বিশ্বকাপের গল্প সাধারণত দলকে ঘিরে লেখা হয়। কিন্তু কিছু কিছু বিশ্বকাপ আছে, যেখানে গল্পের কেন্দ্রে চলে আসেন ফুটবলার। কখনো সে গল্পের নায়ক একজন। কখনো দুজন অথবা তিনজন। ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন ঠিক সেরকমই চমকপ্রদ এক গল্পের দিকে এগোচ্ছে।
আগে নামগুলো শুনি। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হ্যালান্ড-তিনজনই গোল করছেন, রেকর্ড ভাঙছেন। আর একে অপরকে তাড়া করছেন। মনে হচ্ছে যেন মাঠে শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে নয়, নিজেদের মধ্যেও একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে।
ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুই গোল করলেন মেসি। শুধু ম্যাচ জেতালেন না, ভেঙে দিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রেকর্ডগুলোর একটি। মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলকে পেছনে ফেলে পৌঁছে গেলেন ১৮ গোলে। অবাক করার বিষয় হলো, এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত পাঁচ গোল করেছে। পাঁচটিই মেসির। ৩৮ বছর বয়সে এমন আধিপত্য সাধারণ কোনো ফুটবলারের গল্প নয়।
এটা কিংবদন্তির গল্প। এটা এমন এক মানুষের গল্প, যিনি সময়ের সঙ্গেও প্রতিযোগিতায় জিতছেন। কিন্তু মেসির পেছনে ছায়ার মতো আছেন আরেকজন। ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইরাকের বিপক্ষে নিজের আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির ম্যাচে জোড়া গোল করলেন ফরাসি তারকা। তিন বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা এখন ১৬। একটু জানিয়ে দিই-আগের দুই বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ছিল ১২। সেই দুই বিশ্বকাপের দুটিতেই তিনি ফাইনালে খেলেছেন। ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন। চার বছর আগে ২০২২ সালে রানার্সআপ।
এবার? সময়েই মিলবে সে প্রশ্নের উত্তর।
জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা সর্বোচ্চ গোলের যে চারটি বিশ্বকাপ খেলেছিলেন, এমবাপ্পে সেখানে পৌঁছে গেছেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এবং তার বয়স এখনও মাত্র ২৭। আরো অন্তত দুটি বিশ্বকাপ খেলা সম্ভবত তার বাকি রয়েছে।
ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষক জুলিয়েন লরেন্স বলছিলেন, ‘আমার তো মনে হয় এ বিশ্বকাপটি এবার এমবাপ্পের বিশ্বকাপ হতে পারে। কারণ, সে এমন এক রেকর্ডের পেছনে ছুটছে-যা এখন মেসির হাতে।’
এ কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে পুরো বাস্তবতা। মেসি এখন শীর্ষে; কিন্তু শিকারি হয়ে পেছনে আছেন এমবাপ্পে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে গোল্ডেন বলের লড়াইয়ে মেসি-এমবাপ্পে-রোনালদোর নাম থাকলেও সে সম্ভাবনার তালিকায় আর্লিং হ্যালান্ডের নাম ছিল অনেক পেছনে, খানিকটা অস্পষ্ট আকারে। সম্ভবত এ উপেক্ষা পছন্দ হয়নি নরওয়ের এই স্ট্রাইকারের। তাই নিজের অভিষেক বিশ্বকাপে যা করলেন, সেটা এখন পর্যন্ত নরওয়ের আর কেউ করে দেখাতে পারেননি। টানা দুই ম্যাচে দুটি করে গোল করে চলতি বিশ্বকাপে হ্যালান্ডের গোল এখন চার। এমবাপ্পের সমান। নরওয়ের হয়ে এই গোলমেশিন হ্যালান্ডের পরিসংখ্যান দুর্দান্ত, ৫২ ম্যাচে ৫৯ গোল। আর বিশ্বকাপে নিজের প্রথম দুই ম্যাচে যা করলেন হ্যালান্ড, তা নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসে কারো নেই।
হ্যালান্ডকে নিয়ে স্কটল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার অ্যালি ম্যাককয়েস্টের মন্তব্যটা সত্যিই বাঁধিয়ে রাখার মতোই-‘প্রকৃতিগত প্রতিভার বিচারে মেসি সবার ওপরে। তার পরেই এমবাপ্পে। কিন্তু বল জালে পাঠানোর কথা বললে হ্যালান্ডের সমকক্ষ কেউ নেই।’
তাহলে এবার অঙ্ক মেলাই।
মেসি ম্যাচ তৈরি করেন, রেকর্ড গড়েন। এমবাপ্পে সেই রেকর্ড নিজের করার লড়াইয়ে নামেন। আর হ্যালান্ড এ দুইয়ের শ্রেষ্ঠত্বে ভাগ বসাতে ছুটছেন। ফুটবল মাঠে তিনজনের কাজ তিনরকম। তিনজনের ফুটবলও তিনরকম। তবে গন্তব্য কিন্তু ওই একই- গোল।
আর সেই গোলের পথ ধরেই এখন চলছে গোল্ডেন বুটের দৌড়।
দুই ম্যাচ শেষে মেসির পাঁচ গোল। এমবাপ্পের চার। হ্যালান্ডের চার। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বার এমন ঘটনা ঘটল, যখন প্রথম দুই ম্যাচ শেষে তিন ফুটবলারের গোলসংখ্যা চার বা তারও বেশি। শেষবার এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। সে বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির সান্দর কচিস করেছিলেন ১১ গোল। চার বছর পর জাস্ট ফন্টেইন করেছিলেন ১৩ গোল। আজও যা এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। এ রেকর্ডটিও কি এবার হুমকির মুখে?
ফ্রান্সের সাবেক ডিফেন্ডার গায়েল ক্লিশি বলেন, ‘এমবাপ্পেদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা ভয় পায় না। তারা বয়স দেখে সম্মান করে না, পারফরম্যান্স দেখে সম্মান করে।’
এ কথাটি শুধু এমবাপ্পের জন্য নয়। হ্যালান্ডের জন্যও সত্যি। আর আশ্চর্যের বিষয়, ৩৮ বছর বয়সেও মেসি যেন একই মানসিকতা নিয়ে খেলছেন। তিনি এখনো ক্ষুধার্ত। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে তার দ্বিতীয় গোল করতে মেসি যে কসরত এবং প্রচেষ্টা দেখালেন, তাতেই স্পষ্ট গোলক্ষুধা তার এখনো তুমুল। এখনো নতুন রেকর্ডের পেছনে ছুটছেন তারুণ্যের তেজে। এখনো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিচ্ছেন অভিজ্ঞতার আলোকে।
এ তিনজনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনে হাসতে হাসতে বলেছিলেন-‘মেসি, এমবাপ্পে আর হ্যালান্ডকে দেখে বিরক্ত লাগে। ওরা যেন অবধারিতভাবেই গোল করবে!’
এ বিশ্বকাপ প্রতি ম্যাচেই এই ত্রয়ীকে নিয়ে নতুন গল্প লিখছে। মেসি, এমবাপ্পে ও হ্যালান্ডের সেই গল্পে এবারের বিশ্বকাপের নায়ক হবেন কে? শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বুটের ট্রফি হবে কার?
সে প্রশ্নের উত্তর পেতে এখনো বাকি বেশ। তবে তার আগে গোটা ফুটবল বিশ্ব মুগ্ধ হয়ে দেখল এই ত্রয়ীর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের দৌড়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


