বিশ্বকাপে ফ্রান্সের প্রথম ছয় ম্যাচ শেষে প্রশ্নটি যেন সবার মুখে মুখে ঘুরছিল-এই ফ্রান্সকে থামাবে কে?
কিলিয়ান এমবাপ্পেকে আটকালে ওসমান দেম্বেলে। দেম্বেলেকে থামালেও মাইকেল অলিসে। অলিসেকে নিস্তেজ করলেও অপেক্ষায় দেজিরে দুয়ে কিংবা ব্র্যাডলি বারকোলা। দিদিয়ে দেশমের দলটা যেন ছিল চারটি আলাদা অস্ত্রে সাজানো এক আক্রমণযন্ত্র। একটি ভোঁতা হলেও অন্যটি আঘাত করবেই।
কিন্তু ডালাসের সেমিফাইনালে স্পেন এমন এক কৌশল সাজাল, যেখানে অস্ত্রগুলোকে ভাঙার দরকারই পড়ল না। তারা অস্ত্রগুলোর কাছে গোলাবারুদ পৌঁছাতেই দিল না।
২-০ গোলের স্কোরলাইন তাই ম্যাচের পুরো গল্প বলে না। এই ম্যাচের বাস্তবতা আরো নির্মম। পুরো ম্যাচে স্পেন যেন ফ্রান্সের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলা খেলল! বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিস্ফোরক আক্রমণভাগকে স্পেন এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে দিল, যেন ফ্রান্স কোনোদিনই এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর দল ছিল না। সেমিফাইনালকে বলা হচ্ছিল ‘ফাইনালের আগে ফাইনাল’।
কিন্তু কীসের ফাইনাল! ম্যাচটিকে যে স্পেন পুরো প্রাক-বাছাই পর্ব বানিয়ে ফেলল। ফ্রান্সকে নিয়ে স্রেফ ছেলেখেলা করল তারা। গোটা ম্যাচে যা মিলল তার নাম স্পেনের কুশলী ভঙ্গিতে কৌশলের প্রয়োগ।
এই ম্যাচে ফ্রান্স শুধু গোলেই নয়, সবকিছুতেই হেরেছে। টেকনিক্যালি, ট্যাকটিক্যালি, ডুয়েলে, কৌশলে, দৌড়ে, দমে-সবকিছুতে।
পরিসংখ্যান কখনো কখনো ভাষার চেয়েও নির্মম হয়। পুরো ৯০ মিনিটে এমবাপ্পে বল স্পর্শ করেছেন ৩৭ বার। একবারও গোলের ক্লিয়ারকাট কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। ম্যাচ পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ফ্রান্সের এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) ছিল মাত্র ০.৩- অপ্টার তথ্যভান্ডারে বিশ্বকাপে এটি ফ্রান্সের সর্বনিম্ন এক্সজি। প্রথম শট অন টার্গেট আসে ৮২ মিনিটে, বদলি দেজিরে দুয়ের দূরপাল্লার এক চেষ্টায়। যে দল গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত গড়ে প্রায় তিন গোল করেছে, সেই দল পুরো ৮১ মিনিট প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে বাস্তবিক অর্থে কোনো পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি।
এটা শুধু ফ্রান্সের জন্য ফুটবল মাঠে খারাপ একটা দিন নয়, এটা ছিল স্পেনের হাতে ফ্রান্সের পুরোদস্তুর নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার গল্প। যে ম্যাচে স্পেন চালক, ফ্রান্স বেচারা যাত্রী!
অনেকেই ভাববেন, স্পেনের নায়ক ছিলেন রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ কিংবা দানি ওলমো। বাস্তবে নায়ক ছিল তাদের সম্মিলিত দলীয় শক্তি। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে দুটি কার্যকর অস্ত্র-পজিশনাল প্রেস এবং ফাইভ সেকেন্ড কাউন্টার প্রেস-স্পেন এমন নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করেছে যে, ফ্রান্সের চার সুপারস্টারের কেউই নিজের স্বাভাবিক পরিবেশে খেলতে পারেননি।
পজিশনাল প্রেসের উদ্দেশ্য শুধু বল কেড়ে নেওয়া নয়; প্রতিপক্ষকে এমন এলাকায় বল নিতে বাধ্য করা, যেখানে তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত আগেই অনুমান করা যায়। আর বল হারানোর পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা পুনরুদ্ধারের কাউন্টার প্রেস ফরাসিদের এক মুহূর্তের জন্যও ছন্দ খুঁজে নিতে দেয়নি।
-ফলাফল?
এমবাপ্পে যখন বল পেয়েছেন, তখন পিঠ ছিল গোলের দিকে। দেম্বেলে বল পেয়েছেন ডাবল মার্কিংয়ের মধ্যে। অলিসে বল নিয়েছেন তিনজনের বেষ্টনীতে। বারকোলা গতি তোলার আগেই পথ বন্ধ।
সমস্যা তাদের প্রতিভায় ছিল না। সমস্যা ছিল, প্রতিভা ব্যবহারের মতো এক ইঞ্চি খোলা জায়গাও স্পেন তাদের দেয়নি।
টুর্নামেন্টজুড়ে আক্রমণভাগের চার দুর্দান্ত তারকার ফ্রিস্টাইল ফুটবল ফ্রান্সকে দুর্দান্ত সাফল্য এনে দিয়েছিল। কি আশ্চর্য, সেই সাফল্যই শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স কোচকে ফাঁদে ফেলে।
চুয়ামেনি ও রাবিও-মাত্র এ দুজন রেখে তিনি মাঝমাঠ সামলান। বিপদটা এতেই বেড়েছে আরো। মাঝমাঠে এই দুইয়ের বিপরীতে স্পেন খেলেছে রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ এবং দানি ওলমোর পুরো মাঠে ঘুরে বেড়ানো ত্রিভুজ নিয়ে। সংখ্যায়ও পিছিয়ে, অবস্থানগত বুদ্ধিমত্তা এবং পরিশ্রমে পিছিয়ে পড়ে ফ্রান্স।
এমবাপ্পে ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন, শুরু থেকেই তাদের প্রেসিং কাঠামো ভুল ছিল। তিনজন মিলে দুজনকে চেপে ধরতে গিয়ে স্পেনের অতিরিক্ত খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা খুলে দিয়েছিল তারা। আধুনিক ফুটবলে এমন সংখ্যাগত ভুলের শাস্তি একটাই-ম্যাচে ধসে পড়া। সেমিতে সে ভুলেই ম্যাচ থেকে আউট ফ্রান্স, বিশ্বকাপ থেকেই বিদায়।
মাঝমাঠ হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ফরাসি আক্রমণ। আক্রমণের চার তারকা তখন যেন নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে পড়েন! বল পাওয়ার সাপ্লাই চেইনই যে বিচ্ছিন্ন তাদের।
স্পেন আলাদা করে এমবাপ্পেকে থামানোর পরিকল্পনা করেনি। তারা দেম্বেলের জন্যও আলাদা ফাঁদ পাতেনি। তারা থামিয়েছে মাঠে ফ্রান্সের দাদাগিরি করার ফ্রিডম।
দেশম এই বিশ্বকাপে তার দলকে সবচেয়ে মুক্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলিয়েছেন। সেই ফ্রি, ফ্রাঙ্ক ফ্রিডমই ছিল ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু স্পেন বুঝেছিল, খেলোয়াড়কে নয়; তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এবং মাঠে তার জায়গাটুকু কেড়ে নিতে পারলেই প্রতিভা নিজে থেকেই নিষ্প্রভ হয়ে যাবে।
এই সেমিতে হয়েছেও ঠিক তাই। যে জায়গা থেকে গোলপোস্টে শট নিয়ে এমবাপ্পে ও দেম্বেলে সিদ্ধহস্ত, সে জায়গায় খেলোয়াড় রেখে পুরোটা সময় দখলদারিত্ব ধরে রাখে স্পেন।
বল পেলেই চারদিকে লাল জার্সির ঢেউ। সামনে প্রেস, পাশে ফাঁদ, পেছনে কভার। ফ্রান্সকে কখনোই নিজের ছন্দে খেলতে দেয়নি স্পেন। ফ্রান্সের মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগের সব খেলোয়াড়কে যেন বোতলবন্দি করে রাখল তারা। ছিপি দিয়ে বোতলের মুখ বন্ধ, আর ভেতরে হাতপা ছুড়ে নড়াচড়া করছেন এমবাপ্পে, দেম্বেলেরা। কিন্তু ছিপি খোলার চাবি যে তাদের হারিয়ে গেছে!
এভাবেই এই বিশ্বকাপ থেকে ফ্রান্সের গোটা দলই যে হারিয়ে গেল!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


