এই স্মৃতিকে ধরে রাখুন বুকের খুব কাছে…

এই স্মৃতিকে ধরে রাখুন বুকের খুব কাছে…

২৬ বছর আগে ঢাকা স্টেডিয়ামে টস হতে দেখেছিল যে ছেলেটি, আজ সে পূর্ণবয়স্ক। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের কত উত্থান, কত পতন, কত স্বপ্নভঙ্গ আর কত আনন্দের সাক্ষী হতে হয়েছে তাকে! ক্রিকেটের সঙ্গে তিন দশক ধরে যারা আবেগ নিয়ে পথ চলেছেন, তারা জানেন প্রজন্ম বদলাতে কখনো কখনো ২০ থেকে ৩০ বছরই যথেষ্ট। আর সেই এক প্রজন্ম পেরিয়ে এসে ডারউইনে বাংলাদেশ গতকাল আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে এমন এক স্মৃতি, যা একজন বাংলাদেশি সমর্থক গর্ব করে বুকের খুব কাছে ধরে রাখতে পারেন।

একটা প্রজন্ম চলে গেছে। অথচ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশকে একটি টেস্ট খেলার সুযোগ দিতে অস্ট্রেলিয়ার যেন কোনো তাগিদই ছিল না। তাড়া তো নয়ই! ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো ‘বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক’। এ শব্দটাই যেন ধীরে ধীরে ক্রিকেটের স্বপ্নকে ছোট করে দিচ্ছে; পৃথিবীর কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর স্বপ্নকে আটকে দিচ্ছে। অথচ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই তো ছিল ‘খেলাটা সবার’। আমার-আপনার, আপামরের।

বিজ্ঞাপন

ডারউইনে আসার আগে প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশ যখন মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হলো, তখন চারদিকে যে আলোচনাÑ সেটি খুব আশাবাদী ছিল না। সবাই প্রায় ধরে নিয়েছিল, টেস্টটি অন্তত তৃতীয় দিন পর্যন্ত গড়াক। তাহলেই দর্শক হয়তো টিকিটের কিছুটা মূল্য উসুল করতে পারবেন!

ক্রিকেটে আমরা প্রায়ই তুলনা করি। মানদণ্ড ঠিক করি। বাংলাদেশকেও এবার তুলনা করা হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর আগে খেলা সে দলের সঙ্গে। অথচ সে দলের কোনো ক্রিকেটারই এখন আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেন না।

এখানেই একটি প্রশ্ন উঠে আসে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের শুরুর দিনগুলোতে কি তাদের আরো বেশি বিদেশ সফরের প্রয়োজন ছিল, যাতে বড় মঞ্চে নিজেদের জায়গাটা পাকাপোক্ত করতে পারে? নাকি এটি বড় দলগুলোর নিজেদের তৈরি করা একটি অজুহাত? বিশ্বক্রিকেটের তথাকথিত ‘বিগ থ্রি’ ছাড়া অন্য দলগুলোর প্রতি যেন তাদের কোনো দায় নেই!

অবহেলাটা কিন্তু বাস্তব। টেস্ট চলাকালে ধারাভাষ্যকারদের কথা শুনলেই তা বোঝা গেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা বারবার প্রকাশ পেয়েছে। শ্রীলঙ্কার রোশান আবেসিংহেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন। নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, অস্ট্রেলিয়া একজন বাংলাদেশি ধারাভাষ্যকারকেও আমন্ত্রণ জানানোর সৌজন্য দেখায়নি। ধারাভাষ্যের ধরনেও প্রতিপক্ষের প্রতি খুব একটা সম্মান ফুটে ওঠেনি।

সিরিজ শুরুর আগে বাতাসে যেন একটা ধারণাই ভাসছিলÑবাংলাদেশ কেউ নয়। ঠিক যেমন মাইকেল ভন বলেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেছে ‘কেউ নয়’Ñএমন দলগুলোর বিপক্ষে খেলে। সেই ‘কেউ নয়’ দলের একটি ছিল বাংলাদেশ।

বিশ্বক্রিকেটের বড় নামগুলো অনেক সময় এভাবেই ছোট দলকে ছোট করে কথা বলে পার পেয়ে যায়। কারণ, তাদের জ্ঞানকে প্রশ্ন করার মতো লোক খুব বেশি নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের গল্পটা এখন অন্যরকম। একটু পেছনে তাকালেই তার প্রমাণ মিলবে।

২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডের ঘরের মাঠে ১৭ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রা থামিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ১৪ চেষ্টার পর প্রথমবার সিরিজ জিতেছিল। সেই ধারা কিন্তু থামেনি। ঘরের মাঠেও পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দুই সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা বিশ্বক্রিকেটের মাত্র দ্বিতীয় দল হয়েছে বাংলাদেশ।

এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ১৫ বছর পর বাংলাদেশের টেস্ট জয়। আর গত এক দশকে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ হারিয়েছে দুবার। অস্ট্রেলিয়া জিতেছে মাত্র একবার।

তাহলে এই বদলে যাওয়ার রহস্যটা কোথায়? প্রথম উত্তরÑবাংলাদেশের পেস বোলিং।

টেস্ট ম্যাচ জেতায় পেসাররা। দলের প্রধান পেসার চোটে বাইরে; তারপরও যদি হাসান মাহমুদের মতো একজন বোলার উঠে এসে এক টেস্টে ৯ উইকেট নিতে পারেন, তাহলে বুঝতে হবে দলটি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বক্রিকেটের সফল দলগুলো ঠিক এমন গভীরতাই চায়।

দ্বিতীয় উত্তর হলো দল হয়ে ওঠা।

নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সত্যিই একটি দল। এখানে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। ‘ওয়ান টিম’ কথাটি যেন মাঠে বাস্তব হয়ে উঠেছে। শান্তর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় গুণ সম্ভবত তার সহজাত বোধ। খেলা যখনই মনে হয়েছে অস্ট্রেলিয়া একটু একটু করে ফিরে আসছে, শান্ত তখনই এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। ফিল্ডিং বদলেছেন, বোলার এনেছেন, পরিকল্পনা পাল্টেছেন। তারপরই কিছু একটা ঘটেছে।

এই ক্ষমতা বই পড়ে শেখা যায় না। এর কিছুটা জন্মগতও।

শান্তর পরিকল্পনা, তার ক্রিকেটবোধ, তার ভবিষ্যৎ ভাবনাগুলো আরো বেশি করে শোনা দরকার। কারণ, শান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট ব্যবস্থা তৈরিরই একজন ক্রিকেটার। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে তিনি বড় মঞ্চে এসেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটা খুব মসৃণ ছিল না। কিন্তু নির্বাচকদের আস্থা আর তার নিজের পরিশ্রম এখন ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিচ্ছে।

আমরা শুধু আশা করতে পারি, আগামী বহু বছর শান্ত বাংলাদেশকে আরো অনেক সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবেন।

ডারউইনের জয় তাই শুধু একটি টেস্ট জয় নয়; এই জয় বিশ্বক্রিকেটকে একটি তাৎক্ষণিক ঝাঁকুনি দিয়েছে।

বাংলাদেশ যেন দরজায় কড়া নেড়ে বলেছেÑতোমরা যদি দুই স্তরের ক্রিকেট চাও, ঠিক আছে। আমরা আছি। আমরা খেলব। আমরা লড়ব। আমরা প্রচলিত নিয়মকেও চ্যালেঞ্জ করব। তবে বড় দলগুলো যখন সীমারেখার নিচে নেমে যাবে, তখন নিয়ম যেন তাদের জন্য আলাদা না হয়।

অনেকে ডারউইনের এ জয়কে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন বলে অভিহিত করছেন। আমি বরং এই ‘অঘটন’ শব্দটা ব্যবহার করার বিরোধিতা করব।

টেস্ট ক্রিকেটে অঘটন বলে কিছু নেই।

পাঁচদিনের ক্রিকেটে আপনি হঠাৎ করে জিতে যেতে পারেন না। এখানে জয় আসে ধৈর্য থেকে, লড়াই থেকে, অধ্যবসায় থেকে, চরিত্র থেকে। পাঁচদিন ধরে প্রতিটি বলের সঙ্গে লড়াই করে তারপর জয়কে নিজের করে নিতে হয়। সে কারণেই টেস্ট ক্রিকেট স্পেশাল কিছু।

বাংলাদেশ সেই পাঁচদিনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে কিন্তু নিজেদের যোগ্যতায়। তাই এই স্তরে বাংলাদেশের থাকার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ নেই।

বরং এখন প্রশ্নটা অন্য।

এবার কোথায়?

উত্তরটা খুব সহজ। ফোকাস দ্রুত চলে যাবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে, ম্যাকের দিকে। পরিকল্পনাও খুব জটিল হওয়ার দরকার নেই। যে ক্রিকেটটা খেলেছে, সেটাই খেলতে হবে। মৌলিক ক্রিকেটে ফিরে থাকতে হবে। শেষ বল পর্যন্ত দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবে। ডারউইনের আত্মবিশ্বাসটাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

কোনো বাড়তি কিছু নয়। ক্রিকেটটাকে সহজ রাখতে হবে; বাস্তব থাকতে হবে। আর আপনি যদি বাংলাদেশের সেই সমর্থক হন, যে দলের জয়-পরাজয় বুকের ভেতর অনুভব করেন, তাহলে এই আনন্দটুকু উপভোগ করুন।

চোখের কোণে জল এলে জল আসতে দিন। কারণ, আমরা অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি।

যে ছেলেটি ২৬ বছর আগে ঢাকা স্টেডিয়ামে টস হতে দেখেছিল, সে আজ ডারউইনে বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক অধ্যায়ের সাক্ষী। মাঝখানের এই দীর্ঘ সময়ে কতবার মনে হয়েছে, বাংলাদেশ বুঝি আর পারবে না। কতবার হতাশ হয়েছি। কতবার আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখেছি।

আজ সেই স্বপ্নের এক দিন। কেউ যেন এ গর্বটা আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিতে না পারে।

এ মুহূর্তটাকে অনুভব করুন। বাঁচুন। মনে রাখুন আর আশাটা বাঁচিয়ে রাখুন। কারণ, বিশ্বাস কখনো কখনো অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেয়। আমরা যদি বিশ্বাস করি, সবুজ জার্সির ছেলেরাও বিশ্বাস করবে। আর তারা লড়বে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দীর্ঘজীবী হোক।

লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন