ফ্রান্স বনাম মরক্কো

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি প্রতিশোধ

নজরুল ইসলাম

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি প্রতিশোধ

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬-এর রোমাঞ্চ এখন তুঙ্গে। আজ বৃহস্পতিবার রাতে বোস্টন স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালে ওঠার মহালড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্স ও উত্তর আফ্রিকার পরাশক্তি মরক্কো। এ ম্যাচটি কেবল একটি কোয়ার্টার ফাইনালই নয়, বরং ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালের এক দুর্দান্ত পুনরাবৃত্তি। সেবার মরক্কোর রূপকথার পথচলা থামিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ফরাসিরা। এবার বোস্টনের মাঠে ডিফেন্ডিং রানার্সআপদের হারিয়ে সে হারের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ‘আটলাস লায়ন্স’খ্যাত মরক্কো। অন্যদিকে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্সের সামনে রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নতুন রেকর্ড গড়ার হাতছানি। দুদলের ম্যাচটি মাঠে গড়াবে আজ রাত ২টায়। এই ম্যাচ দিয়েই শুরু হচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই।
দিদিয়ের দেশমের অধীনে বিশ্বফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স এখন দুর্দান্ত ধারাবাহিক পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালের রানার্সআপরা যদি এ ম্যাচে মরক্কোকে হারাতে পারে, তবে তারা ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দেশ হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছানোর অনন্য কীর্তি গড়বে। এর আগে কেবল জার্মানি (১৯৮২-৯০ এবং ২০০২-১৪) এবং ব্রাজিল (১৯৯৪-০২) এই গৌরব অর্জন করতে পেরেছিল। বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে টানা সাত জয়ের এক দুর্দান্ত ধারাবাহিকতায় রয়েছে ‘লে ব্লুজ’রা। তবে শেষ ১৬-এর ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। লাতিন আমেরিকার দলটির শারীরিক শক্তি প্রদর্শন ও মাথা গরমের ম্যাচে ফরাসিদের ছন্দ নষ্ট করার চেষ্টা করলেও ৭০ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ফিফা র‌্যাংকিংয়ের নাম্বার ওয়ান দল ফ্রান্স।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে করা গোলটির মাধ্যমে টুর্নামেন্টে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন। শুধু গোলই করেননি, সতীর্থদের জন্য ১২টি সুযোগ তৈরি এবং দুটি অ্যাসিস্টও করেছেন।
ফরাসি উইঙ্গার মাইকেল অলিস তার প্রথম বিশ্বকাপেই রেকর্ড বই ওলটপালট করছেন। ১৯৭৮ সালে ব্রাজিলের কিংবদন্তি জিকোর পর অলিসই প্রথম খেলোয়াড়, যিনি নিজের অভিষেক বিশ্বকাপেই ১০টির বেশি ড্রিবলিং (১১টি), ওপেন প্লে থেকে সুযোগ তৈরি (১০টি) এবং নিখুঁত থ্রু বল (১১টি) দেওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।
কাতার বিশ্বকাপে থিও হার্নান্দেজ ও রান্ডাল কোলো মুয়ানির গোল মরক্কোর কোটি ভক্তের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল। চার বছর পর মোহামেদ ওয়াহবির শিষ্যরা এখন অনেক বেশি পরিপক্ব। শেষ ১৬-এর ম্যাচে কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে। ইতোমধ্যে তারা বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পাঁচ ম্যাচে অপরাজিত থাকার এক অনন্য আফ্রিকান রেকর্ড গড়েছে (২০২২ ও ২০২৬ উভয় আসরে)।
