প্রথমে হুমকি। কখনো মোবাইল ফোনে, কখনো ফেসবুকে। হুমকির ভাষাও প্রায় একই ‘সময় শেষ, মেরে ফেলব, মাথার খুলি উড়িয়ে দেব’। এরপর কয়েকদিনের ব্যবধানে ঘটেছে গুলি করে হত্যার ঘটনা।
চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে সন্ত্রাসী রায়হান আলমকে ঘিরে গত দেড় বছরে এমনই হুমকি ও হত্যার ধারাবাহিকতার তথ্য সামনে এসেছে। অন্তত আটটি হত্যা মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অন্যতম এই সহযোগীর নাম এসেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের আগে তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পুলিশ ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের বক্তব্যে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ফের হুমকিমূলক পোস্ট দিয়েছেন রায়হান। পুরো চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সামনে ‘ভয়ংকর দিন’ আসছে— এমন ইঙ্গিত রয়েছে তার ওই পোস্টে। এতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে।
ফেসবুকে রায়হান লিখেছেন, ‘আমার খেলা শেষ, আহারে বেকুবের দল।’ এরপর তিনি দাবি করেন, কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী সাজ্জাদের ‘সব অটো মাল’ সামনে এলে তারা আগের লোকজনের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে এর ‘আপডেট’ পাওয়া যাবে বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
রায়হানের পোস্টে ‘অল্প কিছু দিনের মধ্যে আপডেট পাবে’ এবং ‘শত শত রায়হান সাজ্জাদ ভাইয়ের স্টোরে পড়ে আছে’— এমন বক্তব্যকে হালকাভাবে দেখছে না পুলিশ। পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তবে রায়হান নামে কাউকে চেনেন না বলে আমার দেশকে জানিয়েছিলেন বড় সাজ্জাদ। রায়হানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশের হিসাবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সংখ্যা ১৪-১৫টি। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি হত্যা মামলা বলে জানান নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত রায়হান।
‘তোর সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে’
রায়হানের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার পর হত্যার অভিযোগগুলোর মধ্যে আলোচিত একটি সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যা। গত বছরের ৫ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার চালিতাতলীতে বিএনপির একটি গণসংযোগ কর্মসূচির মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় বাবলাকে। এর আগে রায়হান তাকে মোবাইলে হুমকি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। একটি ফোনকলে বলা হয়েছিল, ‘চট্টগ্রাম শহরে বাবলা বাঁচতে পারবে না।’ আরেকবার বলা হয়, ‘যা খাওয়ার খেয়ে নে, এক সপ্তাহের মধ্যে তোর মৃত্যু হবে।’
রায়হানের নাম এসেছে রাউজানের যুবদলকর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলম হত্যা মামলাতেও। গত বছরের ২৫ অক্টোবর মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় রাউজান পৌরসভার চারাবটতল বাজারসংলগ্ন কায়কোবাদ জামে মসজিদের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রী ও সন্তান তখন পেছনের একটি অটোরিকশায় ছিলেন।
হত্যার আগে এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলমগীরের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে রায়হানের নাম উল্লেখ করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা যায় তাকে। পরে পুলিশও হত্যাকাণ্ডে রায়হানের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনার কথা জানায়। নিহতের ছেলে আশফায়েত হাসানের অভিযোগ, তার চোখের সামনেই রায়হান তার বাবাকে গুলি করেন।
ইব্রাহিম, সেলিম, ঢাকাইয়া আকবর হত্যা
রায়হানের বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে আলোচিত আরেকটি ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলা। গত বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। বিভিন্ন অডিওতেও আকবর হত্যায় নিজের সংশ্লিষ্টতার দাবি করেন রায়হান—এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
আকবর হত্যার পরও রায়হানের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই বছরের ২৫ জুলাই কালুরঘাট এলাকার এক ওষুধের দোকানিকে ফোন করে আকবর হত্যা মামলার আসামি হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে হুমকি দেন রায়হান। কথোপকথনে আকবরের পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
গত বছরের ২২ এপ্রিল রাউজান সদরের পূর্ব রাউজানের গাজীপাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদলকর্মী মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে। এ মামলার অন্যতম আসামি রায়হান। পুলিশের অনুসন্ধানেও তার নাম উঠে আসে। রায়হান এই হত্যাকাণ্ডের ‘মূল কারিগর’ এবং সরাসরি জড়িত বলে দাবি করেছিলেন রাউজান থানার তৎকালীন ওসি। রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের যুবদল নেতা মো. সেলিম হত্যাকাণ্ডেও রায়হানের নাম আসে।
বাকলিয়ার জোড়া খুনেও হুমকির অভিযোগ
গত বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে থাকা বখতিয়ার হোসেন মানিক ও আবদুল্লাহ আল রিফাতকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ জোড়া খুনের মামলায় রায়হানসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পরে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও রায়হান ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। নিহত মানিকের মা ফিরোজা বেগমের অভিযোগ, মামলা তুলে নিতে রায়হান তাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছিলেন।
এই আগস্টেও ফেসবুকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে রায়হানকে। জেলা পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ করে তার একটি ফেসবুক পোস্ট ফের আলোচনায় এসেছে। সেখানে পুলিশ সুপারকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



-9d9f11.jpg)