চীনের বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্প্রসারণের কেন্দ্র হচ্ছে ওয়াখান করিডর

চীনের বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্প্রসারণের কেন্দ্র হচ্ছে ওয়াখান করিডর

উনিশ শতকে ব্রিটিশ-রুশ সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যে ওয়াখান করিডর সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই আজ চীনের সম্ভাব্য নতুন ভূকৌশলগত ও বাণিজ্যিক সীমান্তে পরিণত হচ্ছে। সাউথ এশিয়া মনিটরে ২৮ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘গোস্ট কমিউনিটিজ অভ দ্য ওয়াখান: হাউ অ্যান ইমপেরিয়াল বাফার জোন বিকেম চায়নাজ নেক্সট ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে রিশি গুরুং এসব মন্তব্য করেন।

ওয়াখান করিডর কী?

বিজ্ঞাপন

আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই দীর্ঘ, সংকীর্ণ পাহাড়ি ভূখণ্ডটি প্রায় ৫,১৭৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে তাজিকিস্তান, দক্ষিণে পাকিস্তান এবং পূর্ব প্রান্তে চীন। কিছু অংশে করিডরটির প্রস্থ মাত্র ১৫ কিলোমিটারের সামান্য বেশি।

১. ব্রিটিশ-রুশ ‘গ্রেট গেম’-এর সৃষ্টি

ওয়াখান কোনো স্বাভাবিক জাতিগত বা ভৌগোলিক সীমারেখা ছিল না। উনিশ শতকে মধ্য এশিয়ায় ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মধ্যে এটি একটি বাফার জোন হিসেবে তৈরি হয়। ১৮৮৫ সালের রুশ-আফগান সংঘাতের পর ব্রিটিশ ও রুশ প্রতিনিধিদের সীমারেখা নির্ধারণের মাধ্যমে অঞ্চলটি দুই সাম্রাজ্যের প্রভাববলয়ের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সীমারেখা তৈরির সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বহু পুরোনো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

২. সিল্ক রোডের পুরোনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

ওয়াখান করিডর তৈরির আগে এই অঞ্চল মধ্য এশিয়ার পুরোনো বাণিজ্যব্যবস্থার অংশ ছিল। ওয়াখি, কিরগিজ ও তাজিক জনগোষ্ঠীর বাণিজ্য, পশুপালন, মৌসুমি অভিবাসন এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আধুনিক রাষ্ট্রীয় সীমান্তের অনেক বাইরে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু নতুন সীমান্তগুলো তাদের ঐতিহ্যগত চলাচল ও বাণিজ্যপথকে বিভক্ত করে দেয়। বিশেষ করে কিরগিজ পশুপালকদের মৌসুমি চারণভূমিতে যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়। ওয়াখি জনগোষ্ঠীর কৃষি ও বাণিজ্যিক যোগাযোগও সংকুচিত হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীগুলোকে লেখক রূপকভাবে “গোস্ট কমিউনিটিজ” বা ‘ভূতুড়ে সম্প্রদায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন—অর্থাৎ যাদের ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব নতুন সীমান্তব্যবস্থায় প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

৩. এখন কেন আবার গুরুত্বপূর্ণ?

প্রায় এক শতাব্দী ধরে ওয়াখান মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতিতে প্রান্তিক অঞ্চল ছিল। কিন্তু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। চীনের জন্য ওয়াখান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্তত তিনটি কারণ রয়েছে:

প্রথমত, বিকল্প স্থলপথ। ওয়াখান দিয়ে সম্ভাব্য যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হলে চীন আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান এবং শেষ পর্যন্ত আরব সাগরের দিকে স্থলপথে পৌঁছানোর সুযোগ পেতে পারে। এর ফলে সমুদ্রপথ, বিশেষ করে মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মধ্য এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি। ওয়াখানকে বৃহত্তর পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে মধ্য এশিয়ার অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তৃতীয়ত, বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা। যে জনগোষ্ঠীগুলো একসময় পুরোনো বাণিজ্যপথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তারা নতুন চীনা অবকাঠামো ও বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে লেখক আশঙ্কা করছেন, এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলও হয়ে পড়তে পারে।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকে ব্রিটেন ও রাশিয়া নিজেদের সাম্রাজ্যিক স্বার্থে ওয়াখানকে একটি বাফার অঞ্চল বানিয়েছিল। এখন সেই একই ভূখণ্ড নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চীন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে। অর্থাৎ একসময় যে করিডরটি ছিল সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার উপায়, সেটিই এখন সম্ভাব্যভাবে চীনের বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্প্রসারণের সেতু হয়ে উঠতে পারে।

নিবন্ধটির মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফলে ওয়াখান দিয়ে চীনের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যপথ বাস্তবে কতটা সম্ভব, চীন সেখানে কতদূর অবকাঠামো নির্মাণ করবে, কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব কী হবে—এসবকে নিশ্চিত ঘটনা নয়, বরং সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রবণতা হিসেবে দেখা উচিত। ওয়াখান করিডরে উনিশ শতকে ব্রিটিশ-রুশ সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি জনগোষ্ঠী ও বাণিজ্যব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করেছিল; আর একুশ শতকে চীনের বিআরআই সেই একই ভূখণ্ডকে আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন