বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর এখন একটাই প্রশ্ন সামনে আসছে, রাউন্ড অব সিক্সটিনে কী আটকে যাবে আর্জেন্টিনাও? এই প্রশ্ন জোরালো করল শেষ বত্রিশের ম্যাচে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স। ছোট্ট একটি দ্বীপদেশের নতুন দল আর্জেন্টাইনদের চেহারা মলিন করে দিয়েছিল। ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস পরীক্ষা দিয়েই কেপ ভার্দের বিপক্ষে জিততে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচটিতে ১১১ মিনিটে কেপ ভার্দের আত্মঘাতী গোলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন লিওনেল মেসিরা। এই ম্যাচে মুদ্রার উল্টো পিঠটাই যেন দেখল টানা দুবারের বিশ্বকাপ জেতার মিশনে নামা আর্জেন্টিনা। যে ঘরনার ফুটবল খেলেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা, তাতে ব্রাজিলের বিদায়ের পর শঙ্কার কালো মেঘ উদয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে রাউন্ড অব সিক্সটিনে ব্রাজিলের তুলনায় আর্জেন্টিনার ম্যাচ সহজ হবে। সহজ ম্যাচ হওয়ার পেছনে নানা কারণও রয়েছে। প্রথমত, এই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের বিপক্ষে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন ম্যাচটাই খেলে ফেললেন মেসি, মার্টিনেজরা। দুনিয়া কাঁপিয়ে গেল ৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে। তাদের গোলরক্ষক ভোজিনহা যেন চীনের মহাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন! আর কেপ ভার্দের রক্ষণভাগও ছিল বিশ্বসেরা। নতুন দল হিসেবে তাদের রক্ষণভাগ যে নৈপুণ্য দেখাল টুর্নামেন্টে, সেটি অভিজ্ঞ দলের তুলনায় অনন্য। বড় চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। মৃত্যুর দুয়ার থেকে উঠে আসার মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে যে ম্যাচ জিতে এসেছে কোচ লিওনেল স্কালোনির দল, তাতে রাউন্ড অব সিক্সটিনে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচটি আর অতটা কঠিন হওয়ার কথা নয়।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১০টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্চ স্টেডিয়ামেই এই প্রথম বিশ্বকাপের রাউন্ড সিক্সটিনের ম্যাচ খেলতে নামবে মিশর। আগে কখনো গ্রুপ পর্বই উতরাতে পারেনি মোহাম্মদ সালাহর দল। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই মিশরের জন্য প্রথম অভিজ্ঞতা হলেও বড় ম্যাচের ‘গ্রান্ডমাস্টার’ আর্জেন্টিনা। কীভাবে প্রচণ্ড স্নায়ুচাপ সামলে দৃঢ় মানসিকতায় নকআউটের ম্যাচ জিততে হয়, সেটি বেশ ভালো করেই জানা তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। তাছাড়া ভিনগ্রহের ফুটবলার খ্যাত লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা দলের হয়ে সেরা ছন্দে আছেন। প্রতি ম্যাচে মেসি একাই পার্থক্য গড়ে দিচ্ছেন। মেসি যে মিশরের জন্য বড় আতঙ্কের নাম, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ফুটবল মহাতারকা ছাড়াও দুর্দান্ত দলীয় পারফরম্যান্স আর জয়ের মানসিকতা—সব মিলে মিশরের বিপক্ষে পরিষ্কার ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা।
মিশর ম্যাচেও আর্জেন্টিনার পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন মেসিই। গত ম্যাচগুলো জানাচ্ছে, আক্রমণভাগের কৌশল মেসিকে ঘিরেই সাজাবেন কোচ স্কালোনি। বক্সের আশপাশে বল পেলে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন মেসি, সেটির প্রমাণ মিলে সর্বশেষ কেপ ভার্দের ম্যাচে। অল্প জায়গা পেয়েও অসাধারণ দক্ষতা দেখানোর ক্ষেত্রে জুড়ি নেই এই মহাতারকার। মেসির সঙ্গে অ্যালিস্টারও প্রতিপক্ষে রক্ষণে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পারেন। গত ম্যাচে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ কেপ ভার্দের রক্ষণে বারবার আটকে গেলেও মিশরের বিপক্ষে স্বরূপেই ফিরতে পারে। অবশ্য মিডফিল্ডেও আর্জেন্টিনাকে আরো নৈপুণ্য দেখাতে হবে। বিশেষ করে গত ম্যাচে আর্জেন্টিনার রক্ষণ নাড়িয়ে দিয়েছিলেন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়েরা। সেখানে যদি দক্ষতা না দেখাতে পারে আর্জেন্টিনা, তাহলে কড়া মাশুল দিতে হতে পারে। মিশর ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা দলে ফাকুন্দো মেদিনার খেলা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। প্রথম একাদশে যদি না থাকেন মেদিনা, তাহলে তালিয়াফিকো জায়গা পেতে পারেন। অবশ্য এনজো ফার্নান্দেজ ক্র্যাম্পের সমস্যা থাকলেও খেলার জন্য ফিট আছেন। তবে গোড়ালিতে চোট পাওয়ায় গনজালেজের খেলা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ৪-৩-৩ ফরমেশনে একাদশ সাজাতে পারেন আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি।।
এদিকে, মিশরের প্রাণ মোহাম্মদ সালাহ। এই বিশ্বকাপে দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি তৈরি করেছেন এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড। তাকে ঘিরেই কৌশল আঁটছে মিশরও। তাতে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে মেসি-সালাহ দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যতটা সম্ভব রক্ষণ ধরে রেখে পাল্টা আক্রমণে যাওয়াটাই হবে তাদের টার্গেট। রক্ষণভাগের পেছনে থাকা ফাঁকা জায়গা আর্জেন্টিনার জন্য ভয়ের কারণ হতে পারে। কেননা, বর্তমানে সালাহ ও ওমর মারমুশ পাল্টা আক্রমণের ক্ষেত্রে ত্রাস সৃষ্টিকারী ফুটবলার। আর্জেন্টিনার রক্ষণে ফাঁকফোকর পেলে তারা গোল পাবেন। নিঃসন্দেহে রক্ষণাত্মক খেলবে মিশর। আর্জেন্টিনাকে পুরো ৯০ মিনিট আটকে রাখতে হলে অসীম ধৈর্য ধরতে হবে তাদের। তবে দুই দলের জন্য বড় দুশ্চিন্তা হলো খেলোয়াড়দের শারীরিক ক্লান্তি। শেষ বত্রিশের ম্যাচে পুরো ১২০ মিনিট লড়াই করতে হয়েছে আর্জেন্টিনা ও মিশরকে। তাই সফল হতে হলে শারীরিক ধকল কাটানোর চ্যালেঞ্জও জিততে হবে তাদের। এ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ও মিশর মাত্র একটি ম্যাচে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে। ২০০৮ সালের ওই প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে হারায় মিশরকে। এবার জয়ের সংখ্যাটা বাড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে চায় আর্জেন্টিনা। তাদের সামনে মিশর কতটা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

