জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা সরকারি ত্রাণসামগ্রীর প্যাকেটে মেয়াদোত্তীর্ণ ও মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকা খাদ্যপণ্য পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ত্রাণের প্যাকেটের গায়ে ‘অর্থবছর ২০২৪-২০২৫’ উল্লেখ থাকলেও এসব পণ্যের অনেকগুলো দীর্ঘদিনের পুরোনো বলে অভিযোগ করেছেন ত্রাণ পাওয়া মানুষজন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি সরকারি ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ ও ৬ সেপ্টেম্বর মেলান্দহ উপজেলা পরিষদ কার্যালয় থেকে ৯০ জন অসহায় মানুষের মধ্যে এসব ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
প্রতিটি প্যাকেটে ১০ কেজি চালের সঙ্গে এক কেজি করে তেল, লবণ, চিনি ও ডাল, ২০০ গ্রাম হলুদের গুঁড়া এবং ১০০ গ্রাম করে ধনিয়া ও মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয়। প্যাকেটের গায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের নাম ও ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের উল্লেখ রয়েছে।
তবে ত্রাণ পাওয়ার পর বাড়িতে গিয়ে প্যাকেট খুলে অনেকেই দেখতে পান, কিছু পণ্যের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আবার কিছু পণ্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার বাকি ছিল মাত্র কয়েক দিন।
গত ২ সেপ্টেম্বর মেলান্দহ পৌরসভার হাসনা বেগম ত্রাণের একটি প্যাকেট পান। তার দেওয়া তথ্য ও পণ্যের প্যাকেটে থাকা মেয়াদের তারিখ অনুযায়ী, ব্যাগে থাকা লবণের মেয়াদ ৩১ আগস্ট শেষ হয়েছে—অর্থাৎ বিতরণের দুই দিন আগেই। একই ব্যাগে থাকা তেলের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ১৬ সেপ্টেম্বর।
একই দিনে ত্রাণ পাওয়া লিটন ও বারেকের প্যাকেটেও একই ধরনের পণ্য পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, গত ৬ সেপ্টেম্বর মলিকাডাঙ্গা এলাকার রত্না বেগম ও জোসনা বেগম এবং হাজরাবাড়ি এলাকার হুরমুজ যে ত্রাণের প্যাকেট পেয়েছেন, সেগুলোরও বেশির ভাগ খাদ্যপণ্যের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অথবা অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ত্রাণ পাওয়া কয়েকজন জানান, ব্যাগের ভেতরে থাকা মসলা, চিনি ও লবণ পুরোনো হয়ে জমাট বেঁধে আছে। কোনো কোনো প্যাকেট ছেঁড়াও রয়েছে।
হাসনা বেগম বলেন, ‘আমরা মূর্খ মানুষ, মেয়াদ তো দেখতে পারি না। যেভাবে দিয়েছে, সেভাবেই বাড়িতে এনে রেখেছি। লবণের মেয়াদ যে শেষ হয়ে গেছে, তা জানতাম না। কিছুদিনের মধ্যে অন্য পণ্যের মেয়াদও শেষ হয়ে গেলে সেগুলো খেয়ে শেষ করা যাবে না।’
রত্না বেগম বলেন, ‘আমার ব্যাগে লবণ জমাট বাঁধা ছিল। চিনি-ডালের প্যাকেটও হালকা ছেঁড়া ছিল। মেয়াদ না থাকলে তো খাওয়া যাবে না। এত আগের জিনিস এত দিন পরে দিলে মেয়াদ তো শেষই হবে।’
জোসনা বেগমও তাঁর প্যাকেটে থাকা পুরোনো মসলা ও চিনি দলা হয়ে থাকার কথা জানান।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম। তিনি বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ত্রাণসামগ্রী মানুষের হাতে তুলে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। এসব পণ্য কোথায় এবং কত দিন সংরক্ষণ করা হয়েছিল, তা সুষ্ঠু তদন্ত করে দেখা উচিত।’
এ বিষয়ে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিন্নাতুল আরা বলেন, ‘জুলাই মাসের প্রথম দিকে ত্রাণের বিষয়ে একটি চিঠি পেয়েছিলাম। এর কিছুদিন পরই ত্রাণসামগ্রী আসে। পরে অসহায় মানুষের তালিকা করে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।’
জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহেল কাফি বলেন, ‘জুন ও জুলাই মাসে মন্ত্রণালয় থেকে ত্রাণ পাওয়ার পর তা উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কীভাবে বিতরণ করা হয়েছে, তা আমি জানি না। মেলান্দহের পিআইও বর্তমানে প্রশিক্ষণে রয়েছেন। তার কাছ থেকে জেনে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’
সরকারি ত্রাণসামগ্রী অসহায় মানুষের জন্য সহায়তার উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকা খাদ্যপণ্য বিতরণের ঘটনায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এসব পণ্য কখন কেনা হয়েছে, কোথায় কত দিন সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং বিতরণের আগে পণ্যের মেয়াদ যাচাই করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

