আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মনে করিয়ে দিচ্ছে অনেক স্মৃতি আর বিতর্ক

নজরুল ইসলাম

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মনে করিয়ে দিচ্ছে অনেক স্মৃতি আর বিতর্ক

ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যা কেবল মাঠের ৯০ মিনিটের কৌশল বা বল দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু ম্যাচ রূপ নেয় দুটি সংস্কৃতির সংঘাত, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর ইতিহাসের প্রতিশোধে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে যখনই ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়, তখন মাঠের সবুজ ঘাস যেন একেকটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই বিশ্বকাপ দ্বৈরথ আগামী বুধবার রাত ১টায় আটলান্টায় এক নতুন রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। যেখানে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার সামনে দাঁড়াবে টমাস টুখেলের অধীনে ৬০ বছরের অধরা ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখা ইংল্যান্ডের ‘থ্রি লায়ন্স’রা।
২০০২ সালের পর দীর্ঘ দুই দশক বিশ্বকাপে এই দুই পরাশক্তি মুখোমুখি না হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো এই দ্বৈরথের তীব্রতা ও গভীরতা আঁচ করতে পারবে না। বিগত ছয় দশকের বিতর্ক, বৈরিতা এবং মহাকাব্যের নানা দিক নিয়ে সাজানো হলো এই বিশেষ প্রতিবেদন।

১৯৬২ : আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের সূচনা

১৯৬২ সালে চিলির রনকাগুয়ায় গ্রুপ পর্বের ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ৩-১ ব্যবধানে হারায় ইংল্যান্ড। রন ফ্লাওয়ার্স, ববি চার্লটন ও জিমি গ্রিভসের গোলে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় থ্রি লায়ন্সরা। পরে আর্জেন্টিনা একটি সান্ত্বনাসূচক গোল শোধ করে। গ্রুপ পর্ব শেষে উভয় দলেরই পয়েন্ট সমান (১টি জয়, ১টি ড্র ও ১টি হার) ছিল। তবে গোল গড় বা গোল ডিফারেন্সে এগিয়ে থেকে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড। যদিও শেষ আটেই ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের।

১৯৬৬ : শত্রুতার আনুষ্ঠানিক অভিষেক ও ‘পশু’ বিতর্ক

১৯৬৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটিকেই এই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার আসল জন্মসূত্র বলা যায়। ওয়েম্বলিতে সেই ম্যাচটি ছিল চরম উত্তেজনা ও ফাউলে ভরা। ম্যাচের মাত্র ৩৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখান। রাত্তিনের অপরাধ ছিল রেফারির সঙ্গে অনর্গল তর্ক করছিলেন, যদিও রাত্তিন জার্মান ভাষা জানতেন না আর রেফারি জানতেন না স্প্যানিশ!
মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোয় খেলা প্রায় আট মিনিট বন্ধ থাকে। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে জয়ী হলেও ম্যাচ শেষে ইংরেজ কোচ স্যার আলফ রামসে ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টিনার সঙ্গে জার্সি বদলাতে নিষেধ করেন এবং প্রতিপক্ষকে ‘পশু’ বলে অভিহিত করেন। এই ম্যাচের চরম বিশৃঙ্খলা ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এতটাই ভাবিয়ে তুলেছিল যে, এর ওপর ভিত্তি করেই ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম চালু করা হয়।

১৯৮৬ : ফকল্যান্ডের ক্ষত, ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা গোল

১৯৮২ সালে ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এর ঠিক চার বছর পর ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যখন দুদল মুখোমুখি হলো, তখন তা আর কেবল খেলা ছিল না; ছিল রাজনৈতিক প্রতিশোধের মঞ্চ। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ এই ম্যাচটিকে যুদ্ধের ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম বানিয়েছিল।
সেই ম্যাচেই ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত দুটি গোল করেন মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে। ম্যাচের ৫১ মিনিটে ইংরেজ গোলরক্ষক পিটার শিল্টনকে পরাস্ত করতে ম্যারাডোনা হেড করার ভান করে হাত দিয়ে বল জালের ভেতর ঠেলে দেন। রেফারি তা দেখতে না পাওয়ায় গোলটি বৈধতা পায়, যা বিশ্ব ফুটবলে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে অমর হয়ে গেছে।
এই বিতর্কের রেশ কাটার আগেই ৫৫ মিনিটে ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে বল ধরে ইংল্যান্ডের পাঁচজন বিশ্বসেরা ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক শিল্টনকে ড্রিবলিংয়ের জাদুতে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। এই গোলটি পরবর্তী সময়ে ফিফা কর্তৃক ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। গ্যারি লিনেকার শেষ মুহূর্তে একটি গোল পরিশোধ করলেও ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়।

১৯৯৮ বেকহ্যামের ট্র্যাজেডি

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচটি ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। মাইকেল ওভেনের দুর্দান্ত একক গোলের পর ম্যাচ যখন ২-২ সমতায়, ঠিক তখনই ঘটে সেই বিখ্যাত ঘটনা। আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনেকে ফাউল করার পর মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থায় রাগের মাথায় হালকা লাথি মারেন ইংল্যান্ডের তরুণ তারকা ডেভিড বেকহ্যাম। সিমিওনে মাঠে এমনভাবে আছড়ে পড়েন যে, রেফারি বেকহ্যামকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে সিমিওনে স্বীকার করেছিলেন যে, রেফারিকে ফাঁদে ফেলতে অভিনয় করেছিলেন। ১০ জনের ইংল্যান্ড বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে যায়। রাতারাতি ব্রিটিশ মিডিয়া ও সমর্থকদের চোখে খলনায়কে পরিণত হন বেকহ্যাম।


২০০২ : বেকহ্যামের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

তবে নিয়তি বেকহ্যামকে ফিরিয়ে দেয়নি। চার বছর পর ২০০২ সালের জাপান বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে আবারও মুখোমুখি দুদল। ম্যাচের ঠিক ৪৪ মিনিটে মরিসিও পচেত্তিনো বক্সের ভেতর মাইকেল ওভেনকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। পুরো ইংল্যান্ডের কোটি মানুষের চাপ মাথায় নিয়ে পেনাল্টি শট নিতে আসেন অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম। বল জালে জড়াতেই চার বছর আগের সব গ্লানি মুছে আনন্দের জোয়ারে ভাসে ইংল্যান্ড। ১-০ গোলের এই জয়ে বেকহ্যাম যেমন তার প্রতিশোধ নেন, তেমনি ফেভারিট আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকেই চোখের জলে বিদায় নেয়।
ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার ম্যাচ মানেই রোমাঞ্চ, ড্রামা, বিতর্ক আর বিশুদ্ধ ফুটবলের মেলবন্ধন। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সেই রাজনৈতিক আবহ বা ম্যারাডোনার হাত দিয়ে গোল করার সেই ক্ষোভ হয়তো সময়ের সঙ্গে কিছুটা স্তিমিত হয়েছে, কিন্তু ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার এখনো কমেনি। আগামী বুধবার আটলান্টার মাঠে যখন দুদলের ফুটবলাররা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবেন, তখন তাদের পেছনে থাকবে এই ৬০ বছরের গৌরবময় ও কণ্টকাকীর্ণ ইতিহাস। ফুটবলপ্রেমীরা চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন আরো একটি ঐতিহাসিক মহারণ দেখার অপেক্ষায়।

পরিসংখ্যানের আয়নায় দুই পরাশক্তি

বিশ্বকাপের মঞ্চে দুদলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ফুটবলপ্রেমীদের অনেকের মনে হতে পারে ম্যারাডোনা কিংবা মেসির দেশই হয়তো এই লড়াইয়ে এগিয়ে, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। বিশ্বকাপে হওয়া মোট ৫টি ম্যাচের মধ্যে ৩টিতেই জিতেছে ইংল্যান্ড, আর আর্জেন্টিনার জয় ২টি (যার মধ্যে একটি টাইব্রেকারে)।

বিশ্বকাপে দুদলের মুখোমুখি লড়াই

সাল ফল
১৯৬২ ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা

১৯৬৬ ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা

১৯৮৬ আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড

১৯৯৮ আর্জেন্টিনা ২(৪-৩) ২ ইংল্যান্ড

২০০২ ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...