আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বগুড়ার রেশমশিল্প

আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বগুড়ার রেশমশিল্প

বগুড়া শহরের প্রবেশদ্বার বনানীতে শতবর্ষের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘বগুড়া রেশম বীজ গবেষণাগার’। এটি দেশের মাত্র দুটি রেশম বীজ গবেষণাগারের একটি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির আংশিক কার্যক্রম শুরু হয়। চলতি বছর শ্রমিক সংকট কাটিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়া ও তুঁতপাতার গুণগত মানের কারণে ব্রিটিশ আমলে বগুড়ায় রেশম গবেষণাগারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখান থেকে শুধু রেশমের বীজ ও কাঁচা রেশম উৎপাদনই নয়, রেশম পোকার খাদ্য তুঁতগাছের চারাও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, ১০১ বিঘা জমির ওপর ১৯০৫ সালে বগুড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় রেশম বীজ গবেষণাগার। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালের জুলাইয়ে রেশম উৎপাদন প্রকল্পটি পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বগুড়ার প্রতিষ্ঠানটি রেশমের জাত বা বীজ গবেষণাগার হিসেবে পরিচিতি পায়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুটি রেশম নার্সারি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর একটি বগুড়ায় এবং অন্যটি রাজশাহীর মীরগঞ্জে। পরবর্তী সময়ে ভোলারহাট, নবাবগঞ্জ, ঈশ্বরদী, রংপুর, দিনাজপুর, কোনাবাড়ী, ময়নামতি, সিলেটের খাদিমনগর, ভাটিয়ারি ও চন্দ্রঘোনায় আরো ১০টি নার্সারি স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি ২২টি সম্প্রসারণ কেন্দ্র, একটি রেশম কারখানা এবং একটি রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়।

উৎপাদনে ফিরছে বগুড়া

বগুড়া রেশম বীজ গবেষণাগারের ফার্ম ম্যানেজার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, একসময় যেখানে দৈনিক মাত্র ৯ জন কৃষক কাজ করতেন, বর্তমানে সেখানে গড়ে ২০ জন কৃষক নিয়মিত কাজ করছেন। গত তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটিতে এক হাজার ৬৫৪ কেজি কাঁচা রেশম গুটি উৎপাদিত হয়েছে। এসব গুটি জয়পুরহাট ও রাজশাহীর রেশম কারখানায় পাঠানো হয়।

তিনি জানান, বগুড়া থেকে প্রতি বছর গড়ে তিন হাজার কেজি কাঁচা রেশম সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি গত বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক লাখ ৬০ হাজার তুঁতগাছের চারা সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে অভ্যন্তরীণ রেশম সুতার চাহিদা প্রায় ৩০০ মেট্রিক টন।

রেশম পোকার জীবনচক্রও তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের। প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যে রেশম গুটি পাওয়া যায়। পোকা উৎপাদনের জন্য আরো আট থেকে ১০ দিন সময় প্রয়োজন হয়। একটি রেশম পোকা গড়ে ৪৫০টি ডিম দেয়। বছরে চার দফায় রেশম চাষ করা যায়।

সংকটে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান

সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সংকটে রয়েছে বগুড়ার শতবর্ষী এই প্রতিষ্ঠান। দপ্তরটিতে মোট ৩০টি পদের বিপরীতে ২৫টিই শূন্য। দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালককে বগুড়ার পাশাপাশি আরো দুটি জেলার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তবে বর্তমানে শ্রমিক সংকট নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গড়ে ২০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। শ্রমিক হুমায়ন জানান, তিনি গত তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অতীতে প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারিভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকেই উৎপাদন কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। তবে গত তিন বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রেশম শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বগুড়ার শতবর্ষী রেশম শিল্প আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে। দেশের অভ্যন্তরীণ রেশম সুতার বড় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ শিল্প গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন