়েছে ফেডারেশনের। প্রতিবছর একটি দল যাবে চীনে। সেখানে হবে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা। চীনা দলও আসবে বাংলাদেশে খেলতে। দুদেশের কোচ বিনিময়ও চলবে নিয়মিত। প্রতিবছর দুজন কোচ যাবেন চীনে। সেখানে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেবেন তারা। এসব উদ্যোগ ফল দিতে শুরু করেছে এবার। জিন্নাতের পদক তারই প্রথম প্রমাণ।

খেলোয়াড়দের মূল ঘাটতি এখন ম্যাচ টেম্পারমেন্টে। আন্তর্জাতিক আসরে খেলার অভিজ্ঞতাই কম তাদের। মালয়েশিয়া, লাওস, ফিলিপাইন কিংবা চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আয়োজনের কথাও ভাবছে ফেডারেশন। তাতে বাড়বে খেলোয়াড়দের বিদেশে খেলার অভিজ্ঞতা। প্রতিবছর একটি করে আন্তর্জাতিক গেমস আয়োজনেরও পরিকল্পনা আছে তাদের। জানুয়ারিতে হবে সাউথ এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ।

শেষ দুই এশিয়ান গেমসে দলই পাঠায়নি বাংলাদেশ উশু ফেডারেশন। এবার সে আক্ষেপ ঘুচল জিন্নাতের হাত ধরে। বর্তমানে চীনের সাংহাইয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ৩০ জনের একটি দল। ৫০ দিনের সেই ক্যাম্প চলছে এখনো। সুযোগ-সুবিধা বাড়লে সামনের এশিয়ান গেমসে সোনার হাসি হাসতে পারে বাংলাদেশÑএমনটাই বিশ্বাস উশু ফেডারেশন কর্তাদের।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন