ডর্টমুন্ডের ‘সতীর্থ’ থেকে বিশ্বকাপে ‘প্রতিপক্ষ’

c43f2031-a2c6-4b68-9d2e-b872b4482a0e-02-03
আরিফুল হক বিজয়

ডর্টমুন্ডের ‘সতীর্থ’ থেকে বিশ্বকাপে ‘প্রতিপক্ষ’

ফুটবল শুধু গোলের খেলা নয়। কখনো অসমাপ্ত কথোপকথন, কখনো পুরোনো স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়া, কখনো বা দুই বন্ধুর ভিন্ন পথে হাঁটার গল্প। এবারের বিশ্বকাপেও কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড ও নরওয়ের লড়াইয়ে দেখা যাবে এমনই এক বন্ধুত্বের গল্প। যারা একসময় একই ড্রেসিংরুমে বসে স্বপ্ন এঁকেছিলেন, আজ তারা দাঁড়িয়ে আছেন বিপরীত দুই প্রান্তে। গল্পটা জুড বেলিংহ্যাম আর আর্লিং হালান্ডের; একজন ইংল্যান্ডের হৃৎস্পন্দন, অন্যজন নরওয়ের গোলমেশিন। একজনের চোখে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, অন্যজনের বুটে ইতিহাস লেখার ক্ষুধা।

বন্ধুত্বের গল্পটা শুরু হয়েছিল জার্মানির ডর্টমুন্ড শহরে। ২০২০ সালের শুরুতে সেখানে এসেছিলেন হালান্ড। কয়েক মাস পর যোগ দেন মাত্র ১৭ বছর বয়সি কিশোর বেলিংহ্যাম। বয়স কম হলেও প্রথম দিন থেকেই বোঝা গিয়েছিল, ছেলেটা অন্যরকম। ডর্টমুন্ডও তা বুঝেছিল। বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে আসতে একসঙ্গে তিনটি গাড়ি পাঠানো হয়েছিল। একটি গাড়িতে ছিলেন বেলিংহ্যাম, বাকি দুটি ছিল সংবাদমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করার জন্য। ক্লাব জানত, তারা একজন ফুটবলার নয়, ভবিষ্যতের এক মহাতারকাকে স্বাগত জানাচ্ছে। অভিষেক ম্যাচেই গোল করে সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দেন বেলিংহ্যাম। ম্যাচ শেষে থরগান হাজার্ডের মন্তব্যটি আজও অনেকেই স্মরণ করেন, ‘ওর বয়স মাত্র ১৭, কিন্তু খেলা দেখে মনে হয় বহু বছরের অভিজ্ঞ একজন ফুটবলার।’

অন্যদিকে হালান্ড তখন ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকার হয়ে ওঠার পথে। প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠানো যেন ছিল তার প্রতিদিনের অভ্যাস। মাঠে দুজনের বোঝাপড়া যতটা নিখুঁত ছিল, মাঠের বাইরে বন্ধুত্ব ছিল তার চেয়েও গভীর। ক্লাবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দুজনকে দেখা যেত একে অপরকে মজার সংলাপ শুনিয়ে হেসে কুটিকুটি হতে। কঠিন মুখের হালান্ডও তখন শিশুর মতো প্রাণখোলা। যে ফুটবলার সাধারণত সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে চলেন, বেলিংহ্যামের পাশে থাকলে তাকেই সবচেয়ে বেশি হাসতে দেখা যেত।

ডর্টমুন্ডের সেই দুই বছর ছিল তাদের বেড়ে ওঠার সময়। সেখানে তারা শুধু ট্রফি জেতেননি, একে অন্যের সঙ্গেও গড়ে তুলেছিলেন বিশ্বাসের সম্পর্ক। ২০২১ সালে জার্মান কাপ জয়ের স্মৃতিতে আজও তাদের দুজনের ছবিই সবচেয়ে উজ্জ্বল। তারপর পথ বদলে গেল। হালান্ড চলে যান ম্যানচেস্টার সিটিতে। বেলিংহ্যাম পরে পাড়ি জমান রিয়াল মাদ্রিদে। দূরত্ব বেড়েছে, জার্সি বদলেছে, লিগ বদলেছে; কিন্তু সম্পর্ক বদলায়নি। নিয়মিত যোগাযোগ ছিল দুজনের। এমনকি একসময় গুঞ্জনও উঠেছিল, বেলিংহ্যাম নাকি ব্যক্তিগতভাবে হালান্ডকে রিয়াল মাদ্রিদে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। হালান্ড থেকে গেছেন সিটিতেই। তবু বন্ধুত্ব রয়ে গেছে।

এরপর তারা মুখোমুখি হয়েছেন চ্যাম্পিয়নস লিগে। এবার ফের দেখা বিশ্বমঞ্চের আলোয়। এই দেখাটা ভিন্ন, লড়াইটাও আলাদা। এখানে পরাজয় মানে চার বছরের অপেক্ষা, আর জয় মানে অমরত্বের পথে আরো এক ধাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে মায়ামির এই লড়াই তাই শুধু ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে নয়, এটি দুই বন্ধুর মুখোমুখি লড়াইও। একজন বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে তিনটি গোল ও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত উপহার দিয়ে দলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন। অন্যজন সাত গোল করে নরওয়েকে নিয়ে চলছেন স্বপ্নভেলার দিকে। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবচেয়ে বড় দাবিদারদের একজন। দুজনই দুই দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

হয়তো ম্যাচ শেষে একজন উদযাপন করবেন, অন্যজন নীরবে ড্রেসিংরুমে ফিরে যাবেন। একজনের চোখে থাকবে সেমিফাইনালের স্বপ্ন, অন্যজনের চোখে অপূর্ণতার জল। কিন্তু শেষ বাঁশি তো কখনো বন্ধুত্বের শেষ সুর টানতে পারে না। ফুটবল ইতিহাস বহু প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখেছে; মেসি-রোনালদো, জিদান-ফিগো, রোনালদিনহো-হেনরি। বেলিংহ্যাম আর হালান্ডের গল্পটা একটু আলাদা। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরেও আছে আন্তরিকতা, প্রতিযোগিতার মাঝেও আছে শ্রদ্ধা।

মায়ামির আলোয় জ্বলমল রাতে একজন জিতবেন, একজন হারবেন। কিন্তু ফুটবল ছাপিয়ে নিশ্চিতভাবেই জিতে যাবে হালান্ড-বেলিংহ্যামের বন্ধুত্বের মহারণ। যে গল্পের শুরু হয়েছিল ডর্টমুন্ডে, সেটার একটি অধ্যায় লেখা থাকুক ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এর মঞ্চেও।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...