বৃহস্পতিবার সকাল। নাগোয়ার আইচি প্রিফেকচুরাল মার্শাল আর্টস হলের ভেতর তখন অন্যরকম এক ব্যস্ততা। আগের দিনের উত্তেজনা নেই, নেই সেমিফাইনালের লড়াইয়ের চাপও। বরং চারপাশে যেন অপেক্ষা একটি মুহূর্তের জন্য। সেই মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের জিন্নাত আক্তার।
হলের ভেতরে ঢুকলেন জিন্নাত। সঙ্গে উশু ফেডারেশনের কর্মকর্তারা, পাশে কোচ। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়ের রানাও এসেছেন এই আনন্দের সাক্ষী হতে। একে একে পাঁচটা ইভেন্টের ফাইনাল শেষ হলো। তৈরি হলো বিজয় মঞ্চ। খানিকবাদেই সেই পদকের মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন বাংলাদেশের উশুকার জিন্নাত আক্তার।
জিন্নাত এগিয়ে গেলেন। গলায় পরিয়ে দেওয়া হলো এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জ পদক। মুহূর্তটা খুব বড় কোনো শব্দ চায় না। হাতে পদক, চোখের কোণে জল, ঠোঁটে চাপা হাসি। চারপাশে লাল-সবুজের মানুষের উচ্ছ্বাস। যেন একটি পদকের সঙ্গে ফিরে এলো বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষাও।
৪০ বছর একজন ক্রীড়াবিদের জীবনে চার দশক খুব দীর্ঘ সময়। একটি দেশের ক্রীড়া ইতিহাসেও আরো দীর্ঘ। ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সিংয়ে মোশাররফ হোসেন ব্রোঞ্জ জেতার পর ব্যক্তিগত ইভেন্টে আর কোনো পদক আসেনি বাংলাদেশের। অপেক্ষা চলেছে বছরের পর বছর। এক প্রজন্ম গেছে, আরেক প্রজন্ম এসেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত ইভেন্টের পদকটি আর ফেরেনি।
নাগোয়ায় এসে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন জিন্নাত আক্তার। নারীদের ৫২ কেজি সান্দায় তার ব্রোঞ্জ শুধু একটি পদক নয়। চলতি এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম পদকও এটি। জিন্নাতের হাত ধরেই নাগোয়ার পদক মঞ্চে প্রথমবার উঠল বাংলাদেশের পতাকা।
অদ্ভুতভাবে, তার পদকের পথটা শুরু হয়েছিল কোনো লড়াই ছাড়াই। ড্র অনুযায়ী প্রথম রাউন্ডে বাই পেয়েছিলেন জিন্নাত। ফলে সরাসরি উঠে যান পরের ধাপে। কোয়ার্টার ফাইনালেও তাকে লড়াই করতে হয়নি। ইন্দোনেশিয়ার থারিসা দিয়া ফ্লোরেন্তিনা নির্ধারিত ওজনের মধ্যে থাকতে না পারায় ডিসকোয়ালিফাই হন। কোয়ার্টার ফাইনালে না নেমেই সেমিফাইনালের টিকিট হাতে চলে আসে জিন্নাতের।
সঙ্গে নিশ্চিত হয়ে যায় অন্তত ব্রোঞ্জ। কিন্তু জিন্নাত তখন ব্রোঞ্জে থামতে চাননি। পদক নিশ্চিত হওয়ার পরও তার চোখ ছিল ফাইনালের দিকে। আরও এক ধাপ। তারপর স্বর্ণ কিংবা রুপার লড়াই। ২৩ সেপ্টেম্বর সেই স্বপ্ন নিয়ে ম্যাটে নামলেন তিনি। সামনে চীনের শক্তিশালী উ দি।
সেখানে আর পেরে ওঠেননি বাংলাদেশের উশুকা। ০-৪ ব্যবধানে হেরে থেমে যায় জিন্নাতের স্বর্ণের স্বপ্ন। থেমে যায় রুপার আশাও। কিন্তু থামেনি তার অর্জনের গুরুত্ব। এই ইভেন্টে তৃতীয় স্থান নির্ধারণের আলাদা লড়াই নেই। ফলে সেমিফাইনালে পরাজিত জিন্নাত এবং হংকংয়ের চ্যান তসজিং-চিং পান যৌথ ব্রোঞ্জ। পদকটি তাই জিন্নাতের গলায় ওঠার আগেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
তবু পদক হাতে নেওয়ার সেই মুহূর্তটি ছিল অন্যরকম।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে জিন্নাত যখন ব্রোঞ্জ গ্রহণ করছিলেন, তখন তার আবেগ যেন বলে দিচ্ছিল এই পদকের ওজন কতটা। চার দশকের অপেক্ষা, নিজের লড়াই, দেশের উশুর সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক মঞ্চের চাপ, সবকিছুর হিসাব যেন সেই ছোট্ট ব্রোঞ্জ পদকের মধ্যে জমা ছিল। এই হার তাই তার গল্পকে ছোট করেনি। বরং পদকের মূল্য আরো স্পষ্ট করেছে।
কারণ জিন্নাত যে দেশ থেকে উঠে এসেছেন, সেখানে উশু খেলোয়াড়দের সারা বছর অনুশীলনের জন্য নিজেদের কোনো স্থায়ী ভেন্যু নেই। আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও সীমিত। উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞ কোচিং সুবিধার অভাবও আছে। অথচ সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই এশিয়ার সেরা ক্রীড়াবিদদের মঞ্চে উঠে পদক জিতেছেন তিনি।
পদক পাওয়ার পর নিজের সাফল্য নিয়ে খুব বেশি কথা বলেননি জিন্নাত। বরং কথা বলেছেন বাংলাদেশের উশু নিয়ে। তার চাওয়া খুব স্পষ্ট। সারা বছর অনুশীলনের সুযোগ, একটি নিজস্ব ভেন্যু, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচ। জিন্নাতের কথায় তাই শুধু একজন পদকজয়ীর আনন্দ নেই। আছে আরো দূর যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আছে তার পরের প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করার চেষ্টা।
সকালে আইচি প্রিফেকচুরাল মার্শাল আর্টস হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় জিন্নাতের গলায় তখনো ঝুলছিল সেই ব্রোঞ্জ। চোখেমুখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ছিল স্বস্তি। পাশে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। মাঝে মাঝে পদকের দিকে তাকাচ্ছিলেন নিজেও।
হয়তো তখন তার নিজের কাছেও পুরো ব্যাপারটি বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।
এশিয়ান গেমস এখনো শেষ হয়নি। বাংলাদেশের সামনে আরো ইভেন্ট আছে, আরো লড়াই আছে। আর্চারি ও পুরুষদের ক্রিকেটেও পদকের সম্ভাবনা রয়েছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলবে। তবে নাগোয়ার এই গেমসে বাংলাদেশের প্রথম পদকটি ইতোমধ্যে ইতিহাস হয়ে গেছে।
আর সেই ইতিহাসের নাম জিন্নাত আক্তার। গলায় একটি ব্রোঞ্জ। গায়ে লাল-সবুজ। চোখে আনন্দের জল। ৪০ বছর পর বাংলাদেশের ব্যক্তিগত পদকের অপেক্ষা শেষ হলো। আর সেই অপেক্ষার শেষ নামটি হয়ে রইল জিন্নাত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


