গতি ও গোলের গল্প-এমবাপ্পে!

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

গতি ও গোলের গল্প-এমবাপ্পে!

মাত্র ২৯ মিনিট। ততক্ষণে সুইডেনের রক্ষণভাগ বুঝে গেছে আজকের রাতটা তাদের নয়। প্রথমবার তিনি ছুটলেন, গো…ল! দ্বিতীয়বার ডি-বক্সে বল পেলেন, আবারও গোল। স্কোরবোর্ডে ফ্রান্স ৩-০ আর কিলিয়ান এমবাপ্পের বিশ্বকাপে গোলসংখ্যা চার ম্যাচে ছয়। গ্যালারিতে তখন উল্লাস; কিন্তু সুইডিশ ডিফেন্ডারদের চোখে-মুখে যেন একটাই কথা—‘ওহ্ এমবাপ্পে, ইউ ইম্পসিবল!’
ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় আছে, যাদের নাম শুনে প্রতিপক্ষ পরিকল্পনা সাজায়। আর কিছু খেলোয়াড় আছে, যাদের সামনে সব পরিকল্পনাই ভেঙে পড়ে। এমবাপ্পে সেই দ্বিতীয় দলের একজন। ডি-বক্সের সামনে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও ফাঁকা ছেড়ে দেওয়া মানেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তিনি শুধু একজন স্ট্রাইকার নন, তিনি যেন চলমান বিপদসংকেত। ম্যাচের আগে টিম পরিকল্পনায় প্রতিপক্ষের কোচ যে আলোচনা করেন, সেখানে তার নামের পাশে নোটশিটে পরিচয়টা এভাবে লেখেন-এমবাপ্পে, দ্য ডেঞ্জারম্যান!
চার ম্যাচে ছয় গোল। গোল করলে জোড়ায় করেন। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে মাত্র ১৬ ম্যাচ খেলেই গোল ১৯টি। সংখ্যাটা পড়ে মনে হতে পারে এটা কি ঠিক, নাকি ভুল? কারণ, এমন হিসাব তো ভিডিও গেমে দেখা যায়, বাস্তব ফুটবলে নয়। অথচ বাস্তবের এমবাপ্পে সেটাকেই সহজ ও স্বাভাবিক করে তুলেছেন। ২০১৮ সালে নিজের অভিষেক বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে চার গোল; সঙ্গে ট্রফি জয়। ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করলেন এবং সাত ম্যাচের টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা ছয়। আর এবার এখন পর্যন্ত মাত্র চার ম্যাচে আরো হাফডজন গোল। ১৬ ম্যাচে ১৯ গোল।
প্রশ্ন দুটো।
-কোথায় গিয়ে থামবেন কিলিয়ান এমবাপ্পে?
-এই ফ্রান্সকে আটকাবে কে?
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় লিওনেল মেসিকে ছুঁতে তার এখন চাই মাত্র একটি গোল। ২৭ বছর বয়সেই ইতিহাসের দরজায় এমনভাবে কড়া নাড়তে আধুনিক ফুটবলে খুব কম খেলোয়াড়ই পেরেছেন।
তবে এমবাপ্পের গল্প শুধু সংখ্যার নয়, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে তার খেলার স্টাইল, তার জয়ের ক্ষুধা।
বল পায়ে এমবাপ্পে যখন দৌড়ান, মনে হয় বাতাসকে সঙ্গে নিয়ে উড়ছেন! ঘণ্টায় প্রায় ৩৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটে যাওয়ার ক্ষমতা আছে অনেকেরই; কিন্তু সেই গতিকে কখন ব্যবহার করতে হবে-সেটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি অকারণে স্প্রিন্ট দেন না। ডিফেন্স লাইনের সামান্য ফাঁকটা কোথায় রয়েছে, সেটা অনুমান করেন। অফসাইড ট্র্যাপের ঠিক কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তারপর এমন সময় দৌড় শুরু করেন যে, ডিফেন্ডাররা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখা গেল তিনি পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে। আর গোলরক্ষক তখন ‘বেচারা’ ভঙিতে অসহায়!
এমবাপ্পের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি। পা যত দ্রুত চলে, মাথা তারও আগে কাজ করে। তাই কঠিন কোণ থেকেও গোল করতে পারেন; আবার অর্ধেক সুযোগকেও শতভাগে রূপ দিতে পারেন। গোলের সামনে তার শান্ত স্বভাবটা যেন দাবাড়ুর শেষ চালের মতো হিসাবি, ঠাণ্ডা এবং টার্গেট যেন হিট অন বুলস আই!
ড্রিবলিং কৌশল, স্টেপওভার, শরীরের ভারসাম্য বদল, ছোট ছোট টাচ, বল যেন তার পায়ে লেপ্টে থাকে, তার কথা শোনে, নির্দেশ মানে-এমনই অনুগত বাধ্য! ওয়ান টু ওয়ান লড়াইয়ে তাকে আটকানো এখন বিশ্বসেরাদের কাছেও প্রায় অসম্ভব।
বিশ্বকাপের মঞ্চ পেলেই এমবাপ্পে যেন নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান। ২০১৮ সালে কিশোর বয়সে বিশ্বকাপ জয়। ২০২২ সালে ফাইনালে হ্যাটট্রিক—যে কীর্তি বিশ্বকাপ ইতিহাসেই বিরল। ট্রফি হারানোর সেই রাতেও তিনি ছিলেন ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। ফাইনালে হ্যাটট্রিক! এমন গল্প ফুটবল খুব বেশি লেখেনি। এবারের বিশ্বকাপেও সম্ভবত সে গল্প আরো রোমাঞ্চকর কায়দায় লিখতে চলেছেন এমবাপ্পে।
গোলের দারুণ ধারাবাহিকতাও দেখাচ্ছে। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল, ইরাকের বিপক্ষেও তা-ই, নরওয়ের বিপক্ষে গোল না পেলেও অ্যাসিস্ট, আর সুইডেনের বিপক্ষে আবারও জোড়া গোল। অর্থাৎ, প্রতিটি ম্যাচেই তিনি কোনো না কোনোভাবে ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দু।
এ কারণেই এমবাপ্পেকে শুধু গোলদাতা বললে ভুল হবে। তিনি ম্যাচের গতি বদলে দেন। তিনি প্রতিপক্ষের মানসিকতাও বদলে দেন। একজন ডিফেন্ডার যখন এমবাপ্পেকে মার্ক করেন, তখন তিনি শুধু একজন খেলোয়াড়কে নয়, একটি সম্ভাব্য বিস্ফোরণকেও থামানোর চেষ্টা করেন।
অনেক ফুটবলার গোল করেন। অনেকেই দ্রুত দৌড়ান। অনেকেই ড্রিবল করেন; কিন্তু এ তিনটিকে একসঙ্গে এমন নিখুঁতভাবে মিশিয়ে তাকে শিল্প করে তোলার সক্ষমতা খুব কম ফুটবলারের আছে। এমবাপ্পে সেই ধাঁচের, সেই ঘরানার ফুটবলশিল্পী। তিনি মাঠে নামলেই ফুটবল আর শুধু ফুটবল থাকে না; সেটা হয়ে ওঠে এক ধরনের আনন্দ অপেক্ষা—এবার কী করেন তিনি? সে প্রশ্নের জবাব খোঁজা!
সুইডেনের বিপক্ষে দুটি গোল হয়তো আরেকটি জয় এনে দিয়েছে ফ্রান্সকে। কিন্তু আরো বড় ব্যাপার হলো, এমবাপ্পে আবারও মনে করিয়ে দিলেন বিশ্বকাপ তার গোল শিকারের সবচেয়ে প্রিয় মঞ্চ। এখানেই তিনি সবচেয়ে বেশি আলো ছড়ান, এখানেই সবচেয়ে বেশি ভয় ধরান।
বল যখন এমবাপ্পের পায়ে, তখন শুধু ডিফেন্ডাররা নয়—ইতিহাসও দৌড়াতে শুরু করে, নতুন কিছু শুরুর আশায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন