গোলের খেলায় ডলারের মেলা

আফসার আহমেদ

গোলের খেলায় ডলারের মেলা

চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসে। আমরা দেখি গোল, উল্লাস, কান্না, ট্রফি আর ইতিহাস। কিন্তু এই মহোৎসবের পেছনে আরেকটি অদৃশ্য শক্তিও কাজ করে—অর্থনীতির বিশ্ব। যেখানে একটি গোলের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, পর্যটন, অবকাঠামো নির্মাণ আর বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং।

২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ, তিন আয়োজক দেশ এবং কয়েক কোটি দর্শকের নজর। ফলে এটিকে শুধু ফুটবল টুর্নামেন্ট বললে ভুল হবে; এটি হবে এক বিশাল অর্থনৈতিক প্রকল্প।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপ আসলে কার ব্যবসা?

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাভোগী সাধারণত ফিফা। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ, বিপণন, লাইসেন্সিং এবং আতিথেয়তা প্যাকেজ থেকে সংস্থাটি বিপুল আয় করে। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ থেকে ফিফার রাজস্ব ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল, যা সে সময়ের রেকর্ড। এর বড় অংশ এসেছিল টিভি সম্প্রচার এবং বৈশ্বিক স্পন্সরদের কাছ থেকে। কিন্তু আয়োজক দেশগুলোর হিসাব ভিন্ন। তারা সরাসরি ফিফার আয়ের অংশ পায় না। তাদের লাভ আসে পর্যটন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড ভ্যালু থেকে।

সব বিশ্বকাপ কি লাভ দেয়?

এর উত্তর সহজ নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে ব্রাজিল প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছিল। অনেক স্টেডিয়াম পরে কার্যত অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন, প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি পায়নি দেশটি। অন্যদিকে ২০০৬ বিশ্বকাপ জার্মানির জন্য ছিল এক সফল উদাহরণ। পর্যটন, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। ‘সামার ফেয়ারিটেল’ নামে পরিচিত সেই বিশ্বকাপ জার্মানিকে আরো উন্মুক্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিল। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাও বিশ্বকাপের মাধ্যমে নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করে। যদিও ব্যয়ের পুরো অর্থনৈতিক রিটার্ন নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

২০২৬ : তিন দেশের ভাগাভাগির অর্থনীতি

এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো যৌথ আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো ব্যয়ের চাপ ভাগ করে নিচ্ছে। ফলে নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রয়োজন তুলনামূলক কম। অধিকাংশ ভেন্যুই আগে থেকেই প্রস্তুত। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এই বিশ্বকাপ তিন দেশের পর্যটন খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত প্রবাহ তৈরি করতে পারে। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা, বিজ্ঞাপন এবং ডিজিটাল সেবা খাত সরাসরি লাভবান হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে। ১০৪ ম্যাচের বেশির ভাগই সেখানে অনুষ্ঠিত হবে। নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, মিয়ামি ও কানসাস সিটির মতো শহরগুলোতে লাখ লাখ দর্শকের আগমন স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

স্পন্সরদের বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ এখন করপোরেট বিশ্বেরও উৎসব। কোকা-কোলা, অ্যাডিডাস, ভিসা, হুন্দাই, কাতার এয়ারওয়েজসহ বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বকাপকে ব্যবহার করে শতকোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে। একটি সফল বিশ্বকাপ বিজ্ঞাপনের বাজার, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক অর্থনীতিকেও চাঙা করে। ২০২৬ সালে এআই-ভিত্তিক বিপণন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রসার এই অর্থনীতিকে আরো বড় করবে।

ফুটবলের বাইরেও উত্তরাধিকার

বিশ্বকাপ শেষ হয়, কিন্তু তার অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক সময় থেকে যায়। নতুন রাস্তা, বিমানবন্দর, রেল যোগাযোগ, পর্যটন অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অন্যথায় বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়ে অনেক অবকাঠামোই হয়ে উঠতে পারে ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ বা অলাভজনক সম্পদ।

শেষ কথা

ফুটবলপ্রেমীরা যখন মেসি, এমবাপ্পে বা ইয়ামালের গোলের অপেক্ষায় থাকবেন, তখন মাঠের বাইরে চলবে আরেক প্রতিযোগিতা; অর্থনীতির লড়াই। বিশ্বকাপের ট্রফি একটি দল জেতে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক লড়াইয়ে অংশ নেয় পুরো দেশ। কারণ আধুনিক বিশ্বকাপে শুধু গোল নয়, হিসাবও লেখা হয় বিলিয়ন ডলারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...