২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরই নয়, বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ইভেন্ট হিসেবেও নাম লিখিয়েছে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণ ও ১০৪ ম্যাচের সম্প্রসারিত টুর্নামেন্টকে ঘিরে সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট, জার্সি, পর্যটন, হোটেল ও বেটিং খাতে ঘুরেছে হাজার কোটি ডলার। তবে এই বিপুল অর্থপ্রবাহে সবাই সমানভাবে লাভবান হয়নি। কেউ হয়েছে বিশাল অঙ্কের আয়ের মালিক, আবার কেউ পড়েছে বাড়তি ব্যয় ও লোকসানের মুখে।
ফিফাই সবচেয়ে বড় বিজয়ী
বিশ্বকাপ থেকে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা পেয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। কাতার বিশ্বকাপ থেকে সংস্থাটি ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের জ্যেষ্ঠ পরিকল্পনাবিদ ম্যারিয়ন লাবোরের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষে ফিফার চার বছরের মোট আয় ১৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, লাইসেন্সিং, হসপিটালিটি ও টিকিট বিক্রির পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো অফিশিয়াল টিকিট রিসেল মার্কেটপ্লেস থেকেও কমিশন আদায় করেছে ফিফা। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ করে কমিশন নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও ফিফার আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।
দর্শকদের জন্য বেড়েছে ব্যয়ের চাপ
বিশ্বকাপের অন্যতম আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ সমর্থকরা। ডায়নামিক প্রাইসিং ব্যবস্থার কারণে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের দামও বেড়েছে। ফাইনালের সর্বোচ্চ অফিসিয়াল টিকিটের মূল্য ছিল ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার, আর পুনর্বিক্রয় বাজারে কিছু টিকিটের দাম ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিমানভাড়া, হোটেল, খাবার ও স্থানীয় পরিবহনের অতিরিক্ত ব্যয়। নিউ জার্সিতে স্টেডিয়ামে যাওয়ার একটি ট্রেনের ভাড়া সাধারণ সময়ের ১২ দশমিক ৯০ ডলার থেকে বেড়ে ১৫০ ডলারে পৌঁছানো ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে ভাড়া কিছুটা কমানো হলেও তা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি।
সম্প্রচারকারী ও স্পন্সরদের বড় ব্যবসা
বিশ্বকাপ সম্প্রচার করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো বিজ্ঞাপন থেকে মোটা অঙ্কের আয়ের সুযোগ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফক্স স্পোর্টস সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তাদের সম্প্রচারে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। এবারের হাইড্রেশন ব্রেকও সম্প্রচারকারীদের জন্য নতুন বিজ্ঞাপনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা ও নাইকির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বকাপজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের সামনে নিজেদের উপস্থিতি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
বেকহামের বাণিজ্যিক জয়
মাঠের বাইরে বড় বিজয়ীদের একজন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডেভিড বেকহাম। অবসরের অনেক বছর পরও তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনের মুখ। একই সঙ্গে তার সহ-মালিকানাধীন ইন্টার মায়ামি এখন মেজর লিগ সকারের সবচেয়ে মূল্যবান ক্লাবগুলোর একটি। ফলে ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হলেও বাণিজ্যিক সাফল্যের দৌড়ে তিনি এখনো শীর্ষ সারিতেই রয়েছেন।
জার্সির বাজারে নতুন রেকর্ড
বিশ্বকাপ ঘিরে জার্সি ও স্মারকপণ্যের বিক্রিও ছিল চোখে পড়ার মতো। নাইকির দাবি, তাদের জাতীয় দলের জার্সি বিক্রি ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ইংল্যান্ডের জার্সি। অন্যদিকে অ্যাডিডাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় জার্সি ছিল স্বাগতিক মেক্সিকোর। তবে আসল পণ্যের পাশাপাশি নকল জার্সির বাজারও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটবল জার্সি এখন শুধু খেলার পোশাক নয়, এটি ফ্যাশনেরও অংশ হয়ে ওঠায় নকল পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে।
আয়োজক শহর ও হোটেল খাতের হতাশা
বিশ্বকাপকে ঘিরে আয়োজক শহরগুলোর অর্থনীতি চাঙা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ফিফা বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪১ বিলিয়ন ডলার যোগ হওয়ার পূর্বাভাস দিলেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল সীমিত। সাময়িক কর্মসংস্থান তৈরি হলেও স্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন খুব একটা হয়নি। হোটেল খাতও প্রত্যাশা অনুযায়ী লাভ পায়নি। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আয়োজক শহরে বুকিং প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। হোটেল মালিকদের অভিযোগ, ফিফার আগাম বিপুলসংখ্যক কক্ষ বুকিং এবং সাধারণ পর্যটকদের ভিড় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে প্রত্যাশিত ব্যবসা হয়নি।
বেটিং কোম্পানির জ্যাকপট
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক সাফল্যগুলোর একটি এসেছে বেটিং শিল্পে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ম্যাককোয়ারির হিসাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজি ধরা হতে পারে, যা এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বেটিং ইভেন্টে পরিণত করেছে। ১০৪ ম্যাচের সম্প্রসারিত সূচি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে অনলাইন বেটিংয়ের দ্রুত বিস্তার এই বাজারকে আরো বড় করেছে। ম্যাচ শুরুর আগের বাজির পাশাপাশি এখন ইন-প্লে বেটিংও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিরও এক বিশ্বকাপ
২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবল আর শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি এখন বহু বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শিল্প। ফিফা, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান, স্পন্সর, জার্সি নির্মাতা ও বেটিং কোম্পানিগুলো যেখানে বড় লাভের মুখ দেখেছে, সেখানে সমর্থক, হোটেল খাত এবং অনেক আয়োজক শহর প্রত্যাশিত সুফল পায়নি। অর্থাৎ, মাঠে যেমন একটি দল বিশ্বকাপ জেতে, তেমনি মাঠের বাইরে অর্থনীতির খেলায়ও থাকল বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

