জনগণের ভোগান্তি বাড়িয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে দেশে গণবিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে রাজনৈতিক সংগঠন ‘মঞ্চ ২৪’। একই সঙ্গে সরকারি চাকরির নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব বাতিল, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি ও সারের সংকট সমাধান এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও সতর্কতার কথা জানান মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী।
সংবাদ সম্মেলনে ফাহিম ফারুকী বলেন, সরকারি চাকরির নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধির যে অবৈধ সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে, এটা সরকারকে কোটা আন্দোলনের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলবে। মঞ্চ ২৪ বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সরকারকে এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছে। এর মধ্যে সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।’
দল-মত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীরা মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রতিবাদে মাঠে নামবেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘আবারও বলছি, দল-মত নির্বিশেষে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছাত্ররা মাঠে নেমে আসবে।’
দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও সারের সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক। এসব সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ফাহিম ফারুকী বলেন, ‘আজকের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জনগণের ভোগান্তি। বিদ্যুৎ, গ্যাসের সমস্যা আমাদের জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে।’ জনগণ বর্তমান সরকারের কাছে আরও ভালোভাবে দেশ পরিচালনার প্রত্যাশা করেছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এই সরকারকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু আজ সেই সরকারের বিরুদ্ধে বলতে হচ্ছে শুধু জনগণের কষ্ট দেখে। প্রধানমন্ত্রীকে বলব, দয়া করে রাসায়নিক সার, তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস-জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধান করেন। না হলে এটা নিয়েই গণবিস্ফোরণ ঘটবে।’
বিএনপির প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকুক- এমনটা তিনি চান; তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া হবে না।
ফাহিম ফারুকী বলেন, ‘এমন কিছু করবেন না, যেটাকে ক্যাশ করে আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে। বিএনপি ১০ বছর ক্ষমতায় থাক, সেটা আমিও চাই। কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে এক মিনিটও ক্ষমতায় থাকতে দেব না।’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতার বিচার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা হামলা ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাদের জন্য কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে একটি জাতীয় দৈনিকের সাবেক সাংবাদিকের উদাহরণ টেনে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ করেন ফাহিম ফারুকী। তার দাবি, ওই সাংবাদিক আগে আওয়ামী লীগ বিরোধী অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো কর্মী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এমনভাবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না, যাতে তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সুযোগ পান। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের আরও সাহসী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সম্প্রতি ভেনিসে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলার প্রসঙ্গও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন ফাহিম ফারুকী। এ ঘটনার বিচার দাবি করে তিনি সরকারের কাছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘সরকার এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে? কী বিচার করেছে?’ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ওপর হামলা হলে তারও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
তবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি দলটির নেতাকর্মীদের শারীরিকভাবে আক্রমণের আহ্বানও জানান। এ সময় তিনি বলেন, ‘আজ থেকে খুঁজে খুঁজে লীগ পিটাবেন।’ পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, জুলাইয়ের সরকার ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের ‘সরকারবিরোধী’ তৎপরতার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি প্রশিক্ষণের সময় সেনাবাহিনীর দুই সদস্যের মৃত্যুর বিষয়টিও তুলে ধরেন ফাহিম ফারুকী। নিহত সেনাসদস্যদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধির দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমার সেনাবাহিনীর দুজন সেনা প্রশিক্ষণের সময় শহীদ হয়েছেন। আল্লাহ তাদের জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ৮০ দশকের ফিটনেস ছাড়া পুরোনো অস্ত্র, কামান, ট্যাংক দিয়ে এই যুগে এসে প্রশিক্ষণ করা লাগবে?’
দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সাহস রয়েছে। তবে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করতে আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম প্রয়োজন।
ফাহিম ফারুকী বলেন, ‘আমাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কেন করছি না? আপনারা সৈনিকদের পেছনে বাজেট না বাড়িয়ে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় জিনিসে টাকা নষ্ট করছেন। দয়া করে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করে অস্ত্র বানানোর দিকে ফোকাস করেন।’
তিনি আরও বলেন, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশিক্ষণের সময় নিহত ও আহত সেনাসদস্যদের পরিবারের দায়িত্বও সরকারের নেওয়া উচিত। দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চ ২৪-এর পক্ষ থেকে জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় সংকট দ্রুত সমাধান, সরকারি চাকরির নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিল, আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন ঠেকানো এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

