অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বিজয়গাথা

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বিজয়গাথা

ডারউইনের রোদ সেদিন যেন অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি ঝাঁঝালো ছিল। নীল-সাদা ঢেউয়ের মেঘে আকাশের নিচে মারারা ওভাল ঝলসে উঠছিল। গ্যালারিতে অল্প কিছু লাল-সবুজ পতাকা। বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার পরিচিত হলুদ-সবুজ আবহ।

তবে মাঠে এই রোদের চেয়েও তীব্র ছিল অন্য কিছু। যার নাম বাংলাদেশের প্রত্যয়। যার নাম ম্যাচ জয়ের প্রতিজ্ঞা ও সাহস। শেষ পর্যন্ত সেই সাহসের জয় হলো। মুমিনুল হকের বাউন্ডারির বল ছুটে গেল সীমানার দিকে। এই বাউন্ডারিতে লেখা হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। তাও আবার ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে।

বিজ্ঞাপন

এই জয় ঘুচিয়ে দিয়েছে ২৩ বছরের অপেক্ষার এক অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তৃতীয়বার টেস্ট খেলতে নেমে প্রথমবার জয়ের দেখা পেল বাংলাদেশ। আর সেই জয় এল এমন এক দলের বিপক্ষে, যাদের ঘরের মাঠে হারানো মানেই শুধু ক্রিকেটীয় কৃতিত্ব নয়, নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে নতুন করে বিশ্বাস করার সুযোগ।

এদিন ডারউইনে বাংলাদেশের ক্রিকেট একটু বড় হয়ে গেল। কেউ হয়তো বলবেন, একটি টেস্ট জয়। পাঁচ দিনের ক্রিকেটে এমন ফল তো আসতেই পারে। কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাসে কিছু জয় থাকে, যেগুলোর গুরুত্ব স্কোরকার্ডের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

ডারউইনের জয় তেমনই। এই জয় শুধু একটি ম্যাচে জয় নয়। এ যেন আত্মবিশ্বাসের নতুন সূর্যোদয়, ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশের অমর এক স্বাক্ষর। পুরো ক্রিকেট বিশ্বের জন্য একটা বিবৃতি। একটা বার্তা। যেখানে গোটা হরফে লেখা-দেখ বিশ্ব, আমরাও পারি!

এই ম্যাচের স্কোরকার্ডের সংখ্যাগুলোই জানান দিচ্ছে লড়াইটা কতটা একপেশে ছিল। ১১ সেশন জুড়ে খেলা হওয়ার পুরো ১১ সেশনই জিতেছে বাংলাদেশ! কোনো একটা সেশনেও অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ফেরা তো দূরের কথা, ঠিকমতো লড়তেই পারেনি! ব্যাটে-বলে মানসিকতায়-মগজে-মননে, ক্যাপ্টেন্সি-কৌশলে সবকিছুতেই এই ম্যাচে বাংলাদেশের কাছে হারল তারা।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে যায় মোটে ১৯৮ রানে, স্টিভ স্মিথের ৭১ ছাড়া বলার মতো কিছুই ছিল না সেই ইনিংসে। ৬ উইকেট তুলে নিয়ে এই ইনিংসে বাংলাদেশের নায়ক হাসান মাহমুদ। নতুন বলের পেস, মাঝের সময়ের নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং পরে মিরাজের স্পিন, সব মিলিয়ে স্বাগতিকদের ইনিংস কখনোই স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে পারেনি।

তারপর এল বাংলাদেশের ব্যাটিং।

তানজিদ হাসান তামিম তখন টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুতেই বড় একটি প্রশ্নের সামনে। বিদেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের বিপক্ষে কী করতে পারেন তিনি? দুর্দান্ত ভঙ্গিতে এই ওপেনার উত্তর দিলেন ব্যাট দিয়ে।

হাঁকালেন প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। এটি এমন এক ইনিংস, যা শুধু রান দিয়ে মাপা যায় না। তার ব্যাটিংয়ে ছিল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, ছিল বল ছেড়ে দেওয়ার ধৈর্য, আবার সুযোগ পেলে আক্রমণে যাওয়ার সাহসও। নাজমুল হোসেন শান্ত যোগ করলেন ৮৪। অধিনায়কের ইনিংসটি ছিল দলের ভিত শক্ত করার মতো। তারপর মেহেদী হাসান মিরাজের স্কিলফুল ৬৫। বাংলাদেশ পৌঁছে গেল ৪২৬-এ। লিড বেশ স্বাস্থ্যবান হলো, ২২৮ রানের। জশ হ্যাজলউডের ৬ উইকেট অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে থাকল, কারণ ২২৮ রানের বিশাল লিড ততক্ষণে ম্যাচের রং বদলে দিয়েছে। দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের লড়াকু সেঞ্চুরি সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া থামে ২৮৪ রানে। তাতে ইনিংস হারের আশঙ্কা কাটল, কিন্তু ম্যাচ যে বাঁচাতে পারল না অস্ট্রেলিয়া। ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে বাংলাদেশের লাগল মাত্র ১৪.২ ওভার এবং ১ উইকেট হারিয়ে।

চতুর্থ দিনের সকালে অস্ট্রেলিয়া ৬৭ রানে পিছিয়ে, চার উইকেট হাতে। সেই সকালেই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটা নির্ধারণ করে দেন মিরাজ। ডট বলের চাপে রেখে অ্যালেক্স ক্যারিকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানিয়ে ভাঙেন প্রতিরোধ। এরপর এক অসাধারণ ডেলিভারিতে বো ওয়েবস্টারের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন, অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে ফেরান ভেতরের কানায় শর্ট লেগের ক্যাচে। বিরতির পর তাসকিন আহমেদ ফেরান মিচেল স্টার্ককে, আর ইনিংসের শেষ আঘাতটাও আসে মিরাজের হাত ধরেই-নাথান লায়ন এলবিডব্লিউ। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে মিরাজ পূর্ণ করেন তার ক্যারিয়ারের ১৫তম ফাইফার, বিদেশের মাটিতে যা তৃতীয়। ব্যাট হাতে হাফ সেঞ্চুরি আর বল হাতে পাঁচ উইকেটÑএই ডাবলেই মিরাজ হয়ে ওঠেন এই টেস্ট জয়ের অন্যতম কারিগর।

তবে পুরো ম্যাচে সবচেয়ে বেশি আলো কেড়েছেন পেসার হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে ৬-৫৫ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৬ রানে ৩ উইকেট-সবমিলিয়ে ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে তিনিই এই টেস্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। গ্রিনকে যেভাবে তিনি ফিরিয়েছেন, তাতেও ছিল দক্ষতার ছাপ-বল ভেতরে ঢুকে নিচু হয়ে ইনসাইড এজে ভাঙল তার স্টাম্প। অথচ গ্রিন তখন লড়ছিলেন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যাট করে, ঘরের মাটিতে প্রথম সেঞ্চুরি তুলে দলের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টায়। ম্যাচের আগে দলে জায়গা নিয়ে সমালোচনার মুখে থাকা গ্রিনের এই ১০৪ রানের ইনিংসই শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার হার ঠেকাতে পারেনি। শুধু পরাজয়ের সময়টা খানিক দীর্ঘ করেছে।

এই টেস্টে দুই দলের মধ্যে ফারাকটা তৈরি হয়েছিল কয়েকটি জায়গায়। প্রথমত, বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ-বিশেষ করে পেস আর স্পিনের মিশেল-পুরো ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে কখনোই স্বস্তিতে ব্যাট করতে দেয়নি। স্বাগতিকদের তারা প্রথমবার আটকে দিল ১৯৮ রানে। দ্বিতীয় দফায় তিনশর নিচে, টেস্টে টপ র‍্যাংকড দলের বিপক্ষে এটা মোটেও সহজ কীর্তি নয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ যেখানে সাধারণত বিদেশের মাটিতে ভঙ্গুর বলে সমালোচিত হয়, সেখানে তানজিদ-শান্ত-মিরাজের ইনিংসগুলো ছিল দারুণ দৃঢ় এবং স্কিলড। তৃতীয়ত, চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামর্থ্য-শেষ ইনিংসে তানজিদ শূন্য রানে ফিরলেও সাদমান ইসলাম ও মুমিনুলের অবিচলিত ব্যাটিং কোনো নাটকীয়তার সুযোগ দেয়নি। চতুর্থত, নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাপ্টেন্সির কৌশল। বোলিং এবং ফিল্ডিং বদল। কোন বোলারকে বাতাসের বিপরীতে এবং কাকে পক্ষে ব্যবহার করবেন-কন্ডিশন যাচাই করে তার সেই সব সিদ্ধান্ত ছিল একেবারে যাকে বলে মাস্টারস্ট্রোক।

২২৬ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা অস্ট্রেলিয়া গ্রিনের একক লড়াই ছাড়া বাকি ব্যাটিংয়ে তেমন কোনো জুটি গড়ে তুলতে পারেনি, এই ব্যর্থতাই তাদের বড় হারের প্রধান কারণ।

এই জয়ের মাহাত্ম্য আরো বেড়ে যায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রস্তুতির কথা মাথায় রাখলে। টেস্ট শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে বাংলাদেশ গুটিয়ে গিয়েছিল মাত্র ৫৪ রানে। দলের প্রধান পেসার নাহিদ রানা এই সিরিজে নেই। শরিফুল ইসলাম চোটের কারণে ছিলেন না এই ম্যাচে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বের শীর্ষ র‍্যাংকিংয়ের দলকে হারানো-তা-ও নয় উইকেটের বিশাল ব্যবধানে-এই সাফল্যকে আরো অসাধারণ করে তুলেছে।

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট উচ্ছ্বাস। তিনি বলেন, যেকোনো সংস্করণ মিলিয়ে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক প্যাট কামিন্স হার মেনে নেন খোলামনে। স্বীকার করেন, প্রতিটি বিভাগেই বাংলাদেশ তাদের ছাপিয়ে গেছে, ধৈর্য আর শৃঙ্খলায় এগিয়ে ছিল প্রতিপক্ষ। অস্ট্রেলিয়ান ধারাভাষ্যকার জিম ম্যাক্সওয়েল এই হারকে অজিদের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বিব্রতকর পরাজয় বলে রায় দিয়েছেন।

এই জয় কোথায় নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন এটিই। একটি টেস্ট জয়ের পর উচ্ছ্বাস স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই জয় থেকে বাংলাদেশ কী নিয়ে সামনে যাবে।

২২ আগস্ট ম্যাকাইয়ে শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট। সেখানে নতুন উইকেট। নতুন পরিস্থিতি। অস্ট্রেলিয়ার নতুন পরিকল্পনা। প্রথম ম্যাচের ভুল থেকে তারা শিক্ষা নেবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশের কাজ হবে এই জয়কে স্মৃতি বানিয়ে না রেখে আত্মবিশ্বাসে পরিণত করা। টেস্ট ক্রিকেটে এমন কায়দায় ম্যাচ জিতেই একটি দলের পরিচয় তৈরি হয় ।

ডারউইনের ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য নতুন ইতিহাস তৈরির দিন। এদিন বাংলাদেশ শুধু একটি টেস্ট জেতেনি, নিজের সামর্থ্যের একটি নতুন ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। ডারউইনের রৌদ্রোজ্জ্বল এই জয় অনেক অনেক দিন বাংলাদেশের ক্রিকেটে আলো ছড়াবে। এই জয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশের নামের পাশে লেখা হয়ে গেল একটি নতুন গর্বের একটা লাইন-অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ জিতেছে।

ক্রিকেট আনন্দের পাতায় খোদাই হয়ে রইল আরেকটি রূপকথা-বাংলাদেশের এক অবিশ্বাস্য এবং দাপুটে জয়ের গল্প, যার রেশ থাকবে বহুদিন।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের পাতা উল্টালেই সবাই একচোখা ভঙ্গিতে দেখিয়ে দিতেন ২৩ বছর পুরোনো জীর্ন একটা অধ্যায়। যেখানে লেখা ছিল আড়াই দিনে বাংলাদেশের দুটি টেস্ট ম্যাচ শেষ হওয়ার দুঃখজনক গল্প। সেই দুই টেস্টে লেখা রয়েছে ইনিংস হারের বেদনার ইতিহাস।

তবে দেরিতে হলেও ২৩ বছর পরে এসে সেই গল্প, সেই ইতিহাস এবার সত্যিকার অর্থেই বদলে দিল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লিখল নতুন গল্প। ক্রিকেট সাফল্যের গল্প। আনন্দের গল্প। গর্বের গল্প। জয়ের গল্প।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন