বিশ্লেষণ

ট্রফির সঙ্গে আরো অনেক কিছু পেল বাংলাদেশ

আহমেদ বিন পারভেজ

ট্রফির সঙ্গে আরো অনেক কিছু পেল বাংলাদেশ

এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ অনেকদিন মনে রাখবে। আর মনে রাখবে ট্রফি ডিসাইডিংয়ের শেষ টাইব্রেকার শট! মনে রাখবে ১২ নম্বর জার্সিকে। টাইব্রেকারে নেওয়া সেই পানেনকা শট। ধীরস্থির, শান্ত মেজাজ এবং নিজের শক্তির ওপর অসীম আস্থা থাকলেই কেবল এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন শটে কেউ গোল করতে পারে। রোনান সুলিভানকে আরেকবার ধন্যবাদ! এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ ট্রফি জিতেছে। আর সেই সঙ্গে আবিষ্কার করেছে মহাগুরুত্বপূর্ণ এক ফুটবল সম্পদ—যার নাম রোনান সুলিভান।

বিজ্ঞাপন

পুরো টুর্নামেন্টে রোনানের পারফরম্যান্স দেখে আমার কাছে মনে হচ্ছে প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট বা মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্টের ট্রফিটাও আসলে তার হাতেই সঠিক মানাত। কিন্তু অ্যাডজুডিকেটররা এই ট্রফির জন্য মনোনীত করলেন ভারতের স্ট্রাইকার উমাং দোদুমকে। মানছি টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি তিন গোল তার। দুটি অ্যাসিস্ট আছে। সবমিলিয়ে দলের হয়ে পাঁচটি গোলে অবদান তার। পরিসংখ্যান বেশ সবল। তবে একটু মনে করিয়ে এই স্ট্রাইকার ফাইনালে টাইব্রেকার মিস করেছেন! যেই মোমেন্টটায় দলের তাকে প্রয়োজন ছিল তিনি কিন্তু সেই ডেলিভারিটা করতে পারেননি। সে কারণে আমার কাছে মনে হয় যে তাকে মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার দেওয়াটা একটু আনফেয়ার হয়ে গেছে। পারফরম্যান্স বিচারে রোনান সুলিভান ভারতীয় স্ট্রাইকারের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তার নেওয়া টাইব্রেকার শটেই টুর্নামেন্টের ট্রফি জিতেছে বাংলাদেশ।

কতটা কনফিডেন্ট থাকতে পারলে একটা প্লেয়ার ঠান্ডা মাথায় সব স্নায়ুচাপ জয় করে পানেনকা শটে ওই ডিসাইডিং পেনাল্টিটা নিয়ে দলকে জেতাতে পারে! রোনান সুলিভান তার বয়সের তুলনায় এই টুর্নামেন্টে দারুণ ম্যাচুরিটি দেখিয়েছেন। সন্দেহাতীতভাবে এই খেলোয়াড় বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য বড় আশীর্বাদ। ফরোয়ার্ড লাইনের একটা খুব দারুণ ভবিষ্যৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি রোনান সুলিভানের মাধ্যমে। ভারতের বিরুদ্ধে ফাইনাল ম্যাচটা হবে ঠিক দাবা খেলার মতোই কুশলী, এটা আমরা জানতাম। এই ট্যাকটিক্যাল ব্যাটেলে যে দল কম ভুল করবে সেই এগিয়ে থাকবে। বাংলাদেশ প্রথমার্ধে দুটি খুব ভালো সুযোগ পেয়েছিল। প্রথমে রোনান সুলিভানের একটা ফ্রি কিক থেকে পাওয়া বলে বাংলাদেশ অধিনায়ক মিঠু চৌধুরী হেডারটা বাইরে মেরেছেন। সেই হেড গোলে থাকলে আমরা তখনই লিড পেতে পারতাম। শুরুর অর্ধে আরো একটা সুযোগ আসে যখন মোহাম্মদ মানিক খুব দারুণভাবে কাট ইন করে রোনান সুলিভানের রাস্তার মধ্যে বলটা পাঠিয়ে দেন এবং রোনান সুলিভান শুধু বলে পা ছোঁয়াতে পারলে ওটা নিশ্চিত গোল হতো। বাংলাদেশ শুরুর ৪৫ মিনিটে ইন্ডিয়ার চেয়ে ভালো সুযোগ তৈরি করেছে। যদিও তাদের খেলার স্টাইল ছিল ডিফারেন্ট। বাংলাদেশ অ্যাগ্রেসিভ খেলার চেষ্টা করেছে। প্রেস করার চেষ্টায় ছিল। লং বলেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করেছে।

ফিরি এবার টাইব্রেকার পর্বে। বাংলাদেশ যেই এন্ডে টাইব্রেকার ডিফেন্ড করছিল তার পেছনেই বাংলাদেশের সমর্থকদের বিশাল ভিড় ছিল। এ সমর্থকরা ভারতীয় খেলোয়াড়দের একটু চাপে ফেলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। টাইব্রেকারে কৌশলগত একটা ভুল করে ভারত। বদলি নামা একজন খেলোয়াড়কে প্রথম টাইব্রেকার শট নিতে দেওয়া হয়েছিল। আমি মনে করি ওটা একটা ট্যাকটিক্যাল ভুল ছিল। তবে গোলপোস্টে বাংলাদেশের মাহিনের অ্যান্টিসিপেশন ছিল ফ্যান্টাসটিক। সেই ঠেকিয়ে দেওয়া শট ছিল ফাইনালের অন্যতম ডিফাইনিং মোমেন্টস।

মাহিনের দুর্দান্ত সেভে টাইব্রেকার পর্বে শুরুতেই বাংলাদেশ অ্যাডভান্টেজ পেয়ে যায়। পেনাল্টি ঠেকাতে সঠিক জায়গায় ঝাঁপ দেওয়াটা এবং হাতের দিক নিশানা ঠিক রাখাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। টাইব্রেকার পর্বে ইন্ডিয়ান কিপার বেশির ভাগ সময়ে উল্টো দিকে ডাইভ দিয়েছেন। বারবার বোকা বনেছেন।

বাংলাদেশের স্যামুয়েল রাক্ষামের নেওয়া টাইব্রেকার শট পোস্টে লেগে ফেরত আসার পর মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের বিপদ বেড়েই গেল কি না? এই মিসে ভারত লাইফ লাইন পেয়ে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু ভারতের উমাং দোদুম খানিক পরেই টাইব্রেকার শট মিস করলেন। বল বাইরে উড়িয়ে মারেন। শেষে হিসাব দাঁড়ায় রোনান সুলিভান বাংলাদেশের হয়ে শেষ টাইব্রেকার শট নেবেন। তার শটে গোল হলেই ট্রফি বাংলাদেশের। রোনান মিস করেননি। দুর্দান্ত কায়দায় গোল করে বাংলাদেশের হয়ে নিজের অভিষেক টুর্নামেন্টকে স্মরণীয় করে রাখলেন। জার্সি খুলে নাচলেন মনের আনন্দে।

অপেক্ষায় থাকুন সামনের দিনে এমন আরো অনেক আনন্দ উপহার দেবেন এই ফুটবলার। সেই সঙ্গে তার ভাই ডেকলান সুলিভানের নামটাও বলতে পারি। তাকে আরেকটু গেম টাইম দিলে হয়তো তার ওভারঅল গেমপ্লেটা কেমন সেটার ব্যাপারে একটা আইডিয়া পাওয়া যেত। খুবই অল্প সময়ে খেলেছেন ডেকলান। তবে এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই ডেকলান সুলিভানও ঠিক জানিয়ে দিলেন, তিনি আরেক রত্ন। একাদশে দুই ভাইয়ের কম্বিনেশনটা খুবই দারুণ একটা ব্যাপার হবে। এ দুই ভাইকে জুটি হিসেবে আমরা সামনের দিনে বাংলাদেশ জাতীয় দলে দেখলেও খুব অবাক হব না। দলের বাকিদের মধ্যে মোরশেদ দুর্দান্ত খেলেছে। গোলকিপার মাহিন দারুণ প্রতিভাবান। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আমি দেখতে পাচ্ছি। অধিনায়ক মিঠু চৌধুরীও সলিড ডিফেন্ডার। ফাইনালে মিডফিল্ডার চন্দন রায় ভালো খেলেছে। কোচ মার্ক কক্সের জন্য এই ট্রফি অনেক প্রয়োজন ছিল।

লেখক : ফুটবল বিশ্লেষক এবং ধারাভাষ্যকার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন