আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পিৎজার চুলা থেকে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে

আরিফুল হক বিজয়

পিৎজার চুলা থেকে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে

মধ্য ইতালির প্রশাসনিক অঞ্চল তুসকানির শহর লুকা। সেখানের ছোট্ট এক পিৎজার দোকানে দক্ষ হাতে রোজ ময়দার লেচি শূন্যে ছুড়ে দেন এক তরুণ। স্বপ্ন বুনেন—একদিন আকাশ ছোঁয়ার। দিন পেরিয়ে রাত আসে, রাতের পরিক্রমায় দিন; কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না ক্রিশান কালুগামাগের স্বপ্নের পরিধি। দিনে পিৎজার লেচি ছুড়ে দেওয়া কালুগামাগে, রাতে হয়ে ওঠেন জাদুকর; লেগ স্পিনের জাদুকর! রোমের অ্যাস্ট্রোটার্ফে ছড়িয়ে দেন লেগস্পিনের জাদু। দিনের আলোয় তিনি পিৎজা প্রস্তুতকারক, রাত নামলেই ক্রিকেটের সাধক। জীবন যেন দুই অর্ধে বিভক্ত—একটিতে রুটি-রুজি, অন্যটিতে রক্তে মিশে থাকা স্বপ্ন।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইতালির নীল জার্সি গায়ে যখন তিনি দাঁড়ান, তখন সেটি ছিল শুধু একটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নয়; ছিল এক দীর্ঘ অভিবাসী জীবনের স্বীকৃতি। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন তিনি বুকে বয়ে বেড়িয়েছেন বহু বছর। যোগ্যতা অর্জনের দিন তিনি কেঁদেছিলেন—আবেগে, গর্বে, আর এক অদ্ভুত প্রত্যাবর্তনের অনুভবে। এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক উপমহাদেশের দেশ শ্রীলঙ্কাতেই যে কালুগামাগের শৈশব জড়ানো মায়া। নেগোম্বোর রোদঝলমলে বিকেলে দাদুর পাশে বসে রেডিওতে ক্রিকেট শুনে বড় হয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

২০০৭ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজের সন্ধানে ইতালিতে পাড়ি জমান কালুগামাগে। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি—সবকিছুর ভিড়ে হারিয়ে গেল শৈশবের ব্যাট-বল। স্কুলের অনূর্ধ্ব-১৩ ও ১৫ দলে খেলা ছেলেটি হঠাৎই পথহারা। ইতালিতে তখন ক্রিকেটের কোনো সুস্পষ্ট রাস্তা ছিল না। তবু স্বপ্নের আগুন নিভে যায়নি। টেনিস বলের ক্রিকেট দিয়ে শুরু, পরে লুকার ছোট ক্লাব হয়ে স্বপ্নের পথে পা বাড়ানো শুরু এই তরুণের।

২০১৫-১৬ মৌসুমে রোমা ক্রিকেট ক্লাবে সুযোগ পেয়ে শুরু। এরপর সেখানেই এক দশকের বন্ধন। মাঝপথে উচ্চতার কারণে মনের কোনে উঁকি দিচ্ছিল পেসার হওয়ার স্বপ্ন। ল ইতালি ‘এ’ দলে খেলেছেন পেসার হিসেবে, এমনকি শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি কাস্টমস ক্লাবেও গতিময় জীবনই পছন্দ ছিল। কিন্তু চোট-আঘাত তাকে ফিরিয়ে আনে নিজের আসল পরিচয়ে—লেগস্পিনে। রোমা ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রভাত একনেলিগোডা বিশ্বাস করতেন, স্পিনই কালুগামাগের নিয়তি। ২০২১ সালে আবার স্পিনে ফেরার পর যেন নতুন জীবন পান কালুগামাগে।

শেন ওয়ার্ন, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, রশিদ খান—প্রেরণার নামগুলো তার ঘরে টাঙানো পোস্টারের মতো। বিশ্বকাপের আগে এক মাস কলম্বোয় নেট বোলার হিসেবে কাটিয়েছেন; হাসারাঙ্গার সঙ্গে কথা বলেছেন, রশিদের কাছ থেকে শিখেছেন গুগলি। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ইতালির ঐতিহাসিক টি-টোয়েন্টি জয়ে তিন উইকেট নিয়ে জানান দিয়েছেন—নীল জার্সির ভেতরেও আগুন জ্বলে। এরপর নেপালের বিপক্ষেও দলের ঐতিহাসিক হয়ে ফের তিন উইকেট; এ যেন স্বপ্নের মতো যাত্রা।

তবু জীবন শুধুই ক্রিকেট নয়। জীবনকে আগুনের লালচে ছোঁয়ায় রাঙিয়েছেন এই লেগি। সোমবার থেকে শনিবার—লা ভিটা পিজ্জারিয়ায় কাজ। রোববার ভোরে রোমে ট্রেনিং, রাতে ফিরে আবার কর্মব্যস্ততা। মাঝখানে জিম, দৌড়, ফিটনেসের সাধনা। বহু চাকরি ছেড়েছেন শুধু ছুটি না পাওয়ার কারণে। ক্রিকেট তাকে সংজ্ঞা দেয়, কিন্তু পেটের দায় তাকে মাটিতে রাখে। স্বপ্ন তার কল্পনার ভাসে, ভ্রম কাটতেই জীবনের বাস্তবতা হাসে।

ইতালিতে খেলাধুলার কথা উঠলেই ফুটবল সামনে আসে। তবু ইতালির সাবেক তারকা ভিয়েরি, পিরলোর শুভেচ্ছা কিংবা জেনোয়া ক্লাবের বার্তা—সবই বাড়িয়ে দেয় প্রেরণা। ইন্টার মিলানের সমর্থক কালুগামাগে স্বপ্ন দেখেন, বিশ্বকাপে উইকেট পেলে লাউতারো মার্টিনেজের বিখ্যাত উদযাপন করবেন। ৩৪ বছর বয়সি এই লেগস্পিনারের কাছে বিশ্বকাপে ফেরা মানে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—একটি প্রজন্মের জন্য দরজা খুলে দেওয়া। তিনি চান ভবিষ্যতের ইতালিয়ান ক্রিকেটাররা যেন তার মতো বাধার পাহাড় টপকাতে না হয়। একদিন কোচ হয়ে পাশে থাকতে চান খেলাটির।

পিৎজার চুলার আগুন আর ক্রিকেটের স্পিন—দুটিই ঘূর্ণায়মান। একটিতে জীবিকা, অন্যটিতে জীবন। আর ক্রিশান কালুগামাগে প্রমাণ করে চলেছেন, স্বপ্ন যদি সত্যিই নিজের হয়, তবে তা একদিন না একদিন বিশ্বমঞ্চের আলোয় ঠিকই জ্বলে ওঠে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন