নবীনগরে আদালতের রায় উপেক্ষা করে তিতাস-বুড়ি নদী দখলের মহোৎসব

নবীনগরে আদালতের রায় উপেক্ষা করে তিতাস-বুড়ি নদী দখলের মহোৎসব

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করে তিতাস ও বুড়ি নদীর পূর্ব পাড়ে বিএস রেকর্ডের অজুহাতে দখলের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় সার্ভেয়ার জয়নাল আবেদীন সুমনের পরিমাপ অনুযায়ী, ‘সিএস’ ম্যাপে নবীনগর লঞ্চঘাট বরাবর নদীর প্রস্থ ছিল ৬২০ ফুট। তবে ‘বিএস’ ম্যাপে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২০ ফুটে। নতুন জরিপের সময় সুযোগ বুঝে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সিএস ম্যাপের ৪০০ ফুট প্রস্থের নদীর জায়গা নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। বর্তমানে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, আর অবশিষ্ট অংশে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করে দখলের চেষ্টা চলছে। ফলে নদী তার নিজস্ব গতি ও নাব্যতা হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ১ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করেন এবং নদীর ক্ষতি করাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন।

রায়ে স্পষ্ট বলা হয়, নদীর সীমানা ও গতিপথ সুরক্ষায় সিএস ম্যাপই (১৮৮৮-১৯৪০) মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য হবে। কোনো ব্যক্তি নদীর জায়গা বিএস ম্যাপে নিজের নামে রেকর্ড করলেও সিএস অনুযায়ী যা নদী ছিল, তা সরকার অবৈধ ঘোষণা করে রেকর্ড সংশোধন করতে পারবে। এছাড়া চিহ্নিত নদী দখলদারদের ব্যাংক ঋণ দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এক শ্রেণির অসাধু ভূমি কর্মকর্তার যোগসাজশে ভূমিদস্যুরা সিএস ম্যাপ অমান্য করে নদীর তিন ভাগের দুই ভাগ অংশ ভরাট করে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তুলেছে। এমনকি নদী দখলকারী ‘আহমেদ প্রাইভেট হাসপাতাল’র মালিক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ হাসপাতালের নামে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একসময় প্রমত্তা তিতাস ও বুড়ি নদীকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অর্থনীতি, কৃষি ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। আজও এ নদী দিয়ে ভৈরব, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন লঞ্চ, কার্গো ও যাত্রীবাহী নৌকা চলাচল করে। সেচ ও মাছ শিকারের ওপর নির্ভর করে বহু মানুষের জীবিকা। অথচ নদী সুরক্ষায় ২০২০ সালে নবীনগর থেকে কসবার কুটি বাজার পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার নৌপথ খননে ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ প্রকল্পের আওতায় ২৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় করা হলেও তা কোনো কাজে আসেনি। বরং খননের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৪ সাল থেকেই নবীনগর পূর্ব ইউনিয়নের বগডহর মৌজায় তিতাস ও বুড়ি নদীর জায়গা নিজের দাবি করে বালু ভরাট শুরু করেন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। সম্প্রতি নবীনগর পৌর এলাকার লঞ্চঘাটের পূর্ব পাশে রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে তিতাস নদী ভরাটের কাজ শুরু করলে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বালু জেগে ওঠে।

সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রকাশের পর রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাকিবুল ইসলাম তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় পরিবেশ ও জলধারা আইনে অবৈধভাবে বালু ভরাট করার দায়ে ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নিজস্ব খরচে বালু অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নবীনগর সদর ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১০৯৮ খতিয়ানভুক্ত ২৫৯০ এসএ দাগের জায়গাটি সরকারি সম্পত্তি। নতুন বিএস খতিয়ানে জায়গাটি মন মিয়া নামের এক ব্যক্তির নামে রেকর্ড হলেও ফরিদ উদ্দিন আহমেদের নামে কোনো নামজারি বা খারিজ খতিয়ান নেই। অবৈধভাবে তিনি এ জায়গা দখল করছিলেন।

সাহিত্য ও লোককথায় তিতাস নদীকে ‘মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে’ বলা হয়। অদ্বৈত মল্লবর্মন ও কবি আল মাহমুদের রচনায় অমর হয়ে থাকা এই নদী রক্ষায় এখন সোচ্চার হয়ে উঠেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদী দুটির সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখলমুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

নদীর সীমানা নির্ধারণ প্রসঙ্গে ইউএনও রাকিবুল ইসলাম জানান, সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন