ম্যাচ শেষ হতে তখন আর কয়েক সেকেন্ড বাকি। ১০৩তম মিনিটে জোস্কো গভার্দিওলের জালে বল জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়েছিল ক্রোয়েশিয়া। মনে হচ্ছিল, শেষ মুহূর্তে সমতায় ফিরেই তারা ম্যাচকে নিয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে। কিন্তু কয়েক মিনিটের ভিএআর পর্যালোচনার পর ক্রোয়েশিয়ার সেই উল্লাস মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ, মানুষের চোখ নয়-সিদ্ধান্ত দিয়েছে বলের ভেতরে থাকা মাইক্রোচিপ।
২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন বল অ্যাডিডাস ট্রিওন্ডা তে ব্যবহৃত হয়েছে সেন্সরভিত্তিক "কানেক্টেড বল" প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তিরই অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্নিকোমিটার, যা নিশ্চিত করে দেয় বলে ঠিক কোন খেলোয়াড় শেষ স্পর্শ করেছিলেন। আর সেই তথ্যই শেষ পর্যন্ত রক্ষা করেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও পর্তুগালকে।
রোনালদোর দ্বিতীয়ার্ধের পেনাল্টি গোলে এগিয়ে ছিল পর্তুগাল। ইনজুরি সময়ের একেবারে শেষ দিকে পর্তুগালের বক্সে তৈরি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। ক্রস থেকে ক্রোয়েশিয়ার স্ট্রাইকার ইগর মাতানোভিচ লাফি উঠে বলে মাথার সামান্য ছোঁয়া দেন। বল তার মাথায় স্পর্শ করেছে খালি চোখে অবশ্য সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। এরপর সেই বল পর্তুগালের ডিফেন্ডার রেনাতো ভেইগার গায়ে লেগে চলে যায় মারিও পাসালিচের কাছে। পাসালিচ তখন অফসাইডে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে তিনি বল বাড়িয়ে দেন গভার্দিওলকে, যার শটে বল জালে।
মাঠের রেফারি প্রথমে গোলের স্বীকৃতি দিলেও ভিএআর সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করে। স্নিকোমিটারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পর্তুগালের ডিফেন্ডার ভেইগার আগে বলে সূক্ষ্ম স্পর্শ করেছিলেন মাতানোভিচ। অর্থাৎ বলের শেষ স্পর্শ ছিল আক্রমণকারী দলের একজন খেলোয়াড়ের। ফলে পাসালিচ অফসাইড অবস্থান থেকেই বল গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত গোল বাতিল হয় এবং ১-০ ব্যবধানে জয় নিয়ে শেষ ষোলোতে উঠে যায় পর্তুগাল।
কেন এটা অফসাইড হল? ফিফার আইন কী বলে?
ফিফার ল অব দ্য গেমসের আইন ১১( অফসাইড) অনুযায়ী, একজন খেলোয়াড় যদি সতীর্থের সর্বশেষ স্পর্শ বা পাস দেওয়ার মুহূর্তে অফসাইড অবস্থানে থাকেন এবং পরে সেই বল খেলে বা খেলার ওপর প্রভাব ফেলেন, তাহলে তিনি অফসাইড গণ্য হবেন।
এই ঘটনার মূল প্রশ্ন ছিল-বলটি কি সরাসরি মাতানোভিচের স্পর্শ থেকে পাসালিচের কাছে গেছে, নাকি ভেইগা নতুন করে বল খেলেছেন?
আইন অনুযায়ী, ডিফেন্ডারের ইচ্ছাকৃত (ডেলিবারেট প্লে) হলে অফসাইডের নতুন ধাপ শুরু হয় এবং আগের অফসাইড বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু যদি বল কেবল ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে দিক বদলায় বা প্রতিহত (ডিফ্লেকশন) হয়, সেটিকে ডেলিবারেট প্লে ধরা হয় না।
এই ম্যাচে রেনাতো ভেইগা বলটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বা ইচ্ছাকৃতভাবে খেলার সুযোগই পাননি। বল কেবল তার শরীরে লেগে দিক বদলায়। ফলে এটি ছিল ডিফ্লেকশন, ডেলিবারেট প্লে নয়। তাই মাতানোভিচের স্পর্শের সময় যে অফসাইড অবস্থান তৈরি হয়েছিল, সেটিই বহাল থাকে। পাসালিচ অফসাইডে থেকেই বল স্পর্শ করায় গোলটি আইন অনুযায়ী বাতিল হয়।
কীভাবে কাজ করল স্নিকোমিটার?
ক্রিকেটে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত স্নিকোমিটার এবার ফুটবলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের বলে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইনারশিয়াল মেজারমেন্ট সেন্সর (আই এম ইউ) বা মাইক্রোচিপ বসানো হয়েছে, যা প্রতি সেকেন্ডে শত শতবার বলের নড়াচড়া ও সংস্পর্শের তথ্য সংগ্রহ করে।
যখন কোনো খেলোয়াড় বল স্পর্শ করেন, তখন অত্যন্ত ক্ষুদ্র কম্পন ও শব্দতরঙ্গ তৈরি হয়। সেন্সর সেই সংকেত রেকর্ড করে এবং ভিএআর সিস্টেম সেটিকে গ্রাফ আকারে দেখায়। গ্রাফে স্পষ্ট বোঝা যায় ঠিক কোন মুহূর্তে বলে স্পর্শ লেগেছে এবং কার স্পর্শ আগে হয়েছে।
এই ম্যাচে খালি চোখে মাতানোভিচের স্পর্শ বোঝা কঠিন ছিল। কিন্তু স্নিকোমিটারের গ্রাফ নিশ্চিত করে যে ভেইগার গায়ে লাগার আগে বলে মাতানোভিচের মাথার চুলে স্পর্শ করেছিল। সেই প্রমাণের ভিত্তিতেই অফসাইডের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন রেফারি।
প্রযুক্তির যুগে আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত
২০২২ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সংযুক্ত বল প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হলেও ২০২৬ বিশ্বকাপে সেটি আরও উন্নত হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো সম্প্রচারেও স্নিকোমিটারের ভিজ্যুয়াল গ্রাফ দেখানো হয়েছে, যাতে দর্শকেরাও সিদ্ধান্তের পেছনের প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দেখতে পারেন।
রোনালদোর জন্যও এটি প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত। ২০২২ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিপক্ষে ব্রুনো ফার্নান্দেসের ক্রসে নিজের মাথার স্পর্শের দাবি করেছিলেন তিনি। কিন্তু তখনও বলের সেন্সর প্রযুক্তিই প্রমাণ করেছিল, বল তার মাথায় লাগেনি।
চার বছর পর আবারও প্রযুক্তিই হয়ে উঠল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে এবার সেটি রোনালদোর একটি গোল কেড়ে নেয়নি; বরং শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার সমতা ফেরানোর স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে পর্তুগালকে পৌঁছে দিয়েছে শেষ ষোলোয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

