ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ছয় মাসের যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত চিত্র নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বদলাতে পারেনি। বরং যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ইসরাইলের আঞ্চলিক আধিপত্যের পরিকল্পনা নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, দেশটির প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তৈরি করা। একই সঙ্গে ইরানকে দুর্বল করে ইসরাইলের নেতৃত্বে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু ছয় মাস পরও ইরান সরকার টিকে আছে এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। ইরান সামরিক ও কৌশলগতভাবে পাল্টা চাপ তৈরির সক্ষমতাও ধরে রেখেছে। ফলে যে যুদ্ধকে দ্রুত ফলাফল অর্জনের অভিযান হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরান দেখিয়েছে যে ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তারা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে এর প্রভাব পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থাকলেও যুদ্ধের সময় সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথ ঝুঁকির মুখে পড়ায় সেই নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। বিকল্প জ্বালানি পরিবহনপথ তৈরিতে এসব দেশ এখন বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপের মুখে পড়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রতিরোধ জোটকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারেনি। লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন ফ্রন্টের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক গতিশীলতা রয়েছে। ফলে ইরান ও এসব গোষ্ঠীর সম্পর্ককে শুধু একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ইরান অবশ্য যুদ্ধ থেকে ক্ষতিহীন বের হয়নি। দেশটির বহু মানুষ নিহত হয়েছেন, সামরিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে এবং অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। তবে যে যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সরকার পরিবর্তন ও ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা ধ্বংস করা, সেই পরিস্থিতিতে ইরানের টিকে থাকা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফলাফল।
যুদ্ধের পর ইরানও তার প্রতিরক্ষা কৌশলে পরিবর্তন আনছে। আগের মতো শুধু হামলা সহ্য করে সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে প্রতিপক্ষের ওপর এমন ব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল গুরুত্ব পাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিপক্ষকে নতুন করে হিসাব করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে নতুন পশ্চিম এশিয়া গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, বাস্তবে সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটেনি। বরং ইরান টিকে আছে, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিবেচনা করছে এবং ইসরাইলের কাঙ্ক্ষিত আঞ্চলিক আধিপত্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

