সেরাটা দিতে না পেরে ইমরানুরের আক্ষেপ

সেরাটা দিতে না পেরে ইমরানুরের আক্ষেপ

ফিনিশিং লাইন পার করে খানিকক্ষণ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইমরানুর রহমান। বুঝতেই পারছিলেন ভালো কিছু হয়নি। তারপরও সঠিক টাইমিংটা জানার জন্য বোর্ডের দিকে তাকান। চারতলা উঁচু মিডিয়া বক্স থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল মনটা খারাপ তার। আগের দিন ১০.৪৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে সেমিতে উঠেছিলেন। আর গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় নাগোয়া সিটি মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে আরো কম সময়ে দৌড় শেষ করলেন। সময় নিলেন ১০.৪৪। কিন্তু তারপর আটজনের মধ্যে সপ্তম হয়ে ফিনিশিং লাইন টপকালেন। আর এখানেই শেষ তার এশিয়ান গেমস মিশন।

এশিয়ান গেমসে পুরুষদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠেও নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারেননি বাংলাদেশের ইমরানুর রহমান। সেমিফাইনালের নিজের হিটে আট প্রতিযোগীর মধ্যে সপ্তম হয়ে দৌড় শেষ করেছেন তিনি। তিন সেমিফাইনাল হিট মিলিয়ে ২৪ জনের মধ্যে তার অবস্থান হয়েছে ২১তম। ফলে ফাইনালে ওঠার সুযোগ না পাওয়ার পর নিজের পারফরম্যান্সে হতাশাই প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের এই দ্রুততম মানব।

বিজ্ঞাপন

রেস শেষে ইমরানুর বলেন, ‘কী-ই বা বলব? বছরের সবচেয়ে বাজে রেস ছিল এটা, নানা কারণে। তবে এমনটা হয়, আর যা-ই হোক না কেন, আমাকে এখান থেকে সামনে এগোতে হবে। আর কী-ই বা বলব... হ্যাঁ, আমি সত্যিই হতাশ।’

নিজের সেরা টাইমিং কেন করতে পারলেন না?

উত্তরে ইমরানুর মনে করিয়ে দেন, প্যারিস অলিম্পিকের পর প্রায় দুই বছর চোটের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। চলতি বছরই তিনি প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে ফিরেছেন। বলছিলেন, ‘সব সময় তো সবকিছু আর মনের মতো হয় না। প্যারিসের পর দুই বছর ইনজুরিতে থাকার পর এটাই আমার ফেরার প্রথম বছর। তাই আমাকে ইতিবাচক দিকটাই দেখতে হবে। অন্তত আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়নি। তবে আরো ভালো টাইমিং করার চেষ্টা করা উচিত ছিল। আর যা-ই হোক, সামনের টুর্নামেন্টগুলোর জন্য আমাকে আরো ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।’

এশিয়ার শীর্ষ স্প্রিন্টারদের সঙ্গে নিজের অবস্থান নিয়েও কথা বলেছেন ইমরানুর। তার মতে, প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক শক্তিশালী হলেও আজকের দিনে নিজের সর্বোচ্চটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। ইমরানুর বলেন, ‘ওরা বলতে গেলে এশিয়ার সেরা। আমি সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছি, আর আজকের দিনে এটাই ছিল আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা। আজ আমি এর চেয়ে ভালো দিতে পারতাম না, তবে তা যথেষ্ট ছিল না। আমি আমার আসল মান বা দক্ষতা দেখাতে পারিনি।’

তবে নিজের পারফরম্যান্সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন ইমরানুর। রেস বিশ্লেষণ করে ভুলগুলো খুঁজে বের করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘সত্যি বলতে খুব একটা (খুশি) না। কারণ আমি যেমন পারফর্ম করতে চেয়েছিলাম, তা পারিনি। আমার মনে হয় রেসের কিছু কিছু জায়গা আরো ভালো হতে পারত। তবে আমাকে একটু পিছিয়ে এসে পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে হবে, দেখতে হবে কোথায় আরো ভালো করা যেত এবং সেখান থেকে নিজেকে শুধরে নিয়ে এগোতে হবে।’

নিজের সেরা টাইমিং করতে পারলে ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলেও মনে করেন ইমরানুর। তবে প্রতিটি প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত সেরা করার সুযোগ থাকে না বলেও বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন তিনি, ‘আমি বলতে চাচ্ছি, নিজের সেরা টাইমিংটা করতে পারলে অবশ্যই ফাইনালে যেতে পারতাম। কিন্তু সবাই তো আর প্রতিবার নিজের ব্যক্তিগত সেরা টাইমিং করতে পারে না। আমাদের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতার দিকে দেখতে হবে, আর আজ আমার সেই ধারাবাহিকতা ছিল না।

ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে অনুশীলনের সুযোগ ও সময় নিয়েও কিছুটা সমস্যার কথা জানিয়েছেন ইমরানুর। ফুল-টাইম চাকরির পাশাপাশি অ্যাথলেটিকস চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। ফলে অনুশীলনের ক্ষেত্রে আরো নমনীয়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। ইমরানুর বলেন, ‘প্রথমত আপনারা সবাই জানেন, আমি ফুল-টাইম চাকরি করি। চাকরির পেছনে যেমন প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়, তেমনি অনুশীলনেও হয়। অনুশীলনের সময় আমার আরো কিছুটা মনোযোগী হওয়া দরকার। আমি জানি নতুন ফেডারেশন কিছু সহযোগিতামূলক বিষয় নিয়ে কাজ করবে। দেখা যাক সামনে কী হয়, কারণ এই খেলায় আমার হয়তো আর দুই থেকে তিন বছর সময় আছে।’

এবারের মৌসুমকে তাই নিজের জন্য পুনর্গঠনের সময় হিসেবেই দেখছেন ইমরানুর। এশিয়ান ইনডোর টুর্নামেন্টেও সেমিফাইনালে উঠেছিলেন তিনি। অথচ আগের বছরগুলোতে ফাইনাল কিংবা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল তার। বললেন, ‘সত্যি বলতে, এ বছরের এশিয়ান ইনডোর টুর্নামেন্টেও আমি সেমিফাইনালে উঠেছিলাম। আগের বছরগুলোয় আমি ফাইনালে উঠতাম বা চ্যাম্পিয়ন হতাম। এ বছরটা আমার জন্য ফিরে আসার বছর। এ বছরটাকে একটা শক্ত ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে আগামী বছর আরো ভালো করার কাজে লাগাতে চাই, ইনশাআল্লাহ।’

বাংলাদেশের হয়ে এশিয়ান পর্যায়ে স্বর্ণপদক জয়ের স্মৃতিও ইমরানুরের কাছে বিশেষ। ভবিষ্যতে আরো কিছু দেওয়ার তাড়নাই এখন তাকে এগিয়ে নিতে চায়। তার কথায়, ‘একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমি সব সময় নিজের খেলায় উন্নতি করতে চাই। আমি জানি এশিয়ান ইনডোরে আমি একটি স্বর্ণপদক পেয়েছিলাম। সত্যি বলতে, এশিয়ান পর্যায়ে বাংলাদেশের হয়ে পরবর্তী স্বর্ণপদক কবে আসবে তা আমি নিশ্চিত নই। আমার জন্য ওটাই ছিল সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। তবে আমি আরো অনেক কিছু দিতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয় সামনের এই দুটি বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এরপর আমি কতটা দিতে পারব তা জানা নেই।’

এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে প্রত্যাশিত ফল না এলেও ইমরানুরের কথায় স্পষ্ট, এই ব্যর্থতাকে থেমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন না তিনি। বরং চোট কাটিয়ে ফেরা এই মৌসুমকে ভিত্তি করে সামনের দুই বছরে নিজেকে আরো প্রস্তুত করে তুলতে চান বাংলাদেশের এই স্প্রিন্টার। অ্যাথলিটদের রুমে ফিরে যাওয়ার সময় সেই প্রতিশ্রুতিই দিয়ে গেলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন