ফুটবল বিশ্ব হারাল তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক ডিফেন্ডারকে। ইতালির কিংবদন্তি ফুটবলার ফ্রাঙ্কো বারেসি ৬৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার সাবেক ক্লাব এসি মিলান গতকাল এক বিবৃতিতে মর্মান্তিক খবরটি নিশ্চিত করেছে। ফুসফুসের টিউমার অপসারণের জন্য ২০২৫ সালের আগস্টে তার একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এরপর থেকে স্বাস্থ্যগত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গেলেও তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ প্রকাশ করেনি ক্লাবটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসি মিলানের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করে বলা হয়, ‘ফ্রাঙ্কো বারেসির প্রয়াণে অশ্রুসিক্ত মিলান। তার আদর্শ ও সততা ক্লাবের ডিএনএতে চিরকাল খোদাই থাকবে, ঠিক যেমন অমর হয়ে আছে তার ঐতিহ্যবাহী ৬ নম্বর জার্সিটি।’
১৯৬০ সালের মে মাসে লোম্বার্দিতে জন্ম নেওয়া ফ্রাঙ্কিনো ‘ফ্রাঙ্কো’ বারেসি ১৯৭৪ সালে মিলানের বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেন। মাত্র ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯৭৮ সালে ক্লাবের মূল দলে অভিষেক হয় তার। চমৎকার টেকনিক, প্রতিপক্ষের খেলা আগেভাগে বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা, নিখুঁত ট্যাকলিং এবং অসাধারণ নেতৃত্বগুণের কারণে খুব দ্রুত সবার নজর কাড়েন। ২২ বছর বয়সে ক্লাবটির অধিনায়কের দায়িত্ব পান। মিলানে শুরুতে তাকে ‘পিসকিনিন’ (লিটল ওয়ান) ডাকা হলেও সুইপার পজিশনে তার কিংবদন্তিতুল্য সাফল্যের কারণে জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে তুলনা করে তাকে ‘কাইজার ফ্রাঞ্জ’ বলেও অভিহিত করা হতো।
এসি মিলানের প্রতি তার আনুগত্য ছিল অতুলনীয়। ক্লাবটির দুর্দিনে কখনোই ক্লাব ছেড়ে যাননি, কাটিয়েছেন বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পুরো ২০ বছর। মিলানের জার্সিতে ৭১৯টি ম্যাচ খেলে ১৯৯৭ সালে পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান। তার নেতৃত্বে মিলান আশি ও নব্বইয়ের দশকে তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ (চ্যাম্পিয়নস লিগ) এবং ছয়টি ইতালিয়ান লিগ শিরোপাসহ সব মিলিয়ে ১৯টি শিরোপা জিতেছিল। পরে পাওলো মালদিনি, মাউরো তাসোত্তি ও আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা রক্ষণভাগ গড়ে তুলেছিলেন। বারেসির অবসরের পর তার সম্মানে মিলান ক্লাব চিরতরে ৬ নম্বর জার্সিটি তুলে রাখে।
১৯৮০ ও ১৯৮৮ ইউরোয় ইতালি দলের প্রতিনিধিত্ব করেন বারেসি। তার বড় ভাই জিউসেপ্পে বারেসিও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন ইতালি দলে। ১৯৮০ ইউরোয় দুই ভাই ইতালি দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও ফ্রাঙ্কো বারেসি মাঠে নামার সুযোগ পাননি। বড় টুর্নামেন্টে ওই একবারই দুই ভাই ইতালি জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৮২ সালে বেঞ্চে বসে বিশ্বকাপ জয়ের পর জাতীয় দলের কোচের সঙ্গে মতভেদের কারণে ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে দলে জায়গা পাননি। ১৯৯০ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন, রানার্সআপ ও তৃতীয় হওয়া সাত ফুটবলারের একজন এই কিংবদন্তি।
জাতীয় দলেও বারেসির অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯৮২ সালে ইতালি দলের সদস্য হিসেবে বিশ্বকাপ জয় করেন। যদিও সেবার মাঠে নামার সুযোগ পাননি, তবে ১৯৯০ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে এবং ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন দলের মূল চালিকাশক্তি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে ইতালিকে ফাইনালে তুললেও টাইব্রেকারে গোল মিস করার দুঃখ নিয়ে রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ইতালির জার্সিতে ১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৮১ ম্যাচে একটি গোল করেন। ব্যক্তিগত ও দলগত অর্জনে ভরপুর বারেসি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার (ইতালি: ১৯৭৯–১৯৯৪)
ম্যাচ: ৮১
গোল: ১
সাফল্য: ১৯৮২ ফিফা বিশ্বকাপ জয় এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপের রানার্স-আপ
ক্লাব ক্যারিয়ার (এসি মিলান: ১৯৭৭–১৯৯৭)
ম্যাচ: ৭১৯ অফিসিয়াল ম্যাচ
গোল: ৩৩
সিরি আ: ৪৭০ ম্যাচ ও ১২ গোল
শিরোপা: ৬টি সিরি আ, ৩টি ইউরোপিয়ান কাপ/চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ২টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

