মাধ্যমিক শিক্ষাকে কীভাবে শ্রমবাজারমুখী করা যায়

মাধ্যমিক শিক্ষাকে কীভাবে শ্রমবাজারমুখী করা যায়

আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানোর জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা। শ্রমবাজারের চিন্তা সেখানে নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি জীবিকা ও কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি না নেওয়ায় আমাদের শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। এই অবস্থার পরিবর্তন চাইলে মাধ্যমিক শিক্ষাকে শ্রমবাজারমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী কাজের জগৎকে দেখবে, বুঝবে, ছোট ছোট বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করবে এবং নিজের সম্ভাবনা আবিষ্কার করবে। মাধ্যমিক শিক্ষায় শ্রমবাজারের ছায়া থাকতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষায় ‘শ্রমবাজারের ছায়া’ মানেÑবিদ্যালয় হবে শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের জায়গা; কিন্তু তার জানালা খুলে দেওয়া হবে শ্রমবাজারের দিকে। শিক্ষার্থী স্কুলে থাকতেই ভবিষ্যৎ কর্মজগতের পরিবেশ, কাজের ধরন, দক্ষতার চাহিদা, প্রযুক্তি ও পেশাগত সংস্কৃতির সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হবে, কিন্তু তাকে অল্প বয়সে কোনো নির্দিষ্ট পেশায় আটকে দেওয়া হবে না।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের কথা চিন্তা করা যায়। এর মধ্যে প্রথমেই হচ্ছে পাঠ্যক্রমে কর্মমুখী দক্ষতা যুক্ত করা। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি ব্যবহারিক দক্ষতা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারেÑযেমন : কম্পিউটার ও ডিজিটাল দক্ষতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটাসচেতনতা, যোগাযোগ ও ইংরেজি ভাষা, হিসাবরক্ষণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তা দক্ষতা, সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধান, কারিগরি এবং হাতে-কলমে কাজ ইত্যাদি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির মধ্যে প্রত্যেক শিক্ষার্থী অন্তত একটি বাজারযোগ্য দক্ষতায় প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। যেমন : গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ইলেকট্রনিকস, কৃষিপ্রযুক্তি, মোবাইল/কম্পিউটার রক্ষণাবেক্ষণ, পোশাক ও টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মৌলিক দক্ষতা, সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক কাজ, প্রভৃতি। তবে এর লক্ষ্য একজন শিশুকে অল্প বয়সে নির্দিষ্ট পেশায় আটকে দেওয়া নয়, বরং কর্মজগতের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করা।

প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে একটি দক্ষতা প্রশিক্ষণ ল্যাব স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে বই পড়ে নয়, হাতে-কলমে কাজ শেখানো হবে। যেমন—একটি ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরি, আরডুইনো দিয়ে একটি প্রকল্প, ওয়েবসাইট তৈরি বা কৃষির জন্য স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা তৈরি ইত্যাদি। স্থানীয় শিল্প, ব্যবসা, হাসপাতাল, কৃষিপ্রতিষ্ঠান, আইটি প্রতিষ্ঠান ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে যাতে শিক্ষার্থীরা বছরে কয়েকদিন বিভিন্ন ধরনের কর্মক্ষেত্র এবং প্রকল্প বাস্তবে পরিদর্শন করার সুযোগ পায়। এতে স্কুলের গণিত, বিজ্ঞান ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহৃত হয়, সেটি তারা ভালো করে বুঝতে পারবে।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্ন অনেকটা—‘তুমি কী জানো?’ ধরনের। কিন্তু শ্রমবাজারমুখী মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘তুমি কী জানো, কী করতে পারো এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান কীভাবে করতে পারো?’ ধরনের। তাই পরীক্ষায় শুধু মুখস্থ জ্ঞান যাচাই না করে শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে বাস্তব সমস্যা সমাধানের প্রকল্প দেওয়া যেতে পারে। উদাহরণ : ‘তোমাদের এলাকায় কীভাবে পানির অপচয় কমানো যায়?’, ‘আমাদের বিদ্যুৎ খরচ কীভাবে কমানো যায়?’ অথবা ‘কীভাবে একটি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করা যায়?’ ইত্যাদি। একটি দল তথ্য সংগ্রহ করবে, অন্য দল হিসাব করবে, কেউ ডিজাইন করবে, কেউ প্রেজেন্টেশন তৈরি করবে। এতে একই সঙ্গে বিজ্ঞান, গণিত, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও দলগত কর্মদক্ষতা শেখা হবে। শ্রমবাজারমুখী শিক্ষা সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয়, যদি শেষ পর্যন্ত সবকিছু মুখস্থনির্ভর পরীক্ষায় গিয়ে শেষ হয়। তাই শুধু ‘কতটুকু মনে রাখতে পারে’ নয়, ‘কী করতে পারে’Ñসেটি মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করতে পারে এমন মানুষ আর এআই ব্যবহার করতে পারে না এমন মানুষের মধ্যে। এতদিন কম্পিউটারের ব্যবহার জানা ছিল চাকরি পাওয়ার জন্য একটি বাড়তি সুবিধা। এখন এআই ব্যবহার করতে জানা ধীরে ধীরে কর্মজীবনের মৌলিক দক্ষতায় পরিণত হচ্ছে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে এআইয়ের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে নতুন নতুন চাকরি তৈরি হবে; প্রায় সব পেশার কাজের ধরনও পরিবর্তন হবে। ছাত্রজীবন থেকেই যদি এআই সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকে, তবে তারা বুঝতে পারবে এআই কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জানবে যে, এআই মাঝে মাঝে ভুল তথ্যও দিতে পারে। তাই এআইয়ের উত্তর যাচাই, তথ্যের উৎস পরীক্ষা এবং এআই ব্যবহার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার গাইডেন্স বাধ্যতামূলক করা দরকার, যাতে স্কুল শেষ করার আগেই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে ধারণা জন্মায়। সব শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র পথÑএ ধারণা পরিবর্তন করা জরুরি। কাউকে না কাউকে উদ্যোক্তা হয়ে চাকরি তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য প্রস্তুত না করে চাকরি সৃষ্টি করার সাহস ও সক্ষমতাও দিতে হবে। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের শ্রমবাজার একই রকম নয়। তাই স্থানীয় কারিকুলামে জাতীয় কারিকুলামের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমবাজারের ধরন অনুসারে কোথাও কোনো বিষয় ও পেশাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। যেমন : উপকূলীয় এলাকায় মৎস্য চাষ, জলজ উদ্ভিদ চাষ এবং সেখানকার জলবায়ু উপযোগী পেশা ইত্যাদি। শিল্পাঞ্চলে ম্যানুফ্যাকচারিং, ইলেকট্রিক কাজ, অটোমেশন ইত্যাদি। গ্রামাঞ্চলে কৃষিপ্রধান এলাকায় কৃষি প্রযুক্তি, ফুড প্রসেসিং ইত্যাদি। শহরে-নগরে যোগাযোগ প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি।

সপ্তাহে অন্তত একটি শ্রমজগৎ পরিচিতি ক্লাসে বিভিন্ন পেশা ও কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে আলোচনা করা উচিত। যেমন : ইঞ্জিনিয়ার কী করেন? ডাক্তার কী করেন? একজন ব্যাংকার কীভাবে কাজ করেন? পোশাক কারখানায় উৎপাদন কীভাবে হয়? একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার কী করেন? কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার কী? একজন উদ্যোক্তা কীভাবে ব্যবসা শুরু করেন? এখানে শুধু বক্তৃতা নয়, ভিডিও, বাস্তব উদাহরণ ও কর্মজগতের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকতে পারে। অভিভাবক ও নিকটস্থ পেশাজীবীদের আমন্ত্রণ করে তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

পেশাজীবীদের মেধা, শ্রম আর ঘামেই সভ্যতার চাকা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এর পেছনের কাহিনিগুলো জানা থাকে না বলে আমরা অনেক সময় পেশাজীবীদের অবহেলা করে থাকি। মাধ্যমিক পর্যায়ে শ্রমবাজারের আলোচনা যুক্ত করলে আশা করা যায় সমাজে পেশাজীবীদের সম্মান বাড়বে। অর্থ উপার্জনে অভিভাবকরা যে কী পরিমাণ কষ্ট করেন, শিশু মন অনেক সময়ই তা পরিমাপ করতে ব্যর্থ হয়। এই কষ্টের কাহিনি উপলব্ধি করতে পারলে অভিভাবকদের প্রতিও শিশুদের সম্মান বৃদ্ধি পাবে। এতে পড়াশোনায় তাদের মনোযোগ বাড়বে। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার ইচ্ছাটাও আরো শানিত হবে। তাদের আচার-আচরণে দায়িত্বশীলতা বাড়বে।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন