আয়বৈষম্য কমছে না কেন

আয়বৈষম্য কমছে না কেন

মোট দেশজ উৎপাদন, তথা জিডিপির সাপেক্ষে বাংলাদেশ অর্থনীতির আয়তন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাবেÑএমন সুখবর জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। গত ২৫ আগস্ট কানাডাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের প্রকাশিত ‘দ্য ওয়ান-ফিফটি ট্রিলিয়ন ডলার গ্লোবাল ইকোনমি ইন টোয়েনটি থার্টি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৬৭৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে এবং তা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড কিংবা ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি। পাটিগণিতিক হিসাবকে অবজ্ঞা করলে এ সংবাদটি সুখকর মনে হবে, কারণ প্রতিবেদনে বর্ণিত অন্য তিনটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি।

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭৮ মিলিয়ন। পক্ষান্তরে, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের জনসংখ্যা যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন, ৭১ দশমিক ৫ মিলিয়ন এবং ১০২ মিলিয়ন। জনসংখ্যা কম হওয়ার কারণে এসব দেশের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আর্থিক জিডিপি আনুমানিক ৩ হাজার ডলার। অন্য তিনটি দেশের মাথাপিছু জিডিপি যথাক্রমে ১৫ হাজার ডলার, ৮ হাজার ডলার এবং ৫ হাজার ডলার।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের মোট আয় বৃদ্ধির পূর্বাভাস শুনে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই, কারণ অল্পকিছু মানুষের আয় বৃদ্ধি দ্বারা মোট আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান সমাজে আয় বৈষম্যকে আরো হৃষ্টপুষ্ট করে।

দশকের পর দশক বাংলাদেশে আয় যেমন বেড়েছে, আয়বৈষম্যও বেড়েছে; যার ফলে আয় বৃদ্ধির সুফল অধিকাংশ মানুষ ভোগ করতে পারেনি। ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিল মাত্র পাঁচজন। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (এইচআইইএস) ২০২২’ অনুসারে, দেশে ধনী ও গরিবের আয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট আয়ের ৩০.০৪ শতাংশ এখন সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের হাতে। ২০১৬ সালে এই হার ছিল ২৭.৮২ শতাংশ। সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ পরিবারের কাছে এখন মোট আয়ের ৪০.৯২ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা ছিল ৩৮.০৯ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমলেও, সবচেয়ে কম আয়ের ৫০ শতাংশ পরিবারের আয়ের অংশ কমে গেছে। দেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ মোট সম্পদের মাত্র ৪.৭ শতাংশের মালিক।

যদি কালোটাকা ও বিদেশে পাচার করা টাকা হিসাবে ধরা হয়, তাহলে বৈষম্য আরো বেশি হবে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিবিষয়ক গবেষণামূলক কাজের জন্য ১৯৭১ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার অর্জনকারী মার্কিন অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেটসের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব অনুযায়ী, আয়বৈষম্য রেখা দেখতে উল্টো ‘ইউ’ আকৃতির। অর্থাৎ, কোনো দেশের উন্নয়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে এটি বাড়তে থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র যখন সম্পদ বণ্টনের মতো যথেষ্ট সচ্ছলতা অর্জন করে, তখন তা আবার কমতে শুরু করে। বাংলাদেশ অসমতার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় আটকে আছে এবং তা ক্রমাগত ওপরের দিকেই উঠে চলেছে।

আয়বৈষম্য বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগপ্রাপ্তিতে অসমতা, স্বল্প বেতনের চাকরি, লাগামহীন দুর্নীতি, কাঠামোগত অনিয়ম, কর ফাঁকি, অর্থ পাচার ইত্যাদি। বাংলাদেশে আয়বৈষম্যের আরেকটি অন্যতম কারণ হলো ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সুযোগের অভাব। ব্যাংকগুলো যেখানে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদান করে, সেখানে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দরিদ্র কৃষক বা বর্গাচাষির পক্ষে ঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে; কারণ ঋণ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জামানতÑযেমন : জমি বা দালানকোঠাÑতাদের থাকে না। এমনকি কোনোভাবে সামান্য ঋণ পেলেও তা পরিশোধের জন্য দরিদ্রদের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করা হয়। আয়বৈষম্য বৃদ্ধির অধিকাংশ কারণ রাজনীতিনিয়ন্ত্রিত।

বাংলাদেশের করকাঠামো রাজনীতিবিদ এবং বিত্তশালীদের তেমন স্পর্শ করতে পারে না, কারণ আইনপ্রণেতাদের অধিকাংশই কার্যত ব্যবসায়ী।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ সংসদের ৬৭ শতাংশ আইনপ্রণেতা ছিলেন ব্যবসায়ী এবং ৯০ শতাংশ ছিলেন কোটিপতি।

কোটিপতিরা যখন শাসকের দায়িত্বে থাকেন, তখন তাদের সম্পদ আরো বাড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে সমাজে আয়বৈষম্যও ঊর্ধ্বমুখী হয়। বাংলাদেশের আয়বৈষম্য হ্রাসকল্পে সরকারি তেমন দৃশ্যমান কর্মসূচি নেই। বৈষম্য বৃদ্ধি পেলে জনঅসন্তোষ বাড়ে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পতনের মূলে ছিল বৈষম্য। সুতরাং আয়বৈষম্য হ্রাসকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

করণীয়

বাংলাদেশে করব্যবস্থা এখনো পশ্চাৎমুখী রয়ে গেছে। দেশটি রাজস্ব উপার্জনের জন্য আয়করের পরিবর্তে মূলত মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীল, যা একধরনের ভোগভিত্তি কর। এই করব্যবস্থা মূলত স্বল্প আয় ও দরিদ্রদের ওপরই সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কর রাজস্বের জন্য কার্যকর প্রগতিশীল আয়কর প্রথা প্রবর্তন করা আবশ্যক। উচ্চবিত্তদের কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি করলে সমাজে বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধির পাশাপাশি, অর্জিত রাজস্ব এমন সব খাত ও ক্ষেত্রে ব্যয় করা প্রয়োজন, যেমন : বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, যাতে তারা অধিক উৎপাদনশীল এবং লাভজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে। এমন একটি রাজস্ব নীতি দরকার, যা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর কর আরোপের সাহস দেখাবে। প্রয়োজন হলে উত্তরাধিকার করব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে বংশানুক্রমিকভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা রোধ করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বে অনুরূপ করব্যবস্থা বিরাজমান এবং আয়বৈষম্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

সামাজিক সুরক্ষা, সুশাসন এবং সম্পদ পুনর্বণ্টন—অর্থাৎ কর ও সরকারি সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে যাদের কাছে অতিরিক্ত সম্পদ রয়েছে, তাদের কাছ থেকে তা যাদের কাছে অপ্রতুল, তাদের কাছে স্থানান্তরের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশে এর উল্টো প্রক্রিয়াটি কার্যকর। সরকারি অফিসে সেবা নিতে যাওয়া মানুষের অধিকাংশই নিম্নআয়ের। কিন্তু সেবা পাওয়ার জন্য তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। পরিশোধিত অর্থ চলে যাচ্ছে উচ্চ আয়শ্রেণির মানুষের পকেটে।

আয়বৈষম্য দূরীকরণে সর্বোচ্চ মনোযোগী হতে হবে মূলত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক এবং রাজনীতিবিদদের। ধনিক গোষ্ঠীর লুণ্ঠন ও ক্রমবিস্তারমান দুর্নীতি কঠোরভাবে দমনের মাধ্যমে আয়বৈষম্য হ্রাস পেলেই শুধু জিডিপি বৃদ্ধির সুফল উপভোগ্য হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন