দেশে সাক্ষরতার হার যেন অনেকটাই থমকে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে তিন বছর ধরে এই হার দেখানো হচ্ছে ৭৭.৯ শতাংশ। অর্থাৎ ২২ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠী এখনো নিরক্ষর। যদিও এই পরিসংখ্যান এবং সাক্ষরতার সংজ্ঞা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতর্ক আছে। বিশেষ করে, পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের আমলে সাক্ষরতার হার বাস্তবতার চেয়ে ক্রমেই বাড়িয়ে দেখানো হতো বলে অভিযোগ আছে।
বর্তমান হিসাবেও এই ব্যাপক সংখ্যক নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষরতার আওতায় আনা বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থার পরিবর্তনে রাজনৈতিক প্রতিশ্রতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নানা কর্মসূচি গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা।
তবে সাক্ষরতার আগের চিত্রের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে বর্তমান সরকার শতভাগ সাক্ষরতার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাব।
গতকাল সোমবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কীভাবে সবাইকে সাক্ষরতায় নিয়ে আসতে পারি সেটাই বড় বিষয়। এজন্য বর্তমান সরকারের আগামী সাড়ে চার বছরে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এদিকে, দেশে সাক্ষরতার এমন বাস্তব অবস্থার মধ্যেই আজ মঙ্গলবার পালিত হবে ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা।’ এটিকে সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এ উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উদ্যোগে আজ সকালে আলোচনা এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্মাননা দেওয়া হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
সোমবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস প্রসঙ্গে বলেন, এ বছরের প্রতিপাদ্য সাক্ষরতাকে কেবল পড়তে, লিখতে ও গণনা করতে পারার মৌলিক সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় একজন সাক্ষর মানুষ শুধু তথ্য পড়তে বা লিখতে সক্ষম হন না; তিনি তথ্য অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে পারেন। প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হন এবং শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। সেই সাংবিধানিক অঙ্গীকারকে ধারণ করে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাক্ষরতা বিস্তারে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭.৯৮ শতাংশ। এই অগ্রগতি আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক।
তবে একইসঙ্গে এটিও সত্য যে, এখনো একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে। তাদের
মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরেপড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। তাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান শর্ত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ছিল আনুমানিক ৫৬.৮ শতাংশ। আওয়ামী সরকারের সময়ে সাক্ষরতার এ হার বাড়তে বাড়তে পতনের আগের বছর ২০২৩ সালে তা দেখানো হয় ৭৬.৮ শতাংশ। পতনের পরের মাসে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালে তা দেখানো হয় ৭৭.৯ শতাংশ। গত বছরও একই হার দেখায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
তবে বাস্তবে সাক্ষরতার এই হার সঠিক নয় বলে মনে করেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। এমনকি গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছিলেন- দেশে সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশের নিচে। পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সাক্ষরতার সংজ্ঞা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, সাক্ষরতার হারের পাশাপাশি সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন: ইউনেস্কোর সংজ্ঞায়- কোনো বাক্যাংশ বুঝে পড়তে পারা এবং অংক করতে পারাকে সাক্ষরতা বোঝায়।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কারণ অনেকে কোরআন পড়তে পারলেও তার অর্থ বা ব্যাখ্যা বুঝতে পারেন না-এটা সাক্ষরতা নয়। একইভাবে অনেক নিরক্ষর ব্যক্তি মুদি দোকানে হিসাব-নিকাশ করতে পারেন। তিনি জানান, এজন্য বিবিএসের পরিসংখ্যানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭২ শতাংশ দেখানো হলেও পরে প্রায়োগিক সাক্ষরতা দেখানো হয়েছে ৬০ শতাংশ—এটাই বিভ্রান্তি ও বিতর্কের কারণ।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দেশের ২২ শতাংশ জনগোষ্ঠী নিরক্ষর-এই সংখ্যা কিন্তু কম নয়। ইউরোপের অনেক দেশের জনসংখ্যার চেয়ে তা বেশি। তিনি জানান, এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় সাক্ষরতার হারে আমরা পিছিয়ে।
এই শিক্ষাবিদ আরো বলেন, পড়া বুঝতে পারার সঙ্গে তা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারে কি না—সেটা দেখতে হবে। এছাড়া শহর ও গ্রামের যে বৈষম্য আছে, এটাও ঠিক নয়।
সাক্ষরতা বাড়ানোর জন্য কিছু পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বয়স্ক ও নিরক্ষরদের জন্য নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও এর মেয়াদ শেষে নতুন করে শুরু করতে বিলম্ব হয়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নিতে হবে। এছাড়া শুধু লেখাপড়া দিয়ে সাক্ষরতা হবে না, এরসঙ্গে দক্ষতাও দরকার। এজন্য এলাকা ও চাহিদাভিত্তিক কোর্স চালু করা উচিত।
সরকারের নানা উদ্যোগ
সাক্ষরতা বাড়াতে বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় সাক্ষরতা কেবল নাম দস্তখত বা বর্ণমালা চেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে বর্তমানে ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ’পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম ধাপে নিবন্ধিত ৪৩১২ জন ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১৯৮ জন ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (বিএনকিউএফ)-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৮৮২ জন বা ৯২.৪৭% শিক্ষার্থী সরাসরি স্থায়ী চাকরি, শিক্ষানবিস কাজ বা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্চিতদের স্বাবলম্বী করতে এবং দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করার লক্ষ্যে ‘ইচ ওয়ান টিচ ওয়ান’মডেলের আলোকে ‘অ্যাডাল্ট অ্যান্ড ফাংশনাল লিটারেসি ফর অ্যাবিলিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (আলফা) গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।
সাক্ষরতার বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব খ ম কবিরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, দেশে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন আছে। আগে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল প্রচারসর্বস্ব। প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে যেমন প্রচার বেশি হয়েছে, তেমিন যা হয়নি তাও প্রচার করা হয়েছে। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক-তিন পর্যায়েই অনেক ত্রুটি আছে। তাছাড়া দারিদ্র্য ও সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্নীতিও এক্ষেত্রে দায়ী। এ অবস্থায় সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



