নিজ ভূমিতে ফেরা অনিশ্চিত ১৩ লাখ রোহিঙ্গার

নিজ ভূমিতে ফেরা অনিশ্চিত ১৩ লাখ রোহিঙ্গার

নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত জীবনের ৯ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ও নাফ নদী সাঁতরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে থাকা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মিলিয়ে বর্তমানে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এই দীর্ঘ সময়েও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ খোলেনি। মিয়ানমারের জান্তা সরকার সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার কথা বললেও নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও ‘রোহিঙ্গা’জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি ছাড়া দেশে ফিরতে নারাজ শরণার্থীরা। বাংলাদেশ সরকার ও রোহিঙ্গারা এই শর্তের তীব্র বিরোধিতা করছে। এতে প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, আর সীমান্তের এপারে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দা তথা; রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছেন ১২ লাখ ২০৩৪ জন। যদিও সাধারণ হিসাবে, এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি।

সূত্র মতে, ২০২৩ সালের শেষদিকে মিয়ানমারের জান্তা নিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির তুমুল সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়, যা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। ফলে ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নতুন করে আরো দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

২০১৭ সালে সন্ত্রাস দমন অভিযানের নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন ও গণহত্যা চালায়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা একে ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করে।

এ ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা শুরু করে। যদিও এখন পর্যন্ত কয়েক দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একজন রোহিঙ্গাও স্বদেশে ফেরত পাঠানো যায়নি। ফলে ক্যাম্পগুলোতে জনগোষ্ঠী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অপরাধের মাত্রা। উখিয়া-টেকনাফের এই ক্যাম্পগুলোতে প্রায়ই ঘটছে গুম, খুনসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা।

এসব রোহিঙ্গার আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মানবিক সহায়তায় ইউএনএইচসিআর এবং অনেক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমশই কমে আসছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের চাপের কারণে চাষাবাদের জমি এখন পচা নালায় পরিণত হয়েছে। এদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা না করা হলে এখানকার সার্বিক পরিবেশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে।

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ইউনুস আরমান বলেন, আমরা কবে দেশে ফিরব তা জানি না। আজ বাস্তুচ্যুত জীবনের ৯ বছর পূর্তিতে আমরা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করব। এই সমাবেশের মাধ্যমে আমরা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিতে চাই— মিয়ানমারের ওপর যেন চাপ সৃষ্টি করা হয়, যাতে আমরা স্বদেশে ফিরতে পারি।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সভাপতি মোহাম্মদ জুবাইর বলেন, ছোট এই বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা দিন দিন বোঝা হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, আমরা মিয়ানমারে ফেরার পূর্বশর্ত হিসেবে নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিজ বসতভিটা ফেরত এবং গণহত্যার বিচারের নিশ্চয়তা চাই। অন্যথায়, ফিরে গেলে আবারও নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ, তারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং জীবন বাঁচিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলো আমাদের সহায়তা করছে।

তিনি বলেন, আমরা এখানে স্থায়ী নই, আমাদের ঠিক একদিন ফিরতে হবে আমাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে। রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র সমাধান প্রত্যাবাসন। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

এদিকে, বাংলাদেশ সরকারও বারবার বলছে, এই সংকটের একমাত্র সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেনা সরকারের অনাগ্রহে সেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিয়েও তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

বাড়ছে জনসংখ্যা, বেড়েছে সংকট

২০১৭ সালের পর উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে দুই লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে, যা সীমিত এই ভূখণ্ডের ওপর তীব্র জনসংখ্যার চাপ তৈরি করছে। পাশাপাশি দুই লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। তারা বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম ও মানব পাচারের মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক চক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

পুলিশের বিভিন্ন সূত্র বলছে, গেল ৯ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ২৮৮ জনের বেশি মানুষ খুন হয়েছেন। সন্ত্রাস, ডাকাতি ও স্বাধীনতাকামিতার আড়ালে সশস্ত্র গ্রুপের নিজেদের দ্বন্দ্বে এসব খুনের ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্ব মনোযোগ সরে যাচ্ছে

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন নতুন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধের কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ রোহিঙ্গা সংকট থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক মানবিক তহবিলের জোগান আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।

২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় তহবিলের ঘাটতি থাকায় রেশন ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে দাতা সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশ কী ভাবছে?

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রায় এক দশক ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর এক বিশাল ও অসহনীয় বোঝার সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানাতে চাই— এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর একমাত্র টেকসই সমাধানও মিয়ানমারকেই নিশ্চিত করতে হবে।

তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই মিয়ানমারের ওপর কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, যেন তারা তাদের নাগরিকদের দ্রুত ফিরিয়ে নেয়।

বিশ্ব সংস্থার উদ্বেগ

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডি গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে দাতা দেশগুলোর মানবিক সাহায্য সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের জন্য আমাদের মানবিক তহবিলের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ শতাংশ কমিয়ে (৭১০.৫ মিলিয়ন ডলার) শুধু অতিজরুরি জীবনরক্ষাকারী সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে হয়েছে। এ বছর মাত্র ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

তার মতে, এই সংকটের কারণে ক্যাম্পের নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের মৌলিক বেঁচে থাকার অধিকার হুমকিতে পড়ছে।

যা বলছেন শরণার্থী কমিশনার

কক্সবাজারে দায়িত্বরত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ড. মিজানুর রহমান মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশের একক কোনো বিষয় বা অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তার মতে, বিশ্ব সম্প্রদায়কে এর দায় নিতে হবে।

ড. মিজান বলেন, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই। টেকসই এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়নসহ সমস্যা সমাধানে সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মংডু অঞ্চলে ক্রমাগত নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক রোহিঙ্গা নতুন করে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে, যা পরিস্থিতিকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। তবে এর মধ্যেও বাংলাদেশ সরকার তাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন