আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জব্বারের বলীখেলা

শক্তির প্রতীক বাঘা

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম

শক্তির প্রতীক বাঘা

বিকেলের সূর্য তখন সবে হেলে পড়েছে, গরমের তীব্রতা ছিল অটুট। আকাশে গাঢ় লাল আভা ছড়ানো মুহূর্তে, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা মাঠে শুরু হয় এক আকর্ষণীয় লড়াই। ধূলায় ঢাকা আঙিনায়, কুমিল্লার দুই বলী প্রস্তুত হয়ে উঠলেন এ গর্বিত লড়াইয়ের জন্য। একজন ছিলেন বাঘা শরীফ, অন্যজন রাশেদ।

এদের মধ্যে চললো ৫৭ মিনিটের জমজমাট লড়াই। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা ছিল কঠিন। রেফারিও ছিলেন কাহিল। ৫৭ মিনিট ধরে চলা এই লড়াইয়ের শেষে, রেফারি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঘোষণা করেন, “মাটিতে পিঠ ফেলতে হবে না, তবে যে প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলবে, তিনি হবেন চ্যাম্পিয়ন।”

বিজ্ঞাপন

এবার বাঘা শরীফ নিজেকে প্রমাণ করলেন। মুহূর্তেই রাশেদকে মাটিতে ফেলে দেন। তখনই ঘোষণা করা হয়, কুমিল্লার বাঘা শরীফ এবারও জব্বারের বলীখেলার চ্যাম্পিয়ন। এটি ছিল চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার ১১৬তম আসর, যেখানে কুমিল্লার বাঘা শরীফ আরেকবার রাশেদকে পরাজিত করে শিরোপা জিতেছেন।

এর আগের আসরেও তিনি রাশেদকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। শুক্রবার বিকেল ৪টায়, চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে এ ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নিয়েছিল ১২০ জন বলী।

শুরুতে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার সাওদাগর এ বলীখেলার সূচনা করেন। এরপর থেকে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ১২ তারিখে এ প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়ে থাকে। এই খেলার সাথে সাথে লালদীঘির পাড়ে শুরু হয় স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় লোকজ মেলা, যা পুরো এলাকাকে উৎসবের নগরীতে পরিণত করে।

এ বছরেও, এই ঐতিহ্যবাহী খেলা ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস এবং দর্শকদের আগমন ছিল ব্যাপক। মেলায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল লালদীঘির ময়দান। জব্বারের বলীখেলার সংস্কৃতি চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।

জব্বারের বলীখেলা শুধু একটি খেলা নয়, এটি চট্টগ্রামের সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব যা আজও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত।

333

এছাড়া, খেলাটি কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী মেলা ১২ বৈশাখে লালদীঘি ময়দানে শুরু হয়ে ৩ দিন ধরে চলতে থাকে। বিকেল ৪টায় খেলা শুরু হলেও, দুপুর থেকেই লালদীঘির ময়দান কানায় কানায় ভরে যায়। দর্শকরা কেউ কোলের শিশুকে নিয়ে, আবার কেউ প্রিয়জনের হাত ধরে ঐতিহ্যবাহী এ খেলা দেখতে আসেন।

মোহাম্মদ আলী নামে একজন স্থানীয় দর্শক বলেন, আমি প্রতি বছর এ খেলা দেখতে আসি। চট্টগ্রামের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে দেখে খুব ভালো লাগে। বাঘা শরীফের খেলা তো বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে, প্রতি বছরই তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। এটা আমাদের শহরের গর্ব।”

আরেক দর্শক রহিমা বেগম বলেন, এই খেলা শুধু একটা খেলা নয়, এটি আমাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের অংশ। ছোট থেকে দেখে আসছি, এখনও এই দিনে আসি। মেলা, খেলা-সব কিছু মিলে এক আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। আমার ছোট্ট ছেলে এবার প্রথম বার এসেছে, তার খুব ভালো লাগছে।”

জাহিদুল ইসলাম, একজন যুবক বলেন, বলি খেলা দেখতে আসাটা এক ধরনের আবেগের বিষয়। এখানকার মাটি, খেলা, সংস্কৃতি-সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। এটা শুধু খেলা নয়, আমাদের শেকড়, আমাদের ঐতিহ্য।

এই খেলা এখন চট্টগ্রামের বন্দর নগরী এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন