বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর খাতের রাজস্ব আয় এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। তরুণ প্রজন্ম এ খাতের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ এখন সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে। আমাদের আছে বিশাল তরুণ প্রজন্ম। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এদের কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের জন্য এই স্বপ্নপূরণ অসম্ভব নয়।
তৈরি পোশাকশিল্প এবং বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির হাত ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল। সত্তরের দশকের শেষভাগে, বিশেষ করে ১৯৭৬ সালে দেশের দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের নেওয়া উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রপ্তানি খাতের উত্থান ঘটেছিল। এই দুই রপ্তানি খাতই এখন দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের পরবর্তী বৃহৎ ও সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে ‘সেমিকন্ডাক্টর শিল্প’ বা চিপ উৎপাদন খাতকে বিবেচনা করা হয়। এ শিল্পের জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
আজকের লেখায় বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ার স্বপ্নের বিষয়ে বলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারায় ‘সিলিকন ভ্যালি’ কীভাবে গড়ে উঠেছিল, সেই রোমাঞ্চকর গল্প জানা দরকার। আমার দুবার সিলিকন ভ্যালিতে যাওয়ার সুযোগ হয় ছেলের কল্যাণে। সে বর্তমানে সিলিকন ভ্যালির এনভিডিয়া করপোরেশনের সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ফলে সিলিকন ভ্যালি ঘুরে ইনটেল, অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও সরেজমিনে দেখার সৌভাগ্য হয়।
সিলিকন ভ্যালি গড়ে ওঠার গল্প
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারা উপত্যকা আজ বিশ্বজুড়ে ‘সিলিকন ভ্যালি’ নামে পরিচিত। একসময় এই এলাকায় মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ছিল কমলার বাগান। কিন্তু আজ সেটাই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু। কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মহাযাত্রা এবং সেদিনের চিপ তৈরির কারখানা থেকে আজ সেই জায়গাটিতেই কীভাবে ঘটল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিপ্লব—সেই রূপান্তরের কথাই বলছি।
গল্পের শুরু গত শতকের পঞ্চাশের দশকে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির তৎকালীন প্রোভোস্ট ফ্রেড টারম্যান তার শিক্ষার্থীদের চাকরি খুঁজতে বাইরে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে কোম্পানি খোলার জন্য উৎসাহিত করেন। ১৯৫১ সালে তার উদ্যোগেই গড়ে ওঠে ‘স্ট্যানফোর্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ (বর্তমানে স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ পার্ক), যা বিশ্ববিদ্যালয় ও চিপ উৎপাদনকারী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতু তৈরি করে।
ফ্রেড টারম্যানের পর নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী উইলিয়াম শকলি মাউন্টেন ভিউতে চিপ তৈরির উদ্দেশ্যে এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভাকে নিয়ে আসেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সেখানে গড়ে তোলেন ‘শকলি সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরি’। ‘জার্মেনিয়াম’-এর পরিবর্তে চিপ তৈরিতে ‘সিলিকন’ ব্যবহারের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত তিনি নেন। এই কোম্পানি মাত্র পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ১৯৫৭ সালে এই কোম্পানি থেকে আটজন অত্যন্ত প্রতিভাবান তরুণ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী একসঙ্গে পদত্যাগ করে চলে যান। বিজ্ঞানী শকলি এদের নাম দেন ‘ট্রেইটরস এইট’ বা দেশদ্রোহী আট। বিজ্ঞানী শকলি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান গবেষক। তিনি ১৯৫৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান কার্যকর ট্রানজিস্টর আবিষ্কার ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপর। খুব উঁচুমানের বিজ্ঞানী হলেও শকলি ছিলেন প্রচণ্ড একগুঁয়ে, কর্তৃত্বপরায়ণ ও সন্দেহপ্রবণ। তিনি কোম্পানির কর্মী ও সহকর্মী বিজ্ঞানীদের ওপর অনাবশ্যক নজরদারি করতেন। তার এই একনায়কতান্ত্রিক আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে ওই আট বিজ্ঞানী চলে গেলে তিনি তাদের বিশ্বাসঘাতক আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এই আটজনই যৌথভাবে গড়ে তোলেন ‘ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর’ নামে কোম্পানি, যা সান্তা ক্লারা উপত্যকার আসল বিগ ব্যাং এবং পরবর্তী সময়ে এদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বখ্যাত চিপনির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইনটেল’ (Intel)।
পরবর্তী সময়ে ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টরের কর্মীরাই আলাদা হয়ে একের পর এক নতুন কোম্পানি গড়ে তুলতে থাকেন, যা চিপশিল্পের বিস্তারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন রবার্ট নয়েস এবং গর্ডন মুর, যারা ১৯৬৮ সালে বিশ্বখ্যাত চিপনির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইনটেল (Intel) প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা নেন। এরপর কয়েক বছরের মধ্যেই এই উপত্যকায় উদীয়মান ২৩টি চিপ কোম্পানি গড়ে ওঠে। গত শতকের ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এবং নাসার (NASA) অ্যাপোলো স্পেস প্রোগ্রামের জন্য প্রচুর পরিমাণে উন্নত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বা চিপের প্রয়োজন দেখা দেয়। সান্তা ক্লারা অঞ্চলের কোম্পানিগুলো (যেমন ফেয়ারচাইল্ড) এই বিশাল চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে, যা তাদের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। ২০২৬ সালে এসে সিলিকন ভ্যালিতে স্টার্টআপের সংখ্যা এখন ৪০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
শুধু ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ইউনিকর্ন স্টার্টআপের সংখ্যা শতাধিক। সেদিনের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের হাত ধরে শুরু হওয়া এই উপত্যকা একে একে জন্ম দিয়েছে পার্সোনাল কম্পিউটার (পিসি), ইন্টারনেট, ডট-কম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মোবাইল কম্পিউটিংয়ের মতো একের পর এক বিপ্লব। অ্যাপল, গুগল, এনভিডিয়া ও মেটার মতো ট্রিলিয়ন ডলারের দানব কোম্পানিগুলোর আঁতুড়ঘর এই সিলিকন ভ্যালি। সিলিকন ভ্যালি আজ শুধু সিলিকন চিপে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন প্রবেশ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লবের যুগে। আর এই নতুন সাম্রাজ্যের দুই অবিসংবাদিত সম্রাট হলো ‘এনভিডিয়া’ এবং ‘ওপেনএআই’। বিশ্বপ্রযুক্তির বাজারে এদের একজনকে যদি এই বিপ্লবের ‘পেশি’ বা অবকাঠামো বলা হয়, তাহলে অন্যটি হলো ‘মস্তিষ্ক’। জেনারেটিভ এআই বা চ্যাটবট ট্রেইন করার জন্য যে বিশেষ ধরনের জিপিইউ (GPU) চিপ প্রয়োজন, তার প্রায় ৯০ শতাংশ বাজার এখন এনভিডিয়ার দখলে। তাদের তৈরি করা ‘CUD’ সফটওয়্যার ইকোসিস্টেমের কারণে প্রতিযোগীরা চিপ বানালেও গ্রাহকরা এনভিডিয়া ছাড়তে পারছে না। ২০২২ সালে ChatGPT দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া ওপেনএআই প্রতিষ্ঠানটি এখন সাধারণ চ্যাটবট থেকে বেরিয়ে জটিল গাণিতিক এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম ‘এজেন্টিক এআই’-এর দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রযুক্তির বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তারা এখন মাইক্রোসফটের মতো জায়ান্টের সঙ্গে জোট বেঁধেছে এবং নিজেদের কাস্টম এআই প্রসেসর চিপের ওপরও কাজ শুরু করেছে। ওপেনএআই-এর নিত্যনতুন শক্তিশালী এআই মডেল তৈরির জন্য দরকার হচ্ছে এনভিডিয়ার হাজার হাজার সুপার-কম্পিউটিং চিপ।
কমলার বাগান থেকে চিপ, আর চিপ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সিলিকন ভ্যালি প্রমাণ করেছে যে, মানুষের স্বপ্ন, কল্পনা আর সাহসের মেলবন্ধন ঘটলে একটি ছোট্ট উপত্যকাও পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ লিখে দিতে পারে। আগামী দিনে সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তার উত্তরও সম্ভবত লুকিয়ে আছে এই সিলিকন ভ্যালির ‘সিলিকন চিপ’ আর ‘এআই কোড’-এর ভেতরেই।
সিলিকন ভ্যালি একজন সাংবাদিকের দেওয়া নাম, তার সেই প্রতিবেদন
‘সিলিকন ভ্যালি’ (Silicon Valley) নামটি প্রথম ব্যবহার করেন ডন হফলার (Don Hoefler) নামে একজন মার্কিন সাংবাদিক। তিনি ইলেকট্রনিক্স নিউজ পত্রিকার কলামিস্ট।
১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি ‘ইলেকট্রনিক্স নিউজ’ (Electronics News) সাপ্তাহিকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারা অঞ্চলের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নিয়ে তার লেখা প্রতিবেদন তিনটি বিশেষ পর্বে ছাপা হয়। সেই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘Silicon Valley USA’ (সিলিকন ভ্যালি ইউএসএ)। এর মাধ্যমেই নামটি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসে।
সান্তা ক্লারা উপত্যকা বা ভ্যালিতে তখন একের পর এক সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির কোম্পানি গড়ে উঠছিল। এই কম্পিউটার চিপ বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (IC) তৈরির প্রধান মূল উপাদান ছিল ‘সিলিকন’ (Silicon)। ডন হফলার চিপশিল্পের এই মূল উপাদানটির ওপর ভিত্তি করেই নামের প্রথমাংশ বা ‘সিলিকন’ বেছে নেন। ভৌগোলিকভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার এই অঞ্চলটি সান্তা ক্রুজ পর্বতমালা এবং ডায়াবলো পর্বতমালার মাঝখানে একটি উপত্যকা বা ‘ভ্যালি’ (Valley) হিসেবে অবস্থিত। সিলিকন ও ভ্যালি মিলিয়ে দেওয়া হয় ‘সিলিকন ভ্যালি’ নাম।
হফলার যখন এই অঞ্চলের সিলিকন চিপ বিপ্লব নিয়ে প্রতিবেদন লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তার এক বিপণনকারী বন্ধু (রালফ ভেয়ার্স্ট) কথায় কথায় এই অঞ্চলটিকে ‘সিলিকন ভ্যালি’ বলে উল্লেখ করেন। হফলারের কাছে তখনই নামটি দারুণ ও অর্থবহ মনে হয়। এর আগে অঞ্চলটিকে সাধারণভাবে ‘সান্তা ক্লারা ভ্যালি’ বলা হতো। কিন্তু হফলার ভাবলেন, চিপশিল্পের এই বিশাল উত্থানকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে একটি অত্যন্ত চটকদার ও আকর্ষণীয় নামের প্রয়োজন। তাই নাম হয়ে যায় সিলিকন ভ্যালি। তার দেওয়া ওই নামটি বিশ্বজুড়ে এখন কিংবদন্তি।
ডন হফলারের রিপোর্টের মূল বিষয়বস্তু এবং ফোকাস ছিল মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর—‘মানুষ, অর্থ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা’। তিনি ট্রানজিস্টরের আবিষ্কার থেকে শুরু করে কীভাবে সিলিকন চিপের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলো, তার একটি ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করেন রিপোর্টে।
প্রতিবেদনের বড় অংশ জুড়ে ছিল ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির গল্প। কীভাবে এই একটি কোম্পানি থেকে সান্তা ক্লারা উপত্যকার পুরো চিপবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল এবং এর প্রতিষ্ঠাতারা (যেমন গর্ডন মুর, রবার্ট নয়েস, জিন হোরনি) কীভাবে কাজ করেছিলেন, তা তিনি বিশদভাবে তুলে ধরেন। হফলার দেখান, ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর থেকে বের হয়ে আসা প্রকৌশলীরা কীভাবে একের পর এক নতুন কোম্পানি তৈরি করছেন। তিনি ইনটেল (Intel), এএমডি (AMD)-সহ তৎকালীন ২৩টি উদীয়মান চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকা ও তাদের মধ্যকার সংযোগ বা একটি ‘ফ্যামিলি ট্রি’ (পারিবারিক বৃক্ষ) এঁকে দেখান, যা প্রমাণ করে কীভাবে পুরো অঞ্চলে একটি চিপ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছিল।
প্রতিবেদনে উঠে আসে সিলিকন ভ্যালির অর্থায়নের গল্প। কীভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগকারীরা তরুণ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের আইডিয়ায় টাকা লাগাচ্ছিলেন এবং কীভাবে বিজ্ঞান ও পুঁজির এই মেলবন্ধন অঞ্চলটিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছিল, তা তিনি ফুটিয়ে তোলেন।
হফলার কেবল ব্যবসার কথাই লেখেননি, তিনি সেখানকার চিপ কারখানার কর্মী ও প্রকৌশলীদের যাপনচিত্রও তুলে ধরেন। মাউন্টেন ভিউয়ের বিখ্যাত ‘ওয়াগন হুইল’ (Wagon Wheel) ট্যাভার্নের মতো স্থানীয় আড্ডাস্থলগুলোর কথা উঠে আসে, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির প্রকৌশলীরা কাজ শেষে একসঙ্গে আড্ডা দিতেন, আইডিয়া শেয়ার করতেন এবং গোপনীয়তার প্রাচীর ভেঙে চিপের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করতেন।
সহজ কথায়, ডন হফলারের এই প্রতিবেদনটি ছিল সান্তা ক্লারা ভ্যালি কীভাবে ডালপালা মেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিপ ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল, তারই একটি জীবন্ত ও অনুসন্ধানী রূপচিত্র।
সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি বিপ্লব
গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সিলিকন ভ্যালির একেবারে শুরুর দিনগুলোয় হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি কোম্পানি ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম সিলিকনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শকলি সেমিকন্ডাক্টর যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৭ সালে সিলিকন ভ্যালির চিপবিপ্লবের আসল ইঞ্জিন ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে সাংবাদিক ডন হফলার যখন এই অঞ্চলের নাম ‘সিলিকন ভ্যালি’ দেন, তখন তার প্রতিবেদনে ফেয়ারচাইল্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠা মাত্র ২৩টি উদীয়মান চিপ কোম্পানির একটি তালিকা বা ‘ফ্যামিলি ট্রি’ উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ শুরুর দিকে মূল চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানির সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ৩০টির মতো। বর্তমানে সিলিকন ভ্যালি বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি হাবে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি স্টার্টআপ কোম্পানি এবং হাজার হাজার প্রতিষ্ঠিত গ্লোবাল টেক কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে শুধু বিশ্বখ্যাত ‘ফরচুন ১০০০’ (Fortune 1000) তালিকারই ৩০টির বেশি শীর্ষ টেক জায়ান্টের প্রধান সদর দপ্তর এখানে অবস্থিত। এছাড়া শুধু নতুন এবং ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ইউনিকর্ন স্টার্টআপেরই সংখ্যা ১০৫টির বেশি।
সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি বিপ্লবের ধাপগুলো হলো, সেমিকন্ডাক্টর ও চিপবিপ্লব (’৫০ থেকে ’৬০-এর দশক)। সিলিকন ট্রানজিস্টর ও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) তৈরি, যা আধুনিক কম্পিউটারের ভিত্তি গড়ে দেয়। প্রধান আইকনিক কোম্পানি ছিল ফেয়ারচাইল্ড, ইনটেল ও এএমডি।
পার্সোনাল কম্পিউটার (পিসি) বিপ্লব (১৯৭০ থেকে ’৮০-র দশক)। কম্পিউটারকে ল্যাবরেটরি থেকে সাধারণ মানুষের ঘরের টেবিলে নিয়ে আসা। আইকনিক কোম্পানিগুলো হলো অ্যাপল ও হিউলেট প্যাকার্ড (এইচপি)।
ইন্টারনেট ও ডটকম বিপ্লব (’৯০-এর দশক)। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের বিস্তার, ব্রাউজার ও ই-কমার্সের সূচনা। আইকনিক কোম্পানি নেটস্কেপ, ইয়াহু, ইবে ও সিসকো।
সার্চ ইঞ্জিন ও সোশ্যাল মিডিয়া বিপ্লব (২০০০-এর দশক)। তথ্য খোঁজা সহজ করা এবং মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমকে ডিজিটাল করা। আইকনিক কোম্পানি গুগল ও মেটা (ফেসবুক)।
মোবাইল ও ক্লাউড কম্পিউটিং বিপ্লব (২০১০-এর দশক)। স্মার্টফোন (আইফোন) এবং অ্যাপ সংস্কৃতির মাধ্যমে হাতের মুঠোয় সেবা আনা। আইকনিক কোম্পানি অ্যাপল, গুগল ও ভিএমওয়্যার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লব (২০২০-এর দশক থেকে বর্তমান)। জেনারেটিভ এআই, চ্যাটবট, স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক্স এবং এআই চিপের বিকাশ। আইকনিক কোম্পানি এনভিডিয়া, ওপেনএআই, মেটা, গুগল।
সহজ কথায় সিলিকন ভ্যালি সেমিকন্ডাক্টরের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্বমঞ্চে রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি দেখতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ সরকার সেমিকন্ডাক্টর ও হাইটেক শিল্পকে ইতোমধ্যে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্রের যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো তিনি ভাষণ দেবেন। এরপর ২৬ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো যাবেন এবং সান্তা ক্লারা সিলিকন ভ্যালি ঘুরে দেখবেন। সেখানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তাদের এক মতবিনিময় সভায় তিনি অংশ নেবেন। তিনি প্রবাসীদের সেমিকন্ডাক্টর ও আইটি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ, বিশেষ শুল্ক সুবিধা এবং পাঁচ হাজার কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ডের মতো সরকারি উদ্যোগের কথা বলবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে গত জুলাই মাসে ঢাকায় আয়োজিত ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়ামে অংশ নিয়ে বলেছেন, পোশাক খাতের পর বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধান অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় খাত হবে সেমিকন্ডাক্টর। নতুন নতুন উদ্ভাবনকে সহায়তা করতে বার্ষিক পাঁচ কোটি টাকা স্টার্টআপ অনুদানের কথাও বলেন তিনি। সেমিকন্ডাক্টর খাতকে তিনি প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের এই স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের পালা।’
লেখক: বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


