ঘড়িতে ম্যাচের বয়স তখন ১৭ মিনিট। উজবেকিস্তানের পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পেয়েছে পর্তুগাল। বলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সেই চেনা ভঙ্গি, চেনা দৃষ্টি, চেনা প্রস্তুতি। গ্যালারির হাজারো দর্শক উঠে দাঁড়িয়েছেন। টেলিভিশনের সামনে বসা কোটি দর্শক অপেক্ষা করছেন। উজবেকিস্তানের গোলকিপার বারবার দেয়াল সাজাচ্ছেন। ডিফেন্ডারদের চোখও আটকে আছে একজনের ওপর। সবাই জানেন এরপর কী হওয়ার কথা।
শট নেবেন রোনালদো। বল উড়বে। এমন ফ্রি-কিক ক্যারিয়ারে অনেকবার নিয়েছেন। গোলের আনন্দে ভেসেছেনও। এবারও সে দৃশ্যের অপেক্ষায় বিশ্বকাপ।
কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় নাট্যকারদের একজন এদিন যে অন্য গল্প লিখলেন। যে গল্পের নাম ‘ফ্রি-কিক’!
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রোনালদো শট নেওয়ার অভিনয় করলেন। এমন অভিনয়, যাতে ধোঁকা খেল উজবেকিস্তানের ডিফেন্স, গোলকিপার, গ্যালারির দর্শক, এমনকি টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা দর্শকরাও। সবাই ভাবছিলেন রোনালদোর ডানপাশে দাঁড়ানো নুনো মেন্ডেজ শট নেওয়ার ডামি করবেন। বলের ওপর দিয়ে পা ঘুরিয়ে নিয়ে আসবেন। আর ফ্রি-কিক নেবেন রোনালদো। মোবাইলে সবাই সেই দৃশ্য ধরে রাখার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সেখানেই ট্রিকস খেললেন রোনালদো। বিভ্রান্তি ছড়ালেন। রোনালদো নয়, নুনো মেন্ডেজই শট নিলেন! আর সেই শট ডানদিকের দূরপোস্টের জালে! গোলকিপার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু গোল ঠেকাতে পারেননি। তিনি তো রোনালদোর শটের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু রোনালদো কেবল শট নেবেন এমন ভঙ্গির অভিনয় করলেন, শট নিলেন নুনো মেন্ডেজ। আর তাতেই রচিত হলো অবাক করা একটি ফ্রি-কিকের গল্প!
ম্যাচে এটি ছিল পর্তুগালের দ্বিতীয় গোল। আর পুরোদলের টিমওয়ার্কের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
এই ট্রিকি ফ্রি কিকের আয়োজন ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ফ্রি-কিকের আগে মেন্ডেজের কানে কানে রোনালদো বলেছিলেন, ‘চলো গোলকিপারকে একটু বোকা বানাই!’
উজবেক রক্ষণ দেয়াল আর গোলকিপার- সবাই বোকা বনে গেলেন। এই ফ্রি-কিকের ভিডিও ক্লিপ সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হতে সময় লাগেনি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব- সর্বত্র একটাই আলোচনা : রোনালদোর ‘২০০+ আইকিউ মুভ’।
এটি ছিল সত্যিকার অর্থেই মনস্তাত্ত্বিক মাস্টারক্লাসের মাস্টারপিস। আর এটা এমন একজন ফুটবলারের কাজ, যার উপস্থিতি এখনো প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণভাগের চিন্তাভাবনা এলোমেলো দিতে পারে। গোল না করেও যিনি ম্যাচের গল্প লিখতে পারেন।
তবে হিউস্টনের এই ম্যাচে রোনালদো শুধু গল্পের লেখকই ছিলেন না, ছিলেন গল্পের প্রধান চরিত্রও। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের দুর্দান্ত জয়ে তিনি করেছেন জোড়া গোল। প্রথম গোলটিতে দেখা গেছে তার স্বভাবসুলভ পজিশনিং, সময়জ্ঞান এবং গোলমুখে অনবদ্য দক্ষতা। দ্বিতীয় গোলে মিলল তার সেই চিরচেনা ক্ষুধা, যা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদের আতঙ্কিত করে রেখেছে।
কঙ্গোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে বাজে পারফরমেন্সের পর সমালোচনা কম হয়নি। বয়স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে জানতে চেয়েছেন ৪১ ছুঁইছুঁই রোনালদো এখনও কি বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দিতে পারবেন? উত্তরটা তিনি সংবাদ সম্মেলনে দেননি। দিয়েছেন মাঠে।
রোনালদো এভাবেই নিজেকে চেনান।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকে সমালোচনার জবাব তিনি দিয়েছেন পরিসংখ্যান দিয়ে, গোল দিয়ে, ট্রফি জিতে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে প্রতিভা, রিয়াল মাদ্রিদে কিংবদন্তি, জুভেন্টাসে বিজয়ী, আল নাসরে বয়সকে হার মানানো গোলমেশিন—প্রতিটি অধ্যায়েই সন্দেহকারীদের ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি।
এ কারণে রোনালদোর জন্য ভালোবাসার অন্য নাম ‘গোলআনদো’।
শুধু গোল করেন বলেই নয়, গোলের আনন্দে ভাসিয়ে দেন বলেই। তার গোল মানেই গ্যালারিতে বিস্ফোরণ, সতীর্থদের উল্লাস, কোটি সমর্থকের উন্মাদনা। আর এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি নিজে গোল না করেও গোলের আনন্দ তৈরি করতে পারেন। নুনো মেন্ডেজের সেই গোলটিও শেষ পর্যন্ত রোনালদোর সৃষ্ট এক আনন্দ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। কারণ, পুরো নাটকের পরিচালক ছিলেন তিনি নিজেই।
এ ম্যাচে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল রোনালদোর ফুটবল বুদ্ধিমত্তা। তরুণ বয়সে তিনি ম্যাচ জিততেন গতি দিয়ে, ড্রিবলিং দিয়ে, বিস্ফোরক শক্তি দিয়ে। এখন জেতেন অভিজ্ঞতা দিয়ে, অবস্থান-বোধ দিয়ে, প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ফ্রি-কিকের মুহূর্তটি ছিল তারই নিখুঁত উদাহরণ।
ম্যাচ শেষে রোনালদোও বলছেন, তারা প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন, যা উজবেকিস্তান কল্পনাও করেনি। পরিকল্পনাটি সফল হয়েছে বলেই হাসিমুখে মাঠ ছেড়েছেন তিনি। আর সেই হাসির মধ্যেই যেন ছিল একটি বার্তা।
বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে মাত্র। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো জানিয়ে দিলেন, তিনি এখনো আছেন। বেশ ভালোভাবেই আছেন। গোল করছেন, গোল করাচ্ছেন, ম্যাচের গতি বদলে দিচ্ছেন, প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দিচ্ছেন, সমালোচকদের চুপ করাচ্ছেন। তার চোখ এখনো সেই সোনালি ট্রফির দিকেই।
হয়তো এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ; হয়তো শেষ সুযোগও। বিশ্বকাপ মঞ্চে শেষ নাচ! এই নাচটি নিজ আনন্দেই নাচতে চান সিআর সেভেন।
চিয়ার্স!
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


