অবসরের বেদনা থেকে অমরত্বের শিখরে ‘ক্ষুদে জাদুকর’

FB_IMG_1780466287703
আরিফুল হক বিজয়

অবসরের বেদনা থেকে অমরত্বের শিখরে ‘ক্ষুদে জাদুকর’

‘আমি সব সময়ই বলেছি মেসি মোটেও সহজ পাত্র নন। আমার কাছে লিওই সর্বকালের সেরা ফুটবলার! অভিনন্দন, চ্যাম্পিয়ন।’

কথাটা মিরোস্লাভ ক্লোসার; জার্মান কিংবদন্তি। অথচ অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলটিই ইতিহাসের পাতায় ক্লোসাকে ঠেলে দিয়েছে দুইয়ে! কিন্তু ক্লোসা জানেন, মাঝেমধ্যে দুইয়ে থাকাটাই জীবনের সেরা অর্জন, যেখানে লিওনেল মেসি নামের এক জাদুকর আছেন শীর্ষে। বিশ্বকাপে সর্বকালের সেরা গোলদাতার শিখরে মেসিকে বসিয়ে ডালাসের গোধূলির বিকালে অস্তে যেতেও তাই আপত্তি নেই ক্লোসার। অথচ এই মেসির ক্যারিয়ারই অস্তমিতের পথে ছিল!

বিজ্ঞাপন

২০১৬ সাল। কোপা আমেরিকার ফাইনাল। চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস, টানা চারটি বড় ফাইনালের ব্যর্থতার ভার—সব মিলিয়ে লিওনেল মেসির ভেতরকার ক্লান্তি তখন চূড়ায়। সে যন্ত্রণার মাঝেই তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জন্য জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ। আমি যা পারার করেছি। চ্যাম্পিয়ন না হতে পারাটা কষ্ট দেয়।’

সে ঘোষণার পর ফুটবল যেন থমকে গিয়েছিল। কিন্তু সময়, ইতিহাস আর ভাগ্য—কেউই মেসিকে নিঃশেষ করতে পারেনি। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই বেদনার নীলাভ আভা এক দশকে পেরিয়েছে দেড় হাজার মাইল। এসে পৌঁছে ডালাসে। মেটলাইফের ঘাসে চুইয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু রূপ নিয়েছে আনন্দে। মেসি শিরোপাহীনতার বেদনা পেরিয়ে নাম লিখিয়েছেন অমরত্বের মহাকাব্যে। যেখানে কেবল তার নামেই আস্ত একটি অধ্যায়ে জ্বলজ্বল করছে এক বিশ্বকাপ ও দুটি কোপার শিরোপা।

১০ বছর পর ৩৯তম জন্মদিনের ঠিক আগে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু আর্জেন্টিনার বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের অংশই নন; বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই সর্বোচ্চ গোলদাতা। আন্তর্জাতিক অবসর ভেঙে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটাই যেন লিখে দিয়েছে এক নতুন যুগ। আর্জেন্টিনার জন্য সেটি পরিণত হয়েছে স্বর্ণালি অধ্যায়ে—দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা, আর ২০২২ বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যিক জয়। যেখানে ফাইনালে দুই গোলসহ অধিনায়ক মেসি সাত গোল করে ১৯৮৬ সালের পর ৩৬ বছরের আক্ষেপে প্রলেপ দিয়ে দেশকে এনে দিয়েছেন বিশ্বকাপের স্বাদ।

আর এবার আরেক কীর্তি। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্মরণীয় ম্যাচের ৪০ বছর পূর্তির দিনে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ জয়ে দুই গোল করে মেসি আবার লিখলেন নতুন অধ্যায়। বিবিসির স্টিভ বাওয়ারের ভাষায় ‘আরেকটি অমর মেসি মুহূর্ত’।

আট মিনিটে পেনাল্টি মিস, যেন গল্পের শুরুতেই ছোট্ট একটা কাঁপন। এরপর ৩০ মিনিটের মাথায় সব ভুলে যায় বিশ্ব। নিচু শটে আসে ১৭তম বিশ্বকাপ গোল; মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে ইতিহাসের শীর্ষে উঠে যান তিনি। আর দ্বিতীয়ার্ধে যোগ করা সময়ের জাদুতে নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায় ডালাস; দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে, টাইট অ্যাঙ্গেল থেকে আসে ১৮তম গোল। স্প্যানিশ সাংবাদিক গুইয়েম বালাগে বিস্মিত হন, ‘আমাদের কাছে মেসির জন্য মূর্তি বানানো বা গভীর বিশ্লেষণের সময় নেই। আমরা তার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না।’

এ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার পাঁচটি গোলই এসেছে মেসির পা থেকে। ২৮ ম্যাচে ১৮ গোল—যার মধ্যে ১২টি এসেছে ৩৫ বছরের পর। ১৪টি বাম পায়ে, চারটি বক্সের বাইরে থেকে। এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, গত ছয় ম্যাচে ১২ গোলে অবদান (১০ গোল, ২ অ্যাসিস্ট)। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করে মেসি আরেকটি বিরল কীর্তিও গড়েছেন। তিনি বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোল করা মাত্র তৃতীয় ফুটবলার। এর আগে এই কৃতিত্ব ছিল শুধু ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন (১৯৫৮) ও ব্রাজিলের জর্জিনহোর (১৯৭০)। সাবেক ইংলিশ ফুটবলার ড্যানি মারফির ভাষায়, ‘তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তা অন্য পর্যায়ের।’ অলিভিয়ে জিরু যোগ করেন, ‘সে অবিশ্বাস্য। এক ম্যাচের পর আরেক ম্যাচ খেলার মতো ক্ষমতা তার আছে।’

ব্যর্থতার অধ্যায়ও আছে এই গল্পে। পেনাল্টি মিস; ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথম এমন ভুল তার নামেই। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি নেওয়া (৭) এবং মিস (৩) তারই। তবে মেসি যে এই ব্যাপারটা উপভোগ করছেন না, জানালেন সেটাও- ‘আমি (নিজের উপর) খুব রেগে গিয়েছিলাম… তবে আমরা ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পেরেছি।’ মারফির সংক্ষিপ্ত স্বীকৃতি— ‘মেসিও মানুষ’। আর হয়তো সেই মানবিকতাই তাকে আরও বড় করে তোলে।

মেসি বোধহয় বড় হতে চান না। ৩৯-এর কাছকাছি এসেও যে তিনি ভক্ত-সমর্থকদের কাছে মহাকাব্যের পাতায় একের পর এক কীর্তি গেঁথে যাওয়া ‘ক্ষুদে জাদুকর’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...