হিসাবটা অনুমিতই ছিল, হচ্ছেও তাই। এশিয়ান গেমসের পদকের লড়াই শুরু হতেই চেনা চিত্রটা সামনে এসেছে। একদিকে স্বাগতিক জাপানের প্রথম সোনার উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে চীনের একের পর এক পদক জয়ের খবর। আর নাগোয়ার বিভিন্ন ভেন্যু ঘুরে দিনের শেষ ভাগে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছিল একের পর এক হতাশার খবর।
গতকাল রোববার সকাল থেকেই বদলে গেছে নাগোয়ার চেহারা। উদ্বোধন অনুষ্ঠানের উৎসবের রেশ তখনো পুরোপুরি কাটেনি। কিন্তু ভেন্যুগুলোতে শুরু হয়ে গেছে আসল লড়াই। কোথাও দর্শকদের হাতে জাপানের পতাকা, কোথাও স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে সাংবাদিকদের ব্যস্ততা। পদকের হিসাব নিয়ে তখন থেকেই শুরু হয়েছে ছোটাছুটি।
গেমসের প্রথম স্বর্ণের গল্পটা অবশ্য লিখেছে জাপান। গামাগোরিতে পুরুষদের ব্যক্তিগত ট্রায়াথলনে স্বর্ণ জিতেছেন স্বাগতিক তাকুমি হোজো। ৭৫০ মিটার সাঁতার, ২০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ৫ কিলোমিটার দৌড় মিলিয়ে ৫২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে রেস শেষ করেন ৩০ বছর বয়সি এই জাপানি।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াইটা ছিল জমজমাট। বিশেষ করে পাঁচ কিলোমিটার দৌড়ে হোজোর সঙ্গে প্রায় সমানে সমান ছিলেন চীনের ঝাং শিরুই। শেষ পর্যন্ত ৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে সোনা জিতে নেন হোজো। ঝাং পান রুপা। কাজাখস্তানের ২০ বছর বয়সি আরলান ঝানাবাই জিতেছেন ব্রোঞ্জ।
সোনাটা হোজোর কাছে তাই একটু আলাদা। ঘরের মাঠে এশিয়ান গেমসের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের আনন্দ তো আছেই। সঙ্গে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। গত বছর এই গামাগোরি কোর্সেই এশিয়ান গেমসের টেস্ট ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন হোজো। পরিচিত পথেই এবারও গলায় তার স্বর্ণপদকের মালা।
উদ্বোধনের পরদিন থেকে শুরু হয়ে গেছে চীনের পদক সংগ্রহ। এশিয়ান গেমসে চীনের শ্রেষ্ঠত্ব নতুন কোনো গল্প নয়। ১৯৮২ সাল থেকে পদক তালিকায় তাদের আধিপত্য চলে আসছে। হাংজু এশিয়ান গেমসেও শীর্ষে ছিল চীন। নাগোয়াতেও প্রথম দিনেই সেই শক্তির জানান দিয়েছে তারা।
গতকাল একদিনেই চীন জিতেছে ১১টি স্বর্ণপদক। সঙ্গে ছয়টি রুপা ও তিনটি ব্রোঞ্জ। সব মিলিয়ে তাদের পদক ২০টি। পদকের লড়াইয়ের প্রথম দিন শেষে তালিকার শীর্ষে চীন।
স্বাগতিক জাপানও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ছয়টি স্বর্ণ, ছয়টি রুপা এবং সাতটি ব্রোঞ্জ নিয়ে তাদের মোট পদক ১৯টি। মোট পদকের হিসাবে দুদলের ব্যবধান মাত্র একটি। দক্ষিণ কোরিয়া, কাজাখস্তান ও থাইল্যান্ড তিনটি করে সোনা জিতে দিনের হিসাব শেষ করেছে।
মেয়েদের ট্রায়াথলনেও অবশ্য চীনের দাপট দেখা গেছে। ৫৭ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে সোনা জিতেছেন লিন শিনইউ। চীনের হুয়াং আনছি পেয়েছেন রুপা। জাপানের মানামি হায়াশি জিতেছেন ব্রোঞ্জ।
পদকের এই উৎসবের মাঝেই বাংলাদেশের দিনটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। নাগোয়ার এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে খবর নেওয়ার সময় বারবারই এসেছে একই প্রশ্ন—আজ কি বাংলাদেশের কোনো সুখবর আছে? দিন শেষে উত্তরটা ছিল না।
আটটি খেলায় মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। কোনো ইভেন্ট থেকেই আসেনি জয়। প্রায় সব জায়গায় বড় ব্যবধানে হার, কোথাও প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমানে লড়াই করার সুযোগটুকুও মেলেনি।
নারী ক্রিকেটে ভারতের কাছে হেরে সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। ফলে সোনা রুপার সম্ভাবনা শেষ। যে দলটি স্বর্ণপদকের স্বপ্ন নিয়ে জাপানে এসেছিল, তাদের জন্য দিনটি তাই হয়ে থাকল বড় ধাক্কার।
নারী হকিতে পরিস্থিতি ছিল আরো কঠিন। শক্তিশালী চীনের কাছে বাংলাদেশ হেরেছে ১৩-০ গোলে। ম্যাচের শুরু থেকেই চীনের আক্রমণের সামনে চাপের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ। গোলের পর গোল এসেছে, আর শেষ বাঁশির সঙ্গে বড় হয়েছে হতাশার ব্যবধান।
শুটিংয়েও কাটেনি সেই অন্ধকার। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের একক ইভেন্টে বাছাইপর্বই পেরোতে পারেননি বাংলাদেশের প্রতিযোগী। বিচ ভলিবলেও আসেনি সাফল্য। নারী দল হেরেছে ফিলিপাইনের কাছে, পুরুষ দল হেরেছে জাপানের কাছে।
টেবিল টেনিসেও একই ছবি। নারী দল হেরেছে চাইনিজ তাইপের কাছে। পুরুষ দল হেরেছে কাজাখস্তান ও লাওসের কাছে। কয়েকটি ম্যাচে ব্যবধান এতটাই বড় ছিল যে, লড়াইয়ের উত্তাপও তৈরি হয়নি। ১১-১, ১১-৩ গেমে হারের হিসাবটাই জানাচ্ছে এসব প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
সাঁতার, কারাতে ও সাইক্লিংয়েও বাংলাদেশের জন্য আসেনি স্বস্তির খবর। ফলে দিন শেষে বাংলাদেশের হিসাবটা দাঁড়াল—আটটি খেলা, আটটিতেই হতাশা।
এশিয়ান গেমসের এদিনের ছবিটা ঠিক এমন—জাপানের পতাকা নিয়ে উৎসব, আর চীনের পদকের হিসাব। গামাগোরিতে হোজোর সোনার হাসি, আর আট ভেন্যুতে খেলতে নামা বাংলাদেশের সব শিবিরে নীরবতা।
তবে এশিয়ান গেমসের গল্প একদিনে শেষ হয় না। প্রথম দিনের পদক দিয়ে শেষ দিনের হিসাবও লেখা যায় না। সামনে আরো অনেক ইভেন্ট, আরো অনেক লড়াই। নাগোয়ার মাঠে তাই নতুন সকাল অপেক্ষা করছে নতুন গল্পের জন্য।
বাংলাদেশও সেই গল্পে খুঁজবে নিজের জন্য গল্প। আনন্দের গল্প!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