র‌্যাংকিংয়ের ষষ্ঠ দল মরক্কোর প্রধান দুই হাতিয়ার হলেন ব্রাহিম দিয়াজ ও আশরাফ হাকিমি। ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) শুরুর পর থেকে সব ধরনের টুর্নামেন্ট মিলিয়ে মরক্কোর হয়ে সর্বোচ্চ ১০ গোলে (ছয় গোল, চার অ্যাসিস্ট) সরাসরি অবদান রেখেছেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা দিয়াজ। অন্যদিকে পিএসজি তারকা আশরাফ হাকিমি রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখছেন। তিনি গত দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে যেকোনো ডিফেন্ডারের চেয়ে বেশি সুযোগ (২১টি) তৈরি করেছেন। চলতি আসরে তার তৈরি করা ১৫টি সুযোগ ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো আফ্রিকান ডিফেন্ডারের জন্য এক রেকর্ড।
গুরুত্বপূর্ণ এ ম্যাচের আগে দুদলের কোচই খেলোয়াড়দের চোট নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। মরক্কোর জন্য বড় ধাক্কা হলো বায়ার্ন মিউনিখের নতুন সাইনিং ইসমায়েল সাইবারি। গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোল করা এই তারকা কানাডার বিপক্ষে উরুর ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়েন; ফলে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার খেলা অনিশ্চিত। এছাড়া ডিফেন্ডার চাদি রিয়াদের হাঁটুতেও চোট রয়েছে।
অন্যদিকে ফ্রান্স শিবিরে কুঁচকির ইনজুরির কারণে অহেলিয়াঁ চুয়ামেনি না ফিরলে মাঝমাঠে আবারও দেখা যেতে পারে মানু কোনেকে। পাশাপাশি প্যারাগুয়ে ম্যাচে ব্যাক পেইন বা পিঠের ইনজুরি নিয়ে খেলা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবার ফিটনেসের দিকেও চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন কোচ দেশম।
ঐতিহাসিকভাবে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রান্সের রেকর্ড বেশ ভারী। দুদলের মোট ছয়টি দেখায় ফরাসিরা জিতেছে চারটিতে, বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে ফ্রান্সের জন্য বড় উদ্বেগের জায়গা হলো আফ্রিকান দলগুলোর বিপক্ষে তাদের সাম্প্রতিক রেকর্ড। এ শতাব্দীতে বিশ্বকাপে ফ্রান্স যতগুলো ম্যাচ হেরেছে (টাইব্রেকার বাদে), তার ঠিক অর্ধেকই (ছয়টির মধ্যে তিনটি) আফ্রিকান দলগুলোর বিপক্ষে। যেখানে এ সময়ে ইউরোপীয় ও লাতিন দলগুলোর বিরুদ্ধে ২৪ ম্যাচ খেলে তারা হেরেছে মাত্র দুটি।
অপ্টা সুপার কম্পিউটার বলছে, এ ম্যাচে ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ৬০.৯ শতাংশ এবং মরক্কোর জয়ের সম্ভাবনা ১৬.৯; আর ম্যাচটি অতিরিক্ত সময় বা পেনাল্টি শুটআউটে গড়ানোর সম্ভাবনা ২২.২ শতাংশ।
এ ম্যাচটি ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের জন্যও বিশেষ কিছু। এটি কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে তার ২৫তম ম্যাচ। এর মাধ্যমে তিনি জার্মানির কিংবদন্তি কোচ হেলমুট শোনের (১৯৬৬-৭৮) বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৫ ম্যাচ পরিচালনার ঐতিহাসিক রেকর্ড স্পর্শ করবেন।
বোস্টন স্টেডিয়ামে জয়ী দলটি সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন অথবা বেলজিয়ামের। একদিকে ফ্রান্সের হ্যাটট্রিক সেমিফাইনালের স্বপ্ন, অন্যদিকে মরক্কোর প্রতিশোধের আগুন। সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্ব একটি ধ্রুপদী লড়াই দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

মুখোমুখি লড়াই ৬
ফ্রান্সের জয় ৪
মরক্কোর জয় ০
ড্র ২


র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান
ফ্রান্স ১
মরক্কো ৬

বিজ্ঞাপন
Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...